আগুনে পুড়ে মরার দায় শ্রমিকের?

আগুন-দুর্ঘটনা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পিছ ছাড়ছেই না। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এর কোনোটিতে  প্রাণহানি ঘটছে, কোনোটিতে ঘটছে না। কিন্তু প্রাণহানি না ঘটলেও তা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের কর্মপরিবেশ আর শ্রমিক নিরাপত্তাকে বারবার প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে তা।
তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ড আর রানা প্লাজা ভবনধসের ঘটনার পর বিশ্বে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নিয়ে যখন সমালোচনা আর অস্থিরতা চলছে, ঠিক সেই সময় আবার অগ্নিকাণ্ড আর প্রাণহানি ঘটল। মঙ্গলবার বিকেলে গাজীপুরের শ্রীপুরে পলমল গ্রুপের আসওয়াদ কম্পোজিট মিলসে আগুনের ঘটনায় সাতটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আরো পাঁচজন নিখোঁজ বলে দাবি করা হচ্ছে। ওই কারখানার নিটিং সেকশনের দোতলায় একটি স্ট্যান্ডার্ড মেশিন অতিরিক্ত গরমে বিস্ফোরিত হলে পাশে থাকা সুতা ও উৎপাদিত পণ্যে আগুন ধরে যায়।
ইতমধ্যে তাজরীন ফ্যাশনস আর রানা প্লাজার ঘটনায়  আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যে বাণিজ্য অগ্রাধিকারসুবিধা (জিএসপি) বাতিল হয়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্য ক্রেতাদেশগুলো পোশাকশিল্পে শ্রমিকের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশের বিষয়টি বিশেষ নজরদারিতে রাখছে। এর মধ্যেই তারা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের উন্নয়নে নানাভাবে সহায়তার চেষ্টাও করছে। বাংলাদেশে ছয় শর মতো পোশাক কারখানা পরিদর্শনে আসছে বিদেশী পরিদর্শকরা। তারা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তাব্যাবস্থার উন্নয়নে কোটি কোটি ডলার অনুদান দেয়ার কথাও ঘোষণা করেছে। কিন্তু এত সব ইতিবাচক খবরের মধ্যে মঙ্গলবারের প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ড ক্রেতাদের বিব্রত করবে বলেই অনুমান করা যায়।
সস্তা শ্রমের কারণে বাংলাদেশের প্রতি বিদেশী ক্রেতাদের বরাবরের আগ্রহের দিকটি এভাবে একের পর এক দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারত ও ভিয়েতনাম এই খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড আর দুর্ঘটনার ঘেরাটোপ থেকে বেরোতে না পারলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বাজার হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্পে এত দুর্ঘটনা কেন ঘটছে? দেশের অন্যান্য খাতে হাজার হাজার শিল্প-কলকারখানা রয়েছে; সেগুলো তো এভাবে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে না। তাহলে কি এসব নাশকতা? এ আশঙ্কা অবশ্য বহুবার উঠেছে নানা মহল থেকে। কিন্তু তা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নিয়েছে পোশাকশিল্পের মালিকরা?
আমরা মনে করি, পোশাকমালিকদের অবহেলা আর অতিমোনাফার মানসিকতায় এসব অগ্নিকাণ্ডের প্রধান কারণ। কেননা, প্রায় প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত শর্টসার্কিট, অতিরিক্ত চাপে বৈদ্যুতিক তারে আগুন লাগা, কোনো ইলেকট্রিক সামগ্রী গরম হযে বিস্ফোরণ, ইস্ত্রি থেকে আগুন ইত্যাদি। এসব তো অপ্রতিরোধযোগ্য কিছু নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাহিদার সহনক্ষমতার বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও সামগ্রী ব্যবহৃত হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পোশাকশিল্পে তা অনুসরণ করা হচ্ছে বলে মনে হয় না। যোগ্য প্রকৌশলীর পরামর্শে ধারণক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে এসব সামগ্রী বাছাই করা উচিত।
আবার হয়তো সঠিক সামগ্রীই ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু অতিমোনাফার আশায় পোশাকমালিকরা একটানা অতিরিক্ত সময় কারখানা চালু রাখেন। ৫০টি ইউনিটের জায়গায় ৩০টি ইউনিট দিয়ে রাতদিন উৎপাদনকাজ চালানো হয়। এতে বৈদ্যুতিক সামগ্রীর সহনক্ষমতা নষ্ট হয়, ফলে যখন-তখন ঘটছে অগ্নিকাণ্ড।
আবার দেখা যায়, উৎপাদিত পণ্য গুদামে স্থানান্তর না করে উৎপাদনস্থলে জড়ো করে রাখা হয়। গুদামে বৈদ্যুতিক তার টানার নিয়ম না থাকলেও সেখানে জ্বালানো হয় বৈদ্যুতিক বাতি। একটি ভবন থেকে আরেকটির মাঝখানে পর্যাপ্ত জায়গা না রেখে নির্মাণ করা হচ্ছে কারখানা কমপ্লেক্স। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুতই ছড়িযে পড়ে আগুন।
প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়, হয়তো তদন্তও হয়। কিন্তু কোনো প্রতিকার দেখা যায় না। এত এত প্রাণহানির জন্য কউকে দায়ী হতেও দেখা যায় না। তাহলে এসব আগুনে পুড়ে মরার দায় কি শ্রমিকের নিজের? আমরা মনে করি, পোশাক কারখানার দুর্ঘটনার জন্য দায় ব্যক্তিদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। না হলে পোশাকমালিকদের যেনতেনভাবে কারখানা পরিচালনার মানসিকতা দূর হবে না।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের খাতের ভবিষ্যতের সঙ্গে এখন জড়িয়ে আছে দেশের ভবিষ্যৎ। এই খাতে প্রায় ৪০ লাখ কর্মী নিয়োজিত, যাদের অধিকাংশ নারী। কাজেই এই খাতটি নিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা কাম্য নয় নয়। আমরা আর পোশাকশিল্পে লাশ দেখতে চাই না। আমরা চাই পোশাকশিল্পের অনন্ত সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে দেশ এগিয়ে যাক। সরকার ও মালিকপক্ষ সচেতন না হলে তা দেশের জন্য সমূহ বিপদ ডেকে আনবে।