এখনও আঁধার হলো না দূর

মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল:আজ ২৩ অক্টোবর। শহীদ কমরেড তোজো, কমরেড আসাদ, কমরেড শান্তি,কমরেড মাণিক ও  কমরেড ফজলুর ৪২তম মৃত্যু বার্ষিকী।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তানের কমউনিস্ট পার্টি (এম, এল) স্বতন্ত্র অবস্থানে থেকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোষরদের বিরুদ্ধে সশস্ত যুদ্ধ পরিচালনা কালে  সেই যুদ্ধের অন্যতম সৈনিক হিসাবে তারা মনিরামপুর থানার লক্ষনপুর গ্রাম থেকে রাজাকার বাহিনীর হাতে ধৃত হন এবং ২৩ অক্টোবর তারিখে তাঁদেরকে চীনাটোলায় নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। কমরেড আসাদুজ্জামান ছিলেন তদানীন্তন এম, এম, কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি, ১১ দফা আন্দোলনের যশোর জেলার আহ্বায়ক। কমরেড সিরাজুল ইসলাম শান্তি ছিলেন যশোর জেলা কৃষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক।কমরেড আহসান উদ্দিন মাণিক ছিলেন পূব্র্ পাকিস্থান ছাত্র ইউনিয়ন যশোর জেলা কমিটির সভাপতি। কমরেড ফজলু দফাদার ছিলেন তদানীন্তন পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে আগত পার্টিতে সদ্য যোগদানকারী পার্টি কর্মী ও যোদ্ধা।
কমরেড মাশুকুর রহমান তোজো ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অংক শাস্ত্র ও পদার্থ বিজ্ঞানে ডাবল অনাস্র্ করা, পদাথ্র্ বিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণীতে মাষ্টাস্র্ ডিগ্রী এবং লন্ডন থেকে উচ্চতর গণিত শাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষালাভকারী বুদ্ধিজীবি বিপ্লবী।
তৎকালীন সময়ে পার্টিবাহিনীর প্রথম অধিনায়ক ও রাজনৈতিক কমিশার  কমরেড নূর মোহাম্মদের ভাষায় “ সারা জেলার এমনকি সারা দেশের মধ্যে সেরাদের সেরার মধ্যে গণ্য করা যাবে এই সব শহীদদের”।
সেদিন জিরাজুল ইসলাম নামে অপর একজন কমরেড যার বাড়ী নওয়াপাড়া শিল্পাচ্ঞলের ধোপাদী গ্রামে তিনিও ধৃত হয়েছিলেন।তবে ভাগ্যক্রমে হাতের বাঁধন খুলে তিনি পালিয়ে আত্মরক্ষা করতে সমথ্র্ হন। সন্ধ্যার পর রাত নেমে আসলে মাহমুদপুর ব্রীজের পাশে তাদেরকে প্রথমে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এবং পরে গুলি করে হত্যা করা হয়। রাজাকার কমান্ডার ইসহাক ঐ হত্যাকান্ডে নেতৃত্ব প্রদান করেছিল।সে সময় ছিল রমযান মাস।
এই হত্যাকান্ডের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী মূটে শ্যামাপদ যিনি এখনও বেঁচে আছেন। পর দিন সেই-ই হরিহর নদীর তীরে অন্যদের সাহায্য নিয়ে শহীদ কমরেডদের চারজনকে সমাধিস্থ করেন। কমরেড ফজলুর বাড়ী নিকটস্থ গোপালপুর গ্রামে হওয়ায় তার লাশ আত্মীয়রা নিয়ে যান এবং গ্রামেই সমাধীস্থ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে, বিশেষ করে সশস্ত্র কমিউনিষ্ট আন্দোলনের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে এই আত্মবলীদান অমর হয়ে থাকবে।
প্রতি বছর দিনটি আসলে মনটা বিষন্ন হয়ে যায়। কারণ বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে শুধু এই পাঁচ জন নন অসংখ্য কমরেড পতঙ্গের মত বিপ্লবের আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবিসর্জন দেন। ১৯৭১ এবং তার পরও এই আত্মদান অব্যাহত থাকে। কিন্তু যে লক্ষ্যে তাঁরা জীবন উৎসগ্র্ করেন সেই লক্ষ্যের ধারে কাছেও আমরা যেতে পারিনি। শোষনমুক্ত একটি সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ আজও অধরা রয়ে গেছে।
এই মর্মান্ত্রিক ও করুণ পরিনতির কারণ নির্নয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, অনেক বিশ্লেষন হয়েছে। বহুবার একথা ব্যাখ্যাত হয়েছে যে, তদানীন্তন ইপিসিপি(এম এল) প্রথম স্বাধীনতার আওয়াজ তোলা সত্বেও, সম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদকে প্রধান শত্রু নির্ণয়ে নির্ভূল হলেও , জাতিগত প্রধান দ্বন্দ নির্নয়ে ব্যর্থ্তা, নির্বাচন এবং সমস্ত গনসংগঠন পরিত্যাগ করে একমাত্র সশস্ত্র যুদ্ধের কৌশল গ্রহন করায় এই বিপন্ন দশা। ভুল কৌশলের কারণে দ্রুত বিকাশমান একটি পার্টি দ্রুতই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং নেতৃত্ব চলে যায় বুর্জোয়া নেতৃত্বের হাতে। গত ৪২ বছরেও সেই বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠা যায়নি। নেতৃত্বেও আসা সম্ভব হয়নি।
সমালোচনা আত্ম সমালোচনার মাধ্যমে একটি পার্টি পরিশুদ্ধ হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা অনেক আত্ম সমালোচনা শুনেছি। কথিত পিকিং পন্থীদের ঐক্য দেখেছি। পরক্ষনেই ভাঙ্গনও দেখেছি- ভাঙ্গনের খেলা থেমে নেই, চলছে। মস্কোপন্থীদের একাংশ আদশ্র্ পরিত্যাগ করেছে। কোন দিক থেকেই একটি শক্তিশালী গনভিত্তি সম্পন্ন কমিউনিস্ট পার্টির দেখা নাই। রাজনীতির ময়দানে এখন রাজনীতিবিদের বদলে শোষণ-লুন্ঠনজীবির একচ্ছত্র আধিপত্য! পুরানো ঘাতকেরা একটি সশস্ত্র গৃহযুদ্ধের পাঁয়তারায় লিপ্ত। এ অবস্থায় কমিউনিস্ট ঐক্য, কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিকল্প নেই। এই অন্ধকারে সেটাই হতে পারে একমাত্র আলোর রেখা।
বিপ্লবী চে গুয়েভারা’র মৃত্যুর পর একজন বাঙ্গালী কবি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার ‘চে গুয়েভারার প্রতি’ কবিতায় বলেছিলেন,
‘চে তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়—
আমি এখনও প্রস্তুত হতে পারিনি, আমার অনবরত
দেরি হয়ে যাচ্ছে
আমি এখনও সুড়ঙ্গের মধ্যে আধো-আলো ছায়ার দিকে রয়ে গেছি,
আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে
চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়!”
কবির মত আমারও বারবার মনে হয়, শহীদ কমরেডগন, তোমাদের মৃত্যু আমাদেরকে অপরাধী করে রেখেছে। আমরা তোমাদের হত্যার বদলা নিতে পারিনি। আমরা প্রস্তুত হতে পারিনি! আমাদের অনবরত দেরি হয়ে যাচ্ছে!
লেখক :
সদস্য সচিব, শহীদ বিপ্লবী স্মৃতি কমিটি যশোর ও সম্পাদক, যাশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি।