কোরবানির আগেই চামড়ার বাজারে দরপতন

আবদুল কাদের:কোরবানী ঈদের মাত্র ৫ দিন  আগেই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে কাঁচা চামড়ার দাম কমে গেছে প্রায় অর্ধেক। ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে এই দরপতন বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় বাজারে দাম না পেয়ে অনেকে চোরাইপথে ভারতে চামড়া পাচার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কেনানা যশোর সীমান্তবর্তী অঞ্চল। এখান থেকে খুব সহজে ভারতে চামড়া পাচার করা যায়। এক কথায় ট্যানারি মালিকদের হাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। এখনও যশোরের চামড়া ব্যবসায়ীরা ট্যানারি মালিকদের কাছে প্রায় ৪ কোটি টাকা পাবে। যা তারা পরিশোধ করছেন না। এদিকে সরকার চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য যে ঋণ ঘোষণা করেছে তা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে পৌছাবেনা। যেকারণে অনেক ব্যবসায়ী পূঁজি সংকটে পড়বেন বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যশোরের রাজারহাট ঢাকার পরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার মোকাম। সপ্তাহে দুইদিন শনিবার ও মঙ্গলবার এখানে হাট বসে। যশোর ছাড়াও আশপাশের জেলাগুলো থেকে ব্যবসায়ীরা চামড়া নিয়ে হাজির হয় এই হাটে। রাজারহাটের এই চামড়াহাটকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান। দুই শতাধিক আড়ৎ রয়েছে এই মোকামে। প্রতি কুরবানীর ঈদে রাজারহাটে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার চামড়া বেচাকেনা হয়ে থাকে।
মঙ্গলবার হাট ঘুরে দেখা গেছে,  এক মাস আগেও রাজারহাটে গরুর ভালো চামড়া বিক্রি হয়েছে প্রতি বর্গফুট একশ’ থেকে একশ’ পাঁচ টাকা। নিম্নমাণের চামড়া বিক্রি হয়েছে প্রতি বর্গফুট ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। কিন্তু এদিন ভালো চামড়ার দাম কমে প্রতি বর্গফুট ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং নিম্নমাণের চামড়া প্রতি বর্গফুট ৬০ থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। ছাগলের চামড়ার দামও ফুট প্রতি কমে গেছে ১৫/২০ টাকা। চামড়ার এই আকস্মিক দরপতন হতাশায় ডুবিয়েছে সাধারণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। এ কারণে আসছে কুরবানীতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনবেন কি না তা নিয়ে দুঃচিন্তায় আছেন বলে জানান।
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মূকুল  বলেন, সরকার চামড়া কেনার জন্য ট্যানারি মালিকদের কোটি কোটি টাকা ঋণ দিলেও সেই টাকা তারা চামড়াখাতে ব্যয় না করে অন্যখাতে ব্যয় করেন। কুরবানীর সময় আসলে তাদের হাতে আর টাকা থাকে না, তখনই তারা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে দেন। এবারও সেটি হবে বলে তার আশংকা। তিনি জানান, দরপতনের পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণের যে লবণের প্রয়োজন হয় তার দাম কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে লবণের বস্তা সাড়ে ৫শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া স্থানীয়ভাবে চামড়া ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণ পায়না।
আলাউদ্দিন মুকুল আরও  বলেন, ধর্মপ্রাণ মানুষের কুরবানী করা পশুর চামড়া বিক্রি করে সেই টাকাও বিলিয়ে দেয় হয়  ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের ইয়াতিম, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে। কিন্তু কুরবানী এলে প্রতিবছর কমে যায় চামড়ার দাম। ফলে একদিকে কুরবানির চামড়ার প্রাপ্ত অতিরিক্ত অর্থ থেকে বঞ্চিত হয় অসহায় ও দরিদ্র মানুষ। অন্যদিকে স্থানীয় বাজার মূল্য থেকে দাম বেশি পাওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বেছে নেয় সীমান্তের চোরাইপথ। এর প্রভাব পড়ে রপ্তানিযোগ্য এই শিল্পের উপর। এজন্য চামড়া পাচার ঠেকাতে প্রশাসনকেই এগিয়ে আসতে হবে।
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফরহাদ করিম মুরাদ জানান, গত বছর কুরবানী ঈদের আগে ট্যানারি মালিকদের কাছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পুঁজি আটকা পড়েছিল। সে কারণে তারা সেবার সঠিকভাবে চামড়া কিনতে পারেননি। এবারও তাই হতে চলেছে। সামনে আর মাত্র ঈদের ৫ দিন বাকি আছে। এখনও আমরা গত বছরের চামড়ার টাকা ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে পায়নি। স্থানীয়ভাবে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যাবে না বলেও মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া এর সাথে  যুক্ত হয়েছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ধ্বস। যে কারণে কোরবানীর ঈদে অতিরিক্ত দাম দিয়ে চামড়া কেনার সামর্থ থাকবে না অনেকের। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীচক্র আগে থেকেই তৎপর হয়ে উঠেছে। তারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আগে থেকে টাকা দিয়ে রেখেছে। যাতে ভারতে পাচার করতে চামড়ার সরবরাহে ঘাটতি না পড়ে!
স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ী তারাপদ দাস জানান, পেশাদার চামড়া ব্যবসায়ীদে পূজিঁ সংকটের সুযোগ নিবে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তারা বাজার দরের চেয়ে বেশি দামে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করে থাকে। পরে বাজারে চাহিদামত দাম না পেয়ে তারা পাচারকারী চক্রের হাতে চামড়া তুলে দেয়।
ঢাকার ব্যবসায়ী সাব্বির হোসেন জানান, পাচারকারী এজেন্ট চক্রের সদস্যরা এখান থেকে বেশি দামে চামড়া কিনছে। তাদের কারণে আমরা বেশি দামে চামড়া কিনে ট্যানারিতে বিক্রি করতে পারছিনা। তার মতে চামড়া পাচার প্রতিরোধ করতে না পারলে আমাদের দেশীয় শিল্প মার খাবে।
যশোর রাজারহাট চামড়া মোকামের ইজারাদার হাসানুজ্জামান হাসু জানান, ঈদে এখানকার ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা না দিলে তারা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাছাড়া পাচারও ঠেকাতে হবে।
এ ব্যাপারে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান জানান, রাজারহাটে চামড়া পাচার ঠেকাতে ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। তাছাড়া সীমান্তবর্তী থানাগুলোকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখার নিদের্শ দেয়া আছে যাতে কোনভাবেই চামড়া পাচার না হয়।
বাংলাদেশ বডার গাড (বিজিবি) যশোরের কমান্ডিং অফিসার লে.কর্ণেল মতিউর রহমান বলেন, স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের নির্দেশনা দিয়েছে কোনোভাবে চামড়া যেন ভারতে না যায়। সেজজ্য ঈদের দিন ও পরের কয়েকদিন সীমান্ত সিল করে দেয়া হবে। সীমান্তের সব বিওপি ক্যাম্পগুলোকে অধিক সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সেই সাথে অতিরিক্ত টহলের ব্যবস্থা থাকবে। চামড়া পাচার ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে আছে। কোন অবস্থাতে চামড়া পাচার করতে দেয়া হবেনা।