‘পুষ্টিকর’ শিশুখাদ্য : মায়ের কথাও ভাবতে হবে

শিশুর বেড়ে ওঠা ও মেধা-মননের সঠিক বিকাশে মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে যুগ যুগ ধরে এটাই রেওয়াজ। তাদের সত্যিই কোনো বিকল্প ছিল না। ধনী পরিবারগুলোতে অবশ্য স্থান করে নিচ্ছিল আমদানি করা গুঁড়া দুধ এবং অন্যান্য ‘পুষ্টিকর’ শিশুখাদ্য। দুর্ভাগ্যজনক যে, সম্প্রতি দরিদ্র পরিবারগুলোতেও ‘মায়ের দুধের বিকল্পের’ বিস্তার ঘটেছে। এর পেছনে কাজ করছে ব্যবসায়ীদের চটকদার কৌশল। তারা বিজ্ঞাপনে মুগ্ধ করছে সবাইকে। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, শিশুর জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শালদুধ খাওয়ানো এবং ৬ মাস পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ খাওয়ালে শিশু অনেক রোগের হাত থেকে রক্ষা পায়। আর দুই বছর পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করা গেলে শিশু সবল হয়ে বেড়ে উঠতে পারে। মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে যেসব শিশুখাদ্য বাহারি বিজ্ঞাপনের চমক দেখিয়ে বিক্রি করা হয়, তাতে পুষ্টির খানিকটা মিটলেও শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সবল হয়ে বেড়ে ওঠা অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত হয় না। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) শিশুর জন্মের পর থেকে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর পক্ষে ব্যাপক প্রচার ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রম এবং সরকারের গৃহীত নীতির ফলে ২০১২ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে ছয় মাস বয়সী শিশুর বাংলাদেশে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর হার ৪৩ থেকে ৬৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা সুলক্ষণ। কিন্তু মাতৃদুগ্ধ পান না করা শিশুর হার এখনও কম নয়। যেদিন এ দেশের সব শিশু অন্তত ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ পান করতে পারবে, ততদিন জাতীয়ভাবে এ ব্যাপারে সচেতন প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেই হবে। তবে শুধু জনসচেতনতা সৃষ্টি করেই চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিশুখাদ্যের বিপণন বন্ধ করা যাবে না। বিকল্প শিশুখাদ্যের বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন প্রণোদনামূলক প্যাকেজ ঘোষণা বন্ধ করে দেওয়াই হবে সঙ্গত। সরকার এ ব্যাপারে সচেতন বলেই আমাদের ধারণা। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত বিকল্প শিশুখাদ্য গ্রহণে কোনো শিশুর মৃত্যু বা স্বাস্থ্যহানি ঘটলে প্রচলিত আইনে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করে এ সংক্রান্ত একটি বিল ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত করেছে সংসদীয় কমিটি। সম্প্রতি সমকালে ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য বিল চূড়ান্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিলটিতে মায়ের দুধের বিকল্প দেখিয়ে শিশুখাদ্যের প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিশুখাদ্যের মোড়কে শিশু বা মায়ের ছবি ব্যবহারও চলবে না। আইন ভঙ্গকারীদের জেল-জরিমানারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিকল্প খাদ্য গ্রহণ করে শিশুর ক্ষতি হলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, মায়ের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা না গেলে শিশুর জন্য পর্যাপ্ত মাতৃস্তন্য নিশ্চিত হয় না। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান সমস্যা দারিদ্র্য। অতীতের চেয়ে বর্তমানে হতদরিদ্র পরিবারের সংখ্যা অনেক কমলেও এখনও জনসংখ্যার অন্তত চার ভাগের এক ভাগের দুঃখকষ্টে জীবন কাটে। এসব পরিবারের শিশুরা বেড়ে ওঠে অনেকটা অযতেœ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। মা-ও পায় না প্রয়োজনীয় পুষ্টি। নবজাতকদের জীবনের অনেক চাহিদাই থেকে যায় অপূর্ণ। বিঘিœত হয় মেধা-প্রতিভার বিকাশ। কেবল সব শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করেই এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এ থেকে মুক্তিলাভ করতে হলে দারিদ্র্যমুক্তির চ্যালেঞ্জেও জয়ী হতে হবে।