সন্ত্রাসীদের কাছে হেরে গেলেন নজরুল ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক:হেরে গেলেন যশোরের ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল ইসলাম। শহরের বারান্দীপাড়ার শক্তিশালী অপরাধীচক্রের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে না পারলেও তাদের বিরুদ্ধে সর্বদা তিনি হয়েছিলেন প্রতিবাদমুখর। তাই গত এক মাস আগেও সন্ত্রাসী বিরোধী এক মিছিলে প্রকাশ্যে চিহ্নিত ওই সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত হন। তবুও দমেননি তাই সন্ত্রাসীরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় তাকে হত্যা করে নিজেদের আধিপত্য নিশ্চিত করেছে। নজরুলের এ করুণ পরাজয় আরও বেশি আতঙ্কিত করলো শহরের বারান্দীপাড়া, ঢাকা রোড, মণিহার এলাকা ও আরএন রোডের ব্যবসায়ীদের ।
মঙ্গলবার রাতে সন্ত্রাসীদের গুলি ও বোমা হামলায় আহত প্রতিবাদী এই আওয়ামীলীগ নেতা শেখ নজরুল ইসলাম মারা গেছেন গতকাল বুধবার ভোরে। যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎকদের রাতভর চেষ্টার পর তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করলে সেখানে মারা যান তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানিয়েছে, শেখ নজরুল ইসলাম মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে জেলা যুবলীগ নেতাদের সাথে সাংগঠনিক বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। নেতারা চলে যাওয়ার পনের মিনিটের মধ্যে মোল্লাপাড়ার বিএনপি নেতা মাকসুদুর রহমান লাভলু, তার দু ভাই মাসুদুর রহমান নান্নু, মাহফুজুর রহমানপান্নু, ফিঙ্গে লিটনের ভাই ডিম রিপন একই এলাকার বাবু ,মিন্টু, বান্দাস ড্্রাইভার, শিপনসহ ১০/১২জন সেখানে যায়। সন্ত্রাসী নান্নু প্রথমে পিস্তল উচিয়ে গুলি করে। কিন্তু গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর শিপন দ্বিতীয় গুলি করলে নজরুল ইসলাম পিস্তল ধরে ফেলে এবং মাটিতে পড়ে যান। পড়ে যাওয়ার  সাথে সাথে অন্য সন্ত্রাসীরা তাকে লক্ষ্য করে পরপর তিনটি বোমা ছুড়ে মারে। বোমা তিনটি তার পেটে লাগলে তার নাড়িভুড়ি বেরিয়ে যায়। আশেপাশের লোকজন ছুটে এসে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে । অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎকরা তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। রাত আনুমানিক তিনটার দিকে তিনি মারা যান। গতকাল সকালে তার মৃতদেহ যশোরে আনা হয়। তার মৃতদেহ দেখার জন্য বাড়িতে হাজার হাজার লোকজন ভিড় করে। ছুটে যান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। জোহরবাদ খুলনা বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদে নামাজে জানাযা শেষে আরএন রোডস্থ দলীয় কার্যালয়ে আনা হয়। সেখানে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ মরহুমের কফিনে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। পরে তার লাশ মরহুমের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার টুঙ্গীবাড়ি উপজেলার হাশাইলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার পারিবারিক কবর স্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এদিকে ব্যবসায়ী শেখ নজরুল ইসলাম হত্যার প্রতিবাদে বুধবার সকাল থেকে ঢাকারোড তালতলা এলাকার ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রেখে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করে। বিক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে দু’ঘন্টা অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। বিক্ষোভ সমাবেশে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে হত্যাকারীদের আটকের দাবি জানান। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন টায়ার ব্যবসায়ী নেতা কাওছার আহমেদ। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পুরাতন টায়ার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আলম মিন্টু, যুগ্ম সম্পাদক রনজিত কুমার পাল, নজরুল ইসলাম, আব্দুর রউফ, আসাদুজ্জামান, মোহাম্মদ সেলিম প্রমুখ।
হত্যাকান্ড বিষয়ে যশোর কোতোয়ালি থানার অফিসার্স ইনচার্জ(ওসি) এমদাদুল হক শেখ বলেছেনে, সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা করে ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামকে হত্যা করেছে। আমরা ৭ জনকে আটক করতে পেরেছি। আরো আসামি আটকে অভিযান চলছে।
এলাকার একাধিক লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নজরুল ইসলাম ছিলেন একজন প্রতিবাদী মানুষ। তিনি বারান্দী মোল্লাপাড়া এলাকার শক্তিশালী সন্ত্রাসী ফিঙে লিটন বাহিনীর  সব অপকর্মের বাঁধা ছিলেন। তিনি ছাড়া কেউ তাদের চাঁদাবাজি সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করতে সাহস পেতেন না। একারনে সব সময় সন্ত্রাসীদের টার্গেটে থাকতেন। আরএন রোড মটর পার্টস দোকান ও মনিহার ফল পট্টি এলাকা থেকে ফিঙে লিটন বাহিনী প্রতিমাসে লাখ লাখ টাক চাদা তুলে থাকে। চাঁদা না দিলে মারধোরসহ নানা ধরনের হুমকি দেয়া এ বাহিনীর নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। নিরবে তারা এ বাহিনীকে চাঁদা দিতেন। কিন্ত নজরুল ইসলাম ফিঙে লিটন বাহিনীর সরাসরি প্রতিপক্ষ হয়ে অপকর্মের প্রতিবাদ করতেন। নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে এলাকায় গড়ে তোলা হয় প্রতিরোধ কমিটি। এ বাহিনীর অপরাধ কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার থেকে মিছিল মিটিং শুরু করেন । এতে এক প্রকার ফিঙে লিটন বাহিনী কোনঠাসা হয়ে পড়ে। তখন গোপনে বাহিনীর সদস্যরা নড়েচড়ে বসে। তারা নজরুলকে হত্যা করতে পরিকল্পনা শুরু করে । একারনে গত ২৯ সেপ্টেম্বর এলাকায় তার নেতৃত্বে মিছিল বের করলে বাহিনীর সদস্যরা প্রকাশ্যে গুলি চালায়। নজরুলকে টার্গেট করে গুলি চালানোয় একটি গুলি তার পায়ে বিদ্ধ হয়। এতে গুরুতর আহত হন তিনি । হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে এলাকাবাসীকে সংগঠিত করে আবার প্রতিবাদমুখর হন। এবার তিনি চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীদের মুখোস খুলে দিতে প্রেসক্লাব যশোরে এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে গত ৬ অক্টোবর সাংবাদিক সম্মেলন করেন। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি ফিঙে লিটন বাহিনীর সব অপকর্ম ফাঁস করে দেন। কীভাবে ভারতে বসে ফিঙে লিটন তার ভাইরা সেলিম পলাশকে দিয়ে ইন্টারনেটে যোগাযোগের মাধ্যম স্কাইপে ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করে তাও ফাঁস করেন। নজরুল ইসলামের করা সংবাদ সম্মেলনের পাল্টা সম্মেলন করে সেলিম পলাশের সহযোগী নান্নুর ভাই পাপ্পু। তারপর থেকেই মূলত নজরুল এ বাহিনীর টার্গেটে পড়ে যান এবং সর্বশেষ পরিণতি হল নির্মম মৃত্যু।
ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে কোতোয়ালি থানা পুলিশ অস্ত্রগুলিসহ ৬জনকে আটক করেছে। ধৃতরা হল যশোরে শীর্ষ সন্ত্রাসী ফিঙ্গে লিটনের(বর্তমানে ভারতে পলাতক) ভাইরা সেলিম পলাশ, মোল্লাপাড়া বাঁশতলা এলাকার আব্দুর রহমানের ছেলে মেহেদী হাসান শান্ত, রবিউল আলমের ছেলে হৃদয়, ইউসুফ আলীর ছেলে সুমন, কাশেমের ছেলে মহসিন এবং খালধার রোড এলাকার জাকির হোসেন ওরফে জেকেরের ছেলে সাজ্জাদ।