সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি

মনিরুল ইসলাম মনি, সাতক্ষীরা:সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুনির্তীর অভিযোগ উঠেছে। ২০১১ সালে একনেকের বৈঠকে তিন বছর মেয়াদী সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে ২৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও জমি অধিগ্রহন বাবদ মাত্র ১৮ কোটি টাকা ছাড়া এই প্রকল্পে আর কোন টাকা খরচ করা হয়নি। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের গাফিলতির কারনে গত ২০১২-১৩ অর্থ বছরে এই প্রকল্পের প্রায় ২১ কোটি টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে এই প্রকল্পে ২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেলেও আজ পর্যন্ত এ টাকা কোন কাজে লাগানো হয়নি। প্রকল্পের টাকা ব্যয় না করে  একই প্রকল্পের মধ্যে নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রায় ৮৪ কোটি টাকার আরো একটি প্রকল্প খাঁড়া করে নির্মাণ করা করা হচ্ছে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।
এদিকে, সরকারের নিময়নীতির তোয়াক্কা না করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর পছন্দের ডা. এস জেড আতীক নামের এক চিকিৎসককে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) করা হয়েছে। ওই একই ব্যক্তিকে ২০১১ সালের অক্টোবর মাস  থেকে  সাতক্ষীরার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক এবং মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ওই কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একই ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ তিন চারটি দায়িত্ব দেয়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১১ সালে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের জন্য একনেকের বৈঠকে ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট প্লান (ডিপিপি) এর আওতায় ২৬৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাশ হয়। প্রকল্পের নাম দেয়া হয় ‘সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প’। এই প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারন করা হয় ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও সাতক্ষীরার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন  ডা. এস জেড আতীককে।  ২০১২ সালে এই প্রকল্পে ৪০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। বরাদ্দকৃত টাকা থেকে সাতক্ষীরা শহরতলীর বাঁকাল ব্রিজ এলাকায় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ৪০ একর জমি অধিগ্রহন বাবাদ ১৮ কোটি টাকা এবং অন্যান্য (কনসালটেন্ট ) কাজে আরো প্রায় ১ কোটি (মোট ১৯ কোটি টাকা) টাকা ব্যয় দেখানো হয়। বাকী প্রায় ২১ কোটি টাকা গত অর্থবছরে কোন কাজে লাগানো হয়নি। কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাত কারণে বরাদ্দের বিষয়টি গোপন রাখেন। কিন্তু বিষয়টি জানাজানির পর প্রকল্পের ওই টাকা মন্ত্রণালয়ে ফেরত দেয়া হয়।
প্রকল্প পরিচালক ডা. এস জেড আতীক দাবি করেন, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তের কাজে গাফিলতি ছিল। এছাড়া তারা সময় মত টেন্ডার কাজ সম্পন্ন করতে না পারার কাপ্রণ ওই টাকা ফেরত দিতে হয়েছে।
এদিকে, ২০১২ সালে একই প্রকল্পের মধ্যে সরকারি নিয়মবহির্ভূতভাবে অপারেশন প্লাান্ট (ওপি) এর আওতায় প্রায় ৮৫ কোটি টাকার আরো একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এ প্রকল্পের নাম দেয়া হয় ‘সাতক্ষীরা ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ নির্মাণ প্রকল্প’। এই প্রকল্পেরও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) করা হয় ডা. এস জেড আতীককে। ডিপিপি’র আওতায় নেয়া মূল প্রকল্পের টাকা খরচ না করে একই প্রকল্পের আওতায় ভিন্ন একটি প্রকল্প (ওপি’র আওতায় ) দেখিয়ে ২০১২ সালের জুলাই মাসে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। ২০১২ সালের ২০ জুলাই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক ফিতা কেটে ওপি প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে (দুই গ্রুপের কাজ ) মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের একাডেমিক ভবন নির্মাণ। ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে (চার গ্রুপ) ১০ ইউনিটের আলাদা ৬টি চারতলা (ডাক্তার ও স্টাফদের জন্য কোয়ার্টার) ভবন নির্মাণ। ইতিমধ্যে স্টাফ কোয়াটার নির্মাণ কাজ শতভাগ শেষ দেখানো হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে সাময়িকভাবে এসব ভবন মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের হোস্টেল, ক্লাস রুম, অধ্যক্ষের কার্যালয় এবং অফিস রুম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একাডেমিক ভবনের নির্মাণ কাজ এখনও শেষ হয়নি। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দাবি মতে, একাডেমিক ভবন নির্মাণ কাজ প্রায় ৭০ ভাগ শেষ হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শতভাগ নির্মাণ কাজ শেষ হবে তারা আশা করছেন।
এদিকে ওপি প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্টাফ কোয়ার্টার ও একাডেমিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সিডিউল মেতাবেক কাজ করা হয়নি। প্রায় ৪ লাখ বর্গফুটের ছাদের সেন্টারিং করার ক্ষেত্রে স্টিলের পাত ব্যবহারের কথা থাকলেও সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে কাঠ। এর প্রতিবাদ করায় স্ট্যান্ড রিলিজ হতে হয়েছে সাতক্ষীরা স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সহকারী পকৌশরী মাসুদুর রহমানকে।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী ফারুক আহম্মেদ জানান, ওপি প্রকল্পের আওতায় ২০১২ সালে ৮৪ কোটি টাকার ব্যয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক বছর আগেই তা শেষ হবে। এ ছাড়া ডিপিপি প্রকল্পের কাজ নানা জটিলতার কারনে শুরু হয়নি। কাজ শুরু করতে বিলম্ব হওয়ায় গত বছর প্রায় ২১ কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। চলতি অর্থ বছরে এই প্রকল্পে ২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়। শিগগির ওয়ার্ক ওয়ার্ডার দেয়া হবে।
তিনি বলেন, আলাদা দু’টি প্রকল্পে পিডি’র দায়িত্বে কলেজের অধ্যক্ষ ডা. এস জেড আতীক। নির্মাণ কাজে দুর্নিতীর অভিযোগ সঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. এস জেড আতীক বলেন, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে আমাকে নির্মাণ প্রকল্পের পিডি করা হয়েছে। সাতক্ষীরা সিভিল সার্জনসহ ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রীর নির্দেশে তাকে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। আমি একাধিক বার স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে বলেছি, আমাকে এতোগুলো দায়িত্ব না দিতে। কিন্তু উনাকে বোঝানো যাচ্ছে না। আলাদা দু’টি নির্মাণ প্রকল্প বিষয়ে তিনি বলেন, কি ভাবে প্রকল্প দু’টো পাশ হয়েছে তা আমার জানা নেই। এটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার।
এসব অভিযোগ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডা: আ ফ ম রুহুল হক সাংবাদিকদের বলেন, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য পৃথক এই প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ডা: এস জেড আতীককে। নির্মান প্রকল্পে কোন ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি হয়নি। একটি মহল নির্মান কাজ বাঁধাগ্রস্ত করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এক প্রকল্পের মধ্যে অন্য প্রকল্প খাঁড়া করা বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করতে চাননি। একই ব্যক্তিকে ৫টি গুরুত্বপূর্ন পদে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, সাতক্ষীরার স্বাস্থ্য বিভাগের স্বার্থেই তাকে এসব দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
একই ব্যক্তি পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ পদে !
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০১১ সালের ১২ অক্টোবর ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পান ডা.এস জেড আতীক। সিভিল সার্জন ডা. ইবাদুল্লাহ অবসরে যাওয়ার পর পদটি খালি হয়। নিয়ম অনুযায়ী সিনিয়র কোন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের দায়িত্ব দেয়ার বিধান থাকলেও ডা: এস জেড আতীক অতিতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে গুরুত্বপূর্ন এপদে আসীন হন। শুধু তাই নয়, একই সাথে তাকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের (সিভিল সার্জনের সহ মর্যাদার পদ) তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বও দেয়া হয়। ২০১১ সালের পর থেকে অদ্যাবধি তিনি গুরুত্বপূর্ণ ওই দু’টি পদ দখল করে আছেন। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর তাকে ওই কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। পরে তাকে পদোন্নতি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ বানানো হয়। ২০১২ সালে মেডিকেল কলেজ ও হাসাপাতাল নির্মান প্রকল্পের কাজ শুরুর পর থেকে ডা.আতীককে নির্মানাধীন একই কাজের দু’টি প্রকল্পেরই প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ একই ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ ৫টি পদে রাখা হয়েছে। এ ধরনের নজীর আর দ্বিতীয়টি নেই। এনিয়ে অনেক গুঞ্জন রয়েছে।