তালায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ

তপন চক্রবর্ত্তী, তালা :সাতক্ষীরার তালায় বন্যা পরিস্থিতি দিনদিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। পানিবন্দি মানুষের মধ্যে চলছে নিরব ক্রন্দন। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বুধবার পর্যন্ত ৮০টি গ্রামের প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এলাকায় স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দেখা দিয়েছে খাদ্যের সংকট। বেশি অসুবিধায় আছে শিশুরা। দেখা দিয়েছে পানি বাহিত রোগ। ধনী-গরিবের নেই কোন ভেদা-ভেদ। সকলে পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন-যাপন করছে। আর যে কোন মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যাবে আঠারোমাইল-পাইকগাছা সড়ক। বর্তমানে গোনালী হতে পাকার মাথা পর্যন্ত প্রায় হাফ কিলোমিটার সড়ক পানিতে তলিয়ে আছে। এদিকে প্লাবিত এলাকায় বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের ঋন কার্যক্রম চালু রেখেছে। এতে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। পানিবন্দি এলাকার অনেকে আক্ষেপ করে বলেন,‘সংস্থাগুলো মরার উপর খাড়ার ঘা দিচ্ছে। পানিবন্দি থেকে কিভাবে কিস্তির টাকা জোগাড় করবো ?। কিস্তি না দিতে পারলেও সংস্থার কর্মীরা নানা ভাবে গালাগাল দেয়।’
তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ অক্টোবর পর্যন্ত তালা উপজেলার ১২ টি ইউনিয়নের ৪৫টি গ্রামের ১৫ হাজার পরিবারের ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে তিন হাজার ৫০ পরিবার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে ৪৫ মে.টন চাউল বরাদ্দ হয়। সরকারের বরাদ্দকৃত চালের হিসাব মতে, জনপ্রতি ৪৫০ গ্রাম করে চাউল বরাদ্দ হয়েছে। সেটিও এখনও বিতরণ করা হয়নি।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ৮০ গ্রামের ১৬ হাজার ৫০০ পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। এরমধ্যে প্রায় নয় হাজার পরিবার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বুধবার সরেজমিনে উপজেলার খরাইল, ভবানিপুর, কাজিডাঙ্গা, নারানপুর, ঘোনা, ঘোষনগর, কানাইদিয়া ও গোনালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় জীবন-যাপন করছে। কোন কোন পরিবার চলাচলের জন্য সাঁকো তৈরি করে নিয়েছে। অনেকে উঁচু রাস্তার দু’ধারে আশ্রয় নিচ্ছে। এই এলাকার অধিকাংশ সড়ক পানিতে তলিয়ে আছে। এলাকার মানুষের হাতে কাজ নেই। ত্রাণের অপেক্ষায় আশ্রিত মানুষ রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন। অনেকে কাজের সন্ধানে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এছাড়া আঠারোমাইল-পাইকগাছা সড়কের গোনালী হতে পাকারমাথা পর্যন্ত সড়ক পানিতে তলিয়ে আছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে বিভিন্ন যানবাহন।  যে কোন মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যাবে সড়কটি।
বাস চালক নজরুল ইসলাম জানান, প্রায় ১৫ দিন ধরে তারা পানির মধ্যে দিয়ে যাতয়াত করছেন। আর দুই-একদিন ওই অবস্থা থাকলে বড় ধরণের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখন চলাচল করতে হচ্ছে।
গোনালী গ্রামের নারাণ বিশ্বাস জানান, তার বাড়িসহ আশপাশের বাড়ি-ঘর সব তলিয়ে গেছে। বুধবার পর্যন্ত তারা কোন সাহায্য পায়নি। একই গ্রামের নওশের সরদার জানান, গতকয়েক বছর ধরে তারা পানির সাথে লড়াই করে যাচ্ছেন। এবারও তাদের বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে। আর একটু পানি বাড়লে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হবে তাদের।
ভবানিপুর গ্রামের ঝর্ণা মন্ডল জানান, তার বাড়িতে পানি উঠে গেছে। ওই পানিতে চলাচল করে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে চুলকানি-পাঁচড়া উঠেছে। তিনি পার্শ্ববর্ত্তী একটি ক্লিনিক থেকে ঔষুধ নিয়েছেন।
ঘোষনগর গ্রামের বিষ্টুপদ মন্ডল আক্ষেপ করে বলেন,‘আমাদের মধ্যে কোন আনন্দ নেই। কখন জল থেকে বাঁচবো, আর কখন আনন্দ করবো। পূজা আমাদের ভাগ্যে নেই। এখন জলের সাথে লড়াই করতে হচ্ছে।’
নারানপুর গ্রামের রোজিনা খাতুন জানান, তার বাড়ি সহ আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে এলাকার স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। মহিলা ও শিশুদের বেশি সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। এমন বক্তব্য প্লাবিত এলাকার অনেকের।
ভবানিপুর গ্রামের ইউপি সদস্য নিরাপদ মন্ডল জানান, তার বাড়ি সহ আশপাশের সব বাড়ি পানিতে তলিয়ে আছে। পানির মধ্যে মানুষ বসবাস করছে। অনেকের অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে। মানুষের হাতে কোন কাজ নেই।
খলিলনগর ইউপি চেয়ারম্যান প্রণব ঘোষ বাবলু জানান, তার ইউনিয়নের ছয়টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি মানুষের ঈদ ও পূজার আনন্দ বিলান হচ্ছে। মানুষের হাতে কোন কাজ নেই। বুধবার বিকেল পর্যন্ত তিনি কোন বরাদ্দ পাননি।
জালালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম মফিদুল হক লিটু জানান, তার ইউনিয়নের এক হাজার ৬০০ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন-যাপন করছে। অনেকের অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে। এরমধ্যে বিভিন্ন এনজিও তাদের ঋণ কার্যক্রম চালাচ্ছে। এতে মানুষের আরও কষ্ট বাড়ছে।
ইসলামকাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক জানান, তার ইউনিয়নের ১৬ টি গ্রামের মধ্যে ১০ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আর ছয়টি গ্রামে পানি ছুই ছুই অবস্থা। স্যানিটেশন’র জন্য পানিবন্দি মানুষ বেশি অসুবিধায় পড়েছে। সরকারি ভাবে তিনি বুধবার পর্যন্ত  তিন মে.টন চাউল বরাদ্দ পেয়েছে।
তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্্েরর প.প. কর্মকর্তা ডা. জাহিরুল হাসান জানান, প্লাবিত এলাকায় ওষুধ সরবরাহ অব্যাহত আছে।
পানিবন্দি এলাকায় স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে উল্লেখ করে তালা উপজেলা জনস্বাস্থ্য’র উপ-সহকারী প্রকৌশলী আমিনূল ইসলাম বলেন,‘অনেক টিউবয়েল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কারণে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।’
তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, মানুষ অনেক কষ্টের মধ্যে বসবাস করছেন। বিষয়টি আমি উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। আর ঋণ আদায়ের বিষয়টি নিয়ে আমি সংস্থাগুলোর সাথে আলাপ করেছি। এবং তাদের পানিবন্দি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহব্বান জানিয়েছি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ড. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, ঋণ আদায়ের বিষয়টি আমার জানা নেই। প্লাবিত এলাকায় ঋণ আদায় নিয়ে আমি সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করবো। তবে এসময় পানিবন্দি মানুষের পাশে দাঁড়ানো জুরুরি।