মণিরামপুর ও সাতক্ষীরায় শিবিরের সন্ত্রাস

স্পন্দন ডেস্ক:যশোরের মণিরামপুর ও সাতক্ষীরায় গতকাল ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত শিবিরের ক্যাডাররা। মণিরামপুরে শিবির ক্যাডারদের হামলায় হাতের কব্জি উড়ে গেছে এক পথচারীর এবং এক যুবলীগ নেতার বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে।
মণিরামপুর : গতকাল বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে ছাত্রশিবির ও বিএনপির ক্যাডাররা। তারা বোমাবাজিসহ এক যুবলীগ নেতার বাড়িতে হামলা চালিয়েছে এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রচার বিলবোর্ড ও ব্যানার ছিড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। বোমাবাজিতে হাতের কব্জি উড়ে গেছে শিমুল হোসেন (৪০) নামে এক পথচারীর।
গতকাল বিকালে মণিরামপুর পৌরশহর হঠাৎ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ১৮ দলীয় জোটের মিছিল সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিকেল সাড়ে ৩ টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ থাকে। মিছিল সমাবেশে আসা দলীয় বিভিন্ন শ্রেনীর ক্যাডাররা নির্বিঘেœ মহাড়া চালায়। লাঠিসোটা, ধারালো অস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত ছিল তারা। সমাবেশ শেষে পৌর শহরে প্রবেশ করেই তারা আওয়ামীলীগের ব্যানার, বিল বোর্ড, ফেস্টুন ভাংচুর ও অগ্নি সংযোগ করে। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে আওয়ামীলীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনে ব্যানার ফেসটুনগুলো নির্বিঘেœ ভাংচুর চালালেও সেখানে দায়িত্বে থাকা থানার এস,আই জিহাদ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ছিলেন অসহায়ের মতো। সন্ধ্যার দিকে তারা পাঁচটি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটায়। এরপর পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক ও কাউন্সিলর আদম আলীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে ওই ক্যাডাররা। বোমার আঘাতে পথচারী শিমুল হোসেন মারাত্মক আহত হয়েছেন। তার হাতের একটি কব্জি উড়ে গেছে। তাকে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা ঢাকায় স্থানান্তর করেন। গতকাল রাতেই তাকে ঢাকায় নেয়া হয়েছে। তার অবস্থা আশংকাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তার বাড়ি উপজেলার জয়পুর গ্রামে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিবিরের আড়াইশতাধিক কর্মী ছিল বিভিন্নভাবে সজ্জিত। তাদের পোষাক ছিল ভিন্ন। হেলমেট পরিহিত মখোমন্ডল ঢাকা, পিঠের ব্যাগ বাঁধানো কালো রঙের পোশাকধারী। সশস্ত্র এসমস্ত ক্যাডাররা শহরে প্রবেশ করার পর পুলিশ প্রশাসন ছাড়া সাধারণ জনগণ ছিল আতংকের মধ্যে। বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গোটা পৌর শহরে সরকার দলীয় কোন নেতাকর্মীকে চোখে পড়েনি।
থানার ওসি মোশাররফ হোসেন ভুইয়া বলেন, সমাবেশ শেষে ১৮ দলের কর্মীরা বোমার বিষ্ফোরণ ঘটিয়েছে এবং কাউন্সিলর আদম আলীর বাড়ি ভাংচুর করেছে।
মনিরুল ইসলাম মনি, সাতক্ষীরা থেকে জানান,সাতক্ষীরায় জামায়াত শিবিরের কর্মীরা হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে আগরদাঁড়ী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক তাপস আচার্য্যর দোকান ঘর ও পাটের গুদামে অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দিয়েছে। সকাল ১১ টার দিকে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা কদমতলা বজারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে ফিরে যাওয়ার পথে তারা আবাদেরহাট বাজারে অবস্থিত আওয়ামীলীগ নেতার ঔষধের দোকান সোমা ট্রেডাসে ও পাশ্ববর্তী পাটের গোদামে পেট্রল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করে। এদিকে বেলা ১২ টার দিকে কলারোয়া উপজেলার রায়টা বাজারে বিএনপি জামায়াত বিক্ষোভ মিছিল থেকে  হামলা চালিয়ে হাফিজুর রহমান নামের এক আওয়ামীলীগ কর্মীকে রক্তাক্ত জখম করেছে।
অপরদিকে সকাল ১১ টার দিকে শ্যামনগর উপজেলার কাশিমারী এলাকায় ১৮ দল বিক্ষোভ মিছিল করার সময় শফিকুল ইসলাম নামের এক জামায়াত কর্মীর স্টোক করলে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। পরে ইঞ্জিনভ্যান যোগে কালিগঞ্জ হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার মৃত্যু হয়॥ এ ব্যাপারে কথা বলতে জামায়াতের নেতা-কর্মীদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে কাশিমারী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারন সম্পাদক অলিমল্যা জানান, জয়নগর মাদ্রাসা থেকে বেলা ১১ টার দিকে জামায়াত ও বিএনপির একটি মিছিল নিয়ে আমরা ঝাপানি নদীর ঘাট এলাকায় যাচ্ছিলাম। এসময় সবুর মল্যার বাড়ীর পাশ্ববর্তী একটি বাড়ীর মধ্য থেকে একটি ইটের টুকরো এসে শফিকুল ইসলামের বুকে লাগে। ঘটনাস্থলেই জামাত কর্মী শফিকুলের মৃত্যু হয়। তবে মিছিল করে ফিরে যাওয়ার সময় বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা কাশিমারিতে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল গফুর, কৃষক লীগ সভাপতি ও সম্পাদক মো. সানাউল্লাহ ও আবদুর রাজ্জাকের বাড়ি ভাংচুর করে।
এব্যাপারে শ্যামনগর থানার ওসি ও সাতক্ষীরা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী জানান, শফিকুল ইসলাম একজন স্টোকের রোগী। অসুস্থ্য অবস্থায় সে জামায়াত-শিবিরের মিছিলে যোগ দেয়। মিছিল করতে করতে সে আরও অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। পরে ইজ্ঞিনভ্যানে করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। জামায়াত-বিএনপি ইস্যু তৈরী করার জন্য আওয়ামীলীগের হামলায় ওই জামায়াত কর্মী নিহত হয়েছে বলে তারা অপপ্রচার দিচ্ছে।
এদিকে সাতক্ষীরা পৌরসভা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি থাকায় পূর্ব ঘোষিত সাতক্ষীরা বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে সমাবেশ করতে পারেনি জামায়াত-শিবির। তবে তারা ৩/৪ হাজার নেতা কর্মী নিয়ে শহরের উপকন্ঠে কদমতলা এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। আজ সকাল ৯ টার দিকে জেলা জামায়াতের আয়োজনে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এসময় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা অধ্যক্ষ আব্দুল খালেক মন্ডল, আমির মহাদ্দেস আব্দুল খালেক, সদর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারী মাওঃ শাহাদাত হোসেন, শ্রমিক নেতা এড.আবুবকর সিদ্দিকী,শিবির নেতা আমিনুর রহমান প্রমুখ। সমাবেশ চলাকালে জেলা বিএনপির স্থগিত কমিটির সাধারন সম্পাদক এড.ইফতেখার আলী সমাবেশ স্থলে যোগদান করেন। এসময় র‌্যাব,পুলিশ,বিজিবি সহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেখানে অবস্থান নেন।
এদিকে শহরের অদুরে বাকাল ও কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। নলতায় দু’টি ককটেল বিস্ফোরন ও একটি ট্রাক ভাংচুর করার খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডাঃ আফম রুহুল হকের শুভেচ্ছা ব্যানার ও ফেস্টুন ভেঙ্গে চুরমার করেছে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা। অপরদিকে সাতক্ষীরা পৌরসভায় বৃহস্পতিবার রাত ৮ টায় জারী করা ১৪৪ ধারা বলবৎ রয়েছে। সাতক্ষীরা শহরে মোতায়েন করা হয়েছে ১০ প্লাটুন পুলিশ,৩ প্লাটুন বিজিবি ও ২ প্লাটুন র‌্যাব। শহরে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব টহলে রয়েছে ।
তালা (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি জানান,সাতক্ষীরার তালায় শুক্রবার সকালে জামায়াতে ইসলামী বিক্ষোভ মিছিল ও পথসভা করেছে। সকালে উপ-শহরের চারপাশে জামায়াত শিবিরের নেতা-কর্মীরা জড়ো হতে থাকে। পরে একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে। এসময় তাদের প্রত্যেকের হাতে লাটি ও বিভিন্ন দেশিয় অস্ত্র দেখা যায়। লাটির মাথায় ছিল তিন দফা দাবির ফেস্টুন। অনেকে ছিল হেলমেট পরিহিত। হাতে ছিল কালো ভারী ব্যাগ। এতে উপ-শহরের সাধারণ মানুষ আতংকিত হয়ে ওঠে।  জামায়াতে ইসলামীর মোহড়া দেখে পুলিশ ছিল নিরব দর্শক। তবে কেন্দ্রের নির্দেশ থাকলেও রাজপথে দেখা মেলেনি কোন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর।
মিছিল শেষে উপ-শহরের তিন রাস্তা মোড়ে পথ সভা অনুষ্টিত হয়। উপজেলা জামায়াতের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ইসলামকাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম ফারুকের পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন তালা উপজেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির ডা.আপ্তাব উদ্দীন, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মফিজুল ইসলাম, ও জামায়াত নেতা অধ্যাপক ইদ্রিস আলী প্রমূখ। এসময় বক্তারা তত্বাবধয়ক সরকার পূর্নবহাল, ট্রাইবুন্যাল বাতিল ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নিস্বার্থ মুক্তি দাবী জানান। সভা শেষে মিছিল সহকারে শান্তিপূর্ণ ভাবে তারা উপ-শহর ত্যাগ করে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সাথে যোগাযোগ করা হলে বিভিন্ন অজুহাতে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান।
স্থানীয়রা জানান, জামায়াত ইসলামী আজ রণসাজে উপজেলায় উঠেছিল। প্রত্যাকে লাটি, কালো ব্যাগ, ইটসহ দেশিয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এসেছিল। অনেকে হেলমেট পরিহিত ছিল। এই মিছিলে বাঁধা দিলে তালা আজ রক্তাত্ব জনপদে পরিনত হতো।
তালা থানার পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম জানান, কাকডাকা ভোরে তারা শান্তিপূর্ণ ভাবে মিছিল করে চলে যায়। কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।