ঈদ ম্লান হয়ে গেছে মাইকেলের সাগরদাড়িবাসীর

স্পন্দন ডেস্ক : অতিবর্ষণ আর কপোতাক্ষের উপচে পড়া পানিতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন যশোরের কেশবপুর উপজেলার ৩০ গ্রামের অর্ধলাখ মানুষ। গত প্রায় ৩ মাস ধরে জলাবদ্ধতায় তারা দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন।

পানিবন্দির কারণে তাদের ঈদ-পুজোর আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। বরং স্বাভাবিক জীবনযাপনই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সঙ্কটের কারণে মানবেতর জীবন যাপন করছেন ক্ষতিগ্রস্ত এ মানুষগুলো।

দিনের পর দিন এ অবস্থা বিরাজ করলেও সরকারি বেসরকারি পর্যায় থেকে এখনও পর্যন্ত তেমন কোনো সাহায্য সহযোগিতা মেলেনি।

জলাবদ্ধ এলাকা ঘুরে ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতি বৃষ্টি ও কপোতাক্ষ নদের উপচে পড়া পানিতে কেশবপুর উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের অন্তত ৩০টি গ্রামে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

এরমধ্যে সাগরদাড়ি ও বিদ্যানন্দকাঠি ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এর পরেই ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় রয়েছে মজিদপুর, কেশবপুর, ত্রিমোহিনী ও সুফলাকাঠি ইউনিয়ন।

এ সব ইউনিয়নের নেহালপুর, আওয়ালগাতি, রেজাকাটি, বগা, মহাদেবপুর,  ফতেপুর, সাগরদাঁড়ি, কোমরপুর, শেখপুরা, চিংড়া, ধর্মপুর, কাস্তা, মেহেরপুর, বাঁশবাড়িয়া গ্রামের হাজার হাজার মানুষ গত ৩ মাস ধরে জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

জলাবদ্ধতার কারণে ঈদগাহ ময়দান ও দুর্গা পূজার মণ্ডপগুলিতে পানি উঠেছে। ফলে ঈদ ও পূজার আনন্দও বিলীন। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোর মানুষকে এবার ঈদের নামাজ পড়তে হবে কোন উঁচু রাস্তায়। অবস্থা এমন হয়েছে, এখন কোনো কোনো গ্রামে লাশ দাফনের জন্যও কোনো শুকনো স্থান নেই।

সম্প্রতি জলাবদ্ধ নেহালপুর গ্রামের হাফিজউদ্দীন দফাদারের স্ত্রী আকলিমা খাতুনের মৃত্যু হলে তাকে পাশের ফতেপুর গ্রামের একটি উচুস্থানে নিয়ে দাফন করতে হয়েছে।

কেশবপুর-পাটকেলঘাটা,কেশবপুর-সাগরদাঁড়ি সড়কের ৬/৭টি স্থানে ৩/৪ ফুট করে পানি উঠে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মানুষের বসত ঘরে বুক সমান পানি উঠে যাওয়ায় অনেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন।

কিন্তু সেখানেও কোনো কোনো স্কুল কর্তৃপক্ষ অবস্থান করতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আওয়ালগাতি স্কুলে অসহায় মানুষ আশ্রয় নেয়ার জন্য গেলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের সরকারি অনুমতি না থাকার কথা বলে আশ্রয় নিতে দেয়নি।

নেহালপুর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ আশ্রয় দিতে আপত্তি জানালেও দুর্যোগের শিকার মানুষগুলো এক প্রকার জোর করেই সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন।

গত ৩ মাস ধরে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত থাকায় খেটে খাওয়া মানুষের কোন কাজ নেই। কাজ না থাকায় উপার্জনহীন অবস্থায় তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এলাকার বিলগুলির শতাধিক মাছের ঘের প্লাবিত হয়ে লাখ লাখ টাকার মাছের ক্ষতি হয়েছে। শুকনো মাটি না থাকায় প্লাবিত এলাকার মানুষ তাদের গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি দূরের আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ ব্যাপারে বিদ্যানন্দকাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কে এম খলিলুর রহমান জানান, তার ইউনিয়নের ২৪টি গ্রামের ভিতর ১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। যার মধ্যে ৫টি সম্পূর্ণ ও ৭টি আংশিক। শতাধিক কাঁচাঘর বাড়ি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ইউনিয়নের ২ শতাধিক পরিবার বাড়িঘর ত্যাগ করে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।

নেহালপুর ও আওয়ালগাতি গ্রামের ওমর আলি, আব্দুল কাদের, রবিউল, ছখিনা খাতুন, শিল্পী বেগম জানান, গত তিন মাস ধরে তারা  অবর্ণনীয় দুর্ভোগে দিন কাটালেও তেমন কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাননি।

কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলন সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহবায়ক অ্যাডভোকেট আবু বকর সিদ্দিকী  জানান, উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত ৩০ গ্রামের অর্ধলাখ মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে দিন পার করছেন। সরকারি কিছু সাহায্য ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত পৌঁছালেও জনগণের কাছে এখনও পৌঁছায়নি।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম জানান, উপজেলার বিদ্যানন্দকাঠি ইউনিয়নের ভিজিএফ এবং জিআর প্রকল্পের আওতায় মোট ৩০ মেট্রিক টন এবং সাগরদাড়ি ইউনিয়নে ভিজিএফ ও জিআর প্রকল্পের আওতায় সাড়ে ২৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তা বিতরণ শুরু হয়েছে।

একইসঙ্গে স্থানীয় বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে সাহায্য সহযোগিতার ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে। সমন্বিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে।