কুষ্টিয়ায় ফকির লালন শাহের ১২৩ তম তিরোধান দিবস

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি : বাউল সম্রাট মরমী সাধক ফকির লালন শাহের ১২৩ তম তিরোধান (মৃত্যুবার্ষিকী) দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়া বাড়ীতে সাঁইজির বারাম খানায় ঈদের দিন বুধবার থেকে শুরু হচ্ছে ৫দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা ও লালন মেলা। দেশের বৃহৎ মোবাইল ফোন কোম্পানী বাংলা লিংকের সহযোগিতায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় ও কুষ্টিয়া লালন একাডেমির আয়োজনে এবারের ভিন্ন আমেজের তিরোধান দিবস পালন উপলক্ষে আখড়া বাড়ীতে সকল প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ সত্য সু-পথের সন্ধ্যানে মানবতার দিক্ষা নিতে ইতিমধ্যেই আত্মার টানে দেশ-বিদেশের সাধুগুরু ও ভক্তরা দলে দলে এসে আসন গেড়েছে সাঁইজির মাজারে। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী প্রতিবার তিনদিনের এ উৎসব পালিত হলেও বিগত কয়েক বছর ধরে তা বাড়িয়ে পাঁচদিনের প্রথা চালু করলেও এবার তার ভিন্নতা রয়েছে। এবার প্রথম দিন পবিত্র ঈদের দিন হওয়ায় ওই দিন শুধুমাত্র সন্ধ্যায় লালন ভক্ত ও ভেগধারী সাধুগুরুদের নিজস্ব পরিবেশনায় ঘরোয়ানা সঙ্গীত পরিবেশন হবে। ফলে মূল অনুষ্ঠান ৫ দিনের স্থলে ৪ দিন করা হয়েছে।
আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হোক আমাদের দিন বদলের অনুপ্রেরণা এ প্রতিপাদ্য শ্লোগানকে বাস্তবায়িত করতে বাউল সম্রাটের ১২৩ তম তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠানমালাকে সাজানো হয়েছে ৪ দিনব্যাপী। মূল উৎসব শুরু হওয়ার ৫-৬ দিন আগ থেকে আখড়ায় আসা বাউল সাধকরা মাজারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে গেয়ে চলেছে সাঁইজির আধ্যাত্মিক মর্মবাণী ও ভেদ তথ্যের গান। জমজমাট এখন লালন শাহের আখড়া বাড়ি। কুষ্টিয়া পরিণত হয়েছে উৎসবের শহরে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সহযোগিতায় ও লালন একাডেমীর আয়োজনে ১৬ অক্টোবর ঈদের দিন থেকে শুরু হয়ে একটানা ২০ অক্টোবর রবিবার পর্যন্ত ৪ দিনব্যাপী বাউল সম্রাট সাধক ফকির লালন শাহের ১২৩ তম তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান চলবে। আখড়া বাড়ীতে মঞ্চ ও লালন মেলার স্টল নির্মাণ ও মাজার ধোয়া মোছার কাজ শেষ করা হয়েছে বেশ কয়েকদিন আগে। ১৭অক্টোবর বৃহস্পতিবার ৪ দিনব্যাপী বাউল সম্রাট মরমী সাধক ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবসের (মৃত্যুবার্ষিকী) অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখবেন বিশিষ্ট লালন গবেষক ড.আনোয়ারুল করিম, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ, জেলা পরিষদের প্রশাসক জাহিদ হোসেন জাফর, কুষ্টিয়া পৌরসভার মেয়র আনোয়ার আলী, জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মহসীন, পিপি এড. নুরুল ইসলাম দুলাল ও বাংলা লিংকের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ আংকিত সুরেকা। প্রধান আলোচক হিসেবে থাকছেন বিশিষ্ট লালন গবেষক এড. লালিম হক ও শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন লালন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক রেজানুর রহমান খান চৌধুরী মুকুল। সুষ্ঠুভাবে আয়োজন সম্পন্ন করতে নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি অনুষ্ঠানস্থলে থাকবে র‌্যাব ও সাদা পোষাকে গোয়েন্দা পুলিশ।
উল্লেখ্য, বৃটিশ শাসকগোষ্ঠির নির্মম অত্যাচারে গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনকে যখন বিষিয়ে তুলেছিল, ঠিক সেই সময়ই সত্যের পথ ধরে, মানুষ গুরুর দিক্ষা দিতেই সেদিন মানবতার পথ প্রদর্শক হিসাবে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহর আবির্ভাব ঘটে কুমারখালির ছেঁউড়িয়াতে। লালনের জন্মস্থান নিয়ে নানা জনের নানা মত থাকলেও আজো অজানায় রয়ে গেছে তার জন্ম রহস্য। তিনি ছিলেন নি:সন্তান। আর্থিক অসংগতির কারনে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। তবে তিনি ছিলেন স্বশিক্ষায় শিক্ষিত। যৌবনকালে পূর্ণ লাভের জন্য তীর্থ ভ্রমনে বেরিয়ে তার যৌবনের রূপান্তর ও সাধন জীবনে প্রবেশের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। তীর্থকালে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে তার সঙ্গীরা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। পরে মলম শাহর আশ্রয়ে জীবন ফিরে পাওয়ার পর সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যে তিনি সাধক ফকিরী লাভ করেন। ভক্ত মলম শাহের দানকৃত ষোল বিঘা জমিতে ১৮২৩ সালে লালন আখড়া গড়ে ওঠে। প্রথমে সেখানে লালনের বসবাস ও সাধনার জন্য বড় খড়ের ঘর তৈরী করা হয়। সেই ঘরেই তার সাধন-ভজন বসতো। ছেঁউড়িয়ার আঁখড়া স্থাপনের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শিষ্যভক্তদের নিয়ে পরিবৃত থাকতেন। তিনি প্রায় এক হাজার গান রচনা করে গেছেন। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ভোরে এ মরমী সাধক বাউল সম্রাট দেহত্যাগ করেন এবং তার সাধন-ভজনের ঘরের মধ্যেই তাকে সমাহিত করা হয়। আলোচনা শেষে দ্বিতীয় পর্বে লালন মঞ্চে বিভিন্ন শিল্পি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হবে লালন সঙ্গীত। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন দেশের খ্যাতনামা শিল্পীরাসহ লালন একাডেমীর স্থানীয় শিল্পিরা। তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠানটি সার্বিক উপস্থাপনা ও পরিচালনা করবেন কবি শুকদেব সাহা।