ইছামতী নদীতে দু’বাংলার প্রতিমা বিসর্জন

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজার সোমবার শেষ দিন। এবার বিজয়া দশমীতে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার সীমান্তের ইছামতী নদীতে নিজ নিজ জল সীমার মধ্যে থেকে প্রতিমা বিসর্জন দেয়ায় অনুষ্ঠিত হয়নি শত বছরের ঐতিহ্যবাহী দুই বাংলার মানুষের মিলন মেলা।

প্রতি বছর আন্তর্জাতিক সীমানা মুছে দু’বাংলার মানুষ কিছুক্ষণের জন্য হলেও একাকার হয়ে যেত এই বিসর্জনকে ঘিরে। তবে এবার দিল্লী সরকারের নির্দেশে কোনভাবেই আন্তর্জাতিক সীমারেখা পার হয়ে দু’দেশের লোক যাতায়াত করতে পারেনি। এনিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গেছে দু বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে।

আবহমানকাল থেকে বাঙালী সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী দু’বাংলার মানুষ এই দিনটির জন্য গভীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকে। প্রতি বছর বিজয়া দশমীতে এই মিলন মেলায় যোগদানের জন্য সীমান্তের ইছামতী নদীতে আসেন দু’বাংলার হাজার হাজার মানুষসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কিন্তু এবার ভারত সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে সেটা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

সাতক্ষীরাস্থ বিজিবি ৩৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল কে এম ইমাম আহসান জানান, প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও সীমান্ত নদী ইছামতীতে দুই দেশের প্রতিমা বিশ্বজন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে এ বছরে স্ব স্ব দেশের জলসীমানার মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। বিসর্জনের সময় কোন দেশের দুর্বৃত্তরা যেন সীমান্ত পার হয়ে অন্য দেশে ঢুকতে না পারে সে জন্য বিজিবি ও বিএসএফ’র কড়া নজর দারী রাখা হয়েছিল।

দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ ন ম তরিকুল ইসলাম জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর বিজিবি-বিএসএফ ব্যাটালিয়ন পর্যায়ের পতাকা বৈঠকে বিএসএফ জানিয়ে দিয়েছিল, দিল্লি সরকারের নির্দেশে কোনভাবেই আন্তর্জাতিক সীমারেখা পার হয়ে দু’দেশের লোক যাতায়াত করতে পারবে না । এ আদেশ অমান্য করে কেউ সীমারেখা অতিক্রম করলে তাকে গ্রেফতার করা হবে। ফলে এবছর দুর দূরান্ত থেকে আসা এপার-ওপার বাংলার মানুষ মিলন মেলার আনন্দ বঞ্চিত হয়ে নিজ নিজ জল সীমানায় থেকে প্রতিমা বিসর্জন করেছেন।

উল্লেখ্য, অবিভক্ত বাংলার এককালের ইছামতী নদী কালের প্রবাহে আজ দুইটি দেশের সীমানা নির্ধারণ করেছে। দেশ বিভাগের পর ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী বয়সের ভারে নুহ্য যারা এখনও জীবিত আছেন, তারা আজ জীবন সায়াহ্নে এসেও মাতৃভূমির মাটি একবারের মত স্পর্শ করার জন্য এই দিনটির অপেক্ষা করে থাকেন। বিজয়া দশমীতে ইছামতী নদীতে এসে তাই তারা সে সাদ পূর্ণ করার চেষ্টা করে থাকেন। বিজয়া দশমী উপলক্ষে সাতক্ষীরা সীমান্তের ইছামতী নদীর আন্তর্জাতিক সীমানা মুছে দু’বাংলার মানুষ কিছুক্ষণের জন্য একাকার হয়ে যান। দু’দেশের মানুষের আবেগ আর উচ্ছ্বাসের কাছে হার মানে সীমান্তের বেড়াজাল। ভারতের কলকাতা থেকে ও জাহাজ ভাড়া করে মানুষ আসত এই মিলন মেলায়। দুপুরের সাথে সাথে নদী গর্ভে ভরে যেত দুই পারের নৌকা, ট্রলার, কার্গো, লঞ্চ এবং জাহাজে। কেউ আসত স্বপরিবারে, আবার কেউ আসত বন্ধুদের নিয়ে এই মিলন মেলা উপভোগ করার জন্য।

প্রতিমা বিসর্জন কালে সীমান্তের ইছামতী নদীতে ভারতের টাকী ও বাংলাদেশের টাউন শ্রীপুর এলাকা পরিণত হয় দুই বাংলার মানুষের এক মিলন মেলায়। তবে এবার এটির ব্যতিক্রম হয়েছে।