লাভজনক হওয়ায় বিলুপ্তপ্রায় তিলের চাষ বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক:তিলের চাষ এখন খুব একটা হয় না। অথচ তিল চাষ লাভজনক। উন্নত জাতের তিলের হেক্টর প্রতি ফলন দেড় টন। চলতি বছরের বাজার দর টন প্রতি টন ৪৫ হাজার ৭২০ টাকা হিসেবে তার দাম ৬৮ হাজার ৫৮০ টাকা। অন্য যেকোনো ফসলের চাষ করা হলে এর চেয়ে লাভ হয় না। তিলের বিলুপ্তি রোধ এবং হারানো  ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে তাই কৃষি বিভাগ তিল চাষ সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত বারি তিল-৪  লাভজনক হওয়ায় কৃষকেরা এদিকে ঝুঁকছেনও।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিন বিভাগের অধ্যাপক ড. সারওয়ার জাহান ও কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের বিপণন পরামর্শক নছর উদ্দিন এক যুক্ত রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন, দেশে তিলের প্রায় হারিয়ে যাওয়া পর্যায়ে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তিলের সর্বোৎকৃষ্ট আধুনিক জাত নির্ধারণে ২০০৯-২০১১ আবাদ মৌসুমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। প্রথমে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার ৪৮ জন কৃষককে পরীক্ষা কাজে সম্পৃক্ত করে বারি তিল-৪ অধিক ফলনশীল জাত বলে নির্ধারিত হয়। পরে এর প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য বটিয়াঘাটা উপজেলার দেবীপুর ও বসুরাবাদ এবং ডুমুরিয়া উপজেলার হাজিবুনিয়া ও কাপালিডাঙ্গার ১৫০ জন কৃষককে সম্পৃক্ত করা হয়। গবেষণার প্রথম বছরেই বারি তিল-৪ এর ফলন স্থানীয় জাতের তিলের চেয়ে ২২৫ ভাগ বেশি  পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক চাষ ও পরিচর্যা বাদে হেক্টর প্রতি ৪৫ কেজি ইউরিয়া, ৫০ কেজি টিএসপি ও ১০ কেজি বোরাক্স প্রয়োগ বাবদ খরচ হয়েছে তিন হাজার ৯৫০ টাকা। দ্বিতীয় বছর আরো ৭০০ কৃষককে এ কাজের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে খুলনা, যশোর ও কুষ্টিয়া জেলায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টরে বারি তিল-৪ এর আবাদ হচ্ছে।
যশোরের শার্শা উপজেলার তিল চাষি হায়দার আলী জানান, তিনি এক বিঘা জমিতে বারি তিল-৪ এর চাষ করেছেন। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ৫০০ টাকার সার প্রয়োগ করেছেন। এ সাথে জমি চাষ ও পরিচর্যাসহ খরচ পড়েছে এক হাজার টাকা মতো। তার জমিতে পাঁচ মণ তিল হবে বলে আশা করছেন। প্রতিমণ দুই হাজার টাকা হিসেবে তিনি পাবেন ১০ হাজার টাকা। নয় হাজার টাকা তার লাভ থাকবে। অল্প খরচে এমন লাভ অন্য কোনো ফসলে হয় না বলে তিনি জানান।
তিল বিষয়ক গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, তিলে মান সম্পন্ন আমিষ থাকায় এর খাদ্যমান অনেক বেশি। এতে রয়েছে উন্নতমানের ফ্যাটি অ্যাসিড যা মানব দেহের রোগ প্রতিরোধ করে। এই ফ্যাটি অ্যাসিডের ৯০ ভাগই অসম্পৃক্ত। এর মধ্যে আলফা লিনোলেইক অ্যাসিড, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যসিড এবং পেন্টানয়িক অ্যাসিড অন্যতম। এগুলো কোলেস্টরেল কমায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিনের রান্নায় তিলের তেল ব্যবহার করায় উচ্চ রক্তচাপের একজনের রক্ত চাপ ১৬৬ থেকে ১৩৪-এ (সিস্টোলিক) এবং ১০১ থেকে ৮৪ দশমিক ৬-এ (ডায়াস্টোলিক) নেমেছে। এতে যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন ‘ই’ থাকায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং ক্যানসার সৃষ্টিতে সহায়তাকারী  ফ্রি র‌্যাডিক্যাল বা মুক্ত আয়রন সমূহকে ধ্বংস করে। তিল শিশুদের ব্রেনের পরিপূর্ণতায় ভূমিকা রাখে। বহুমুখী গুণের কারণে তিলকে তেল বীজের রাণী বলা হয়।
২০০৯ সালের আগেকার সময়ে স্থানীয় জাতের তিলের আবাদ হতো। কিন্তু ফলন অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় লোকসানের কারণে কৃষকেরা এর চাষে উৎসাহ হারায়। এর ফলে এই ফসলটি হারিয়ে যেতে বসে। এর অস্তিত্ব তিলের খাজা আর কনফেকশনারির বিস্কুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অথচ উন্নত বিশ্বে তিলের উৎপাদন ও ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। জাপানের প্রধান ভোজ্য তেল হলো তিল। তারা ভাতের সাথে খোসা ছাড়ানো তিল ছড়িয়ে দিয়ে খায়। ভাত ও তিল দিয়ে বানানো রাইস বল তাদের প্রিয় খাদ্য। আমেরিকা ও ইউরোপের মানুষ বার্গার বা সাধারণ রুটির ওপরে জেলির সাহায্যে তিল লাগিয়ে খায়।