উপকূলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন

ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের জন্য অনেকটা অপ্রতিরোধ্য নিয়তি যেন। বিশেষ করে, উপকূলীয় অঞ্চলে এর প্রভাব পড়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে উপকূলের বাঁধগুলো রক্ষা করা জরুরি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই বাঁধগুলো নিয়ে বহু বছর ধরে চলছে নানা অনিয়ম, যা উপকূলবাসীর জন্য মারাত্মক হুমকি। এসব বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)। উপকূলীয় দুর্যোগ সুরক্ষা ব্যবস্থায় এ ধরণের দুর্বলতা নিয়ে সমকালসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সম্প্রতি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। প্রচুর অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অনেক আশ্রয়কেন্দ্র মাত্র কয়েক বছরেই জরাজীর্ণ! গোটা উপকূলীয় বাঁধ নেটওয়ার্কের নাজুক পরিস্থিতি, অপ্রতুল ও অকেজো আশ্রয়কেন্দ্র তার পরও দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জীবন ও স¤পদ সুরক্ষা ব্যবস্থার ফাঁকগুলো পূরণে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি দেখা যায়নি। স্বীকার করতে হবে, উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। নীতিগত প্রস্তুতিও সন্তোষজনক। নব্বই দশকে প্রণীত আমাদের দুর্যোগ প্রস্তুতির স্থায়ী আদেশটি উন্নত বিশ্বেও প্রশংসিত। সীমিত সাধ্যের মধ্যেও আমরা যেভাবে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নিয়েছি; ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, গবাদিপশুর জন্য মাটির কেল্লা এবং জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলায় বাঁধ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছি, তা কোনো কোনো উন্নত দেশের কাছেও অনুসরণযোগ্য বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু অবকাঠামোগত ব্যবস্থায় যে দুর্বলতা, তা দূর করা না গেলে উপকূলবাসীর জীবন ও স¤পদ হুমকির মুখে থেকেই যাবে। এ ক্ষেত্রে উপকূলীয় বাঁধ নেটওয়ার্কটি শক্তিশালী করে তোলার বিকল্প নেই। আইলা ও সিডরের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় অনেক বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর অনেক অংশ এখনও মেরামত করা সম্ভব হয়নি। আমরা মনে করি, উপকূলের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ও স¤পদ রক্ষার সঙ্গে জড়িত এসব স্থাপনা নির্মাণ, মেরামত কিংবা সংস্কারে দুর্নীতি ও অপব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনোরকম সহিষ্ণুতা দেখানোর অবকাশ নেই। কতিপয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থে হাজার হাজার মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, বাঁধ নির্মাণ কিংবা সংস্কারের ব্যয়ও কম নয়। আমরা মনে করি, উপযুক্ত পরিকল্পনা, নকশা, মানসম্মত নির্মাণকাজ ও তদারকি নিশ্চিত করা গেলে কেবল বিপুল অপচয়ই রোধ করা সম্ভব। একই সাথে হাজার হাজার মানুষের জীবনও সুরক্ষিত থাকত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড তো মূল কাঠামোই সুরক্ষিত করতে পারছে না, উচ্চতা বাড়াবে কীভাবে? আমরা আশা করি, মৌসুমি তৎপরতা নয়, উপকূলীয় বাঁধের সাংবাৎসরিক তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণে মনোযোগ দেবেন সংশ্লিষ্টরা। একই সাথে আধুনিক পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ (পাউবো) টেকসই বাঁধ নির্মাণ করবে, যা গোটা উপকূলীয় এলাকার বাঁধগুলো রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হবে।  এ ছাড়া দুর্বল বাঁধগুলোকে টেকসই করতে ব্যবহার করতে হবে আধুনিক পদ্ধতিতে তৈরি স্ল্যাব। এ স্ল্যাবসহ আনুষঙ্গিক উপকরণ ব্যবহার করলেই বাঁধগুলো টেকসই হবে।