যশোরে দ্বিতীয় শিল্পনগরী গড়ে তোলার উদ্যোগ সফল হয়নি

আবদুল কাদের:যশোরে দ্বিতীয় শিল্পনগরী গড়ে তুলতে ২০১১ সালের ৮ মে সরকারের কাছে প্রস্তাব করে যশোর বিসিক কর্তৃপক্ষ। শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে যশোর-নড়াইল সড়কের দাইতলা সেতুর পাশে ফতেপুর গ্রামে ৪০ একর সরকারি জমির উপর ‘অটোমোবাইল শিল্পাঞ্চল’ স্থাপনের এই প্রস্তাব করা হয়।
বিভিন্ন সুযোগসহ নানা যৌক্তিকতা তুলে ধরে নয় দফা সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন তৈরি করে জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমানের মাধ্যমে বিসিক প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। প্রধান কার্যালয় থেকে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পরিদর্শনে একটি টিম আসার কথা ছিল। কিন্তু তারা আর আসেনি। ফলে যশোরে দ্বিতীয় শিল্পনগরী কবে গড়ে উঠবে তার কোনো কূলকিনারা খঁজে পাচ্ছেনা বিসিক কর্মকর্তা। দ্বিতীয় শিল্পনগরী গড়ে উঠার কাজ ঢিমেতালে হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যশোরের শিল্প উদ্যোক্তারা।
যশোর বিসিক অফিস সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) যশোর শাখায় ১২৩টি ইউনিট রয়েছে, যার মধ্যে ১২১টি ইউনিটেই শিল্প-কলকারখানা চালু রয়েছে। বাকি দু’টি ইউনিটও বরাদ্দ দেয়া রয়েছে। তাই বিসিকে কোনো প্লট খালি নেই। অথচ গত এক বছরে শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে যশোর বিসিকে। আরও অর্ধশত আবেদন ফেরত দেয়া হয়েছে। তাই শিল্প উদ্যাক্তাদের চাহিদা মেটাতে যশোরে দ্বিতীয় শিল্পনগরী গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে যশোর বিসিক কর্তৃপক্ষ।
যশোর বিসিক সূত্রে জানা গেছে, যশোর শহর ও শহরতলীতে আবাসিক ও অনাবাসিক এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে শতাধিক অটোমোবাইল শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় মোটরগাড়ির যন্ত্রাংশ, বাস ট্রাকের বডি উৎপাদন, অটোরিকশা ও থ্রি হুইলার সংযোজন এবং মোটরগাড়ি মেরামত করা হয়। তাই একই জায়গায় সমন্বিত অবকাঠামোগত সুবিধা দিয়ে কারখানাগুলো গড়ে এনে দ্বিতীয় শিল্পনগরী গড়ে তোলার দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের।
যশোর বিসিকের শিল্পনগরী কর্মকর্তা লুৎফর রহমান জানান, যশোর শহরের পাশেই ঝুমঝুমপুরে ৫০ একর জমির ওপর ১৯৬২ সালে গড়ে ওঠে এ শিল্পনগরী। এই শিল্পনগরীতে মোট ১২৩টি ইউনিট রয়েছে, যার মধ্যে ১২১টি ইউনিটেই শিল্প-কলকারখানা চালু রয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪৪০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৫ কোটি টাকার রফতানি ও ২৪৫ কোটি টাকার পণ্য স্থানীয় বাজারে চাহিদা মেটালেও শিল্পনগরীটি রয়েছে অবহেলিত। এখানে কোনো প্লট ফাঁকা না থাকায় নতুন করে কোনো বিনিয়োগ করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। এজন্য যশোরে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপন ব্যবসায়ীদের প্রাণের দাবি।
শিল্পনগরী কর্মকর্তা লুৎফর রহমান আরও জানান, এ দাবির প্রেক্ষেতি সর্বশেষ ২০১১ সালের ৮ মে বিভিন্ন সুযোগসহ নানা যৌক্তিকতা তুলে ধরে নয় দফা সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন তৈরি করে জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমানের মাধ্যমে বিসিক প্রধান কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়। প্রতিবেদনে শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে যশোর-নড়াইল সড়কের দাইতলা সেতুর পাশে ফতেপুর গ্রামে ৪০ একর জমির উপর ‘অটোমোবাইল শিল্পাঞ্চল’ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়। ওই স্থানে শিল্পাঞ্চল স্থাপন করা হলে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত ও শিল্পের কাঁচামাল পরিবহনের জন্য ঢাকা ও বেনাপোলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। এছাড়া অটোমোবাইল করখানার উৎপাদিত পণ্য আমদানি বিকল্প হিসেবে পরিবহন সেক্টরে ব্যাপক অবদান রাখবে। তেমনি বেকার জনগোষ্ঠী পাবে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ।
তিনি বলেন, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর বিসিকের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি টিম আসার কথা ছিল সরেজমিন তদন্ত করার জন্য। তারা রিপোর্ট দিলে এটা কার্যকর করা সম্ভব হতো। কিন্তু তারা না আমায় পিছিয়ে গেছে এর অগ্রগতি। তবে তিনি আশা করেন শিগগিরই প্রধান কার্যালয় থেকে টিম আসবেন।
এদিকে যশোরে দ্বিতীয় শিল্পনগরী গড়ে তোলার উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চান ব্যবসায়ীরা। একাজের অগ্রগতি না হওয়ায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মিজানুর রহসান খান জানান, অনেক আগে থেকে যশোরে ক্ষদ্র শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। এজন্য জায়গার প্রয়োজন রয়েছে। দ্বিতীয় শিল্প নগরী গড়ে না উঠলে এঅঞ্চলের শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্থ করবে। উদ্যোক্তারা তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। যা যশোরের উদীয়মান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকাকে থামিয়ে দেবে।  কোনোভাবে আমরা এটা আশা করিনা। এজন্য যত দ্রুত সম্ভব যশোরে দ্বিতীয় শিল্প সগরী গড়ে তুলতে হবে।
যশোর চেম্বারের পরিচালক ও শিল্প উদ্যোক্তা হুমায়ন কবীর কবু জানান, যশোরে দ্বিতীয় শিল্প নগরী গড়ে না উঠলে সরকারের যে শিল্প নীতি তার সাথে সামঞ্জস্য হবেনা। আর একই সাথে জেলার অর্থনীতির সচল চাকা থামিয়ে দেয়া হবে। বিসিকের প্রধান কার্যালয়ের খামখেয়ালিপনা ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষতি করছে। যত দ্রুত দ্বিতীয় শিল্পনগরী গড়ে উঠবে তাত অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে।
যশোরের ইউনিভার্সাল ফ্লাউয়ার মিলস্ ও ল্যাবস্ক্যান মেডিকেল সেন্টারের স্বত্তাধিকারী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যশোর সম্ভাবনাময় জেলা হিসেবে পরিচিত। এখানে ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ সব ধরণের শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যশোর বিসিকে কোনো প্লট খালি নেই। এজন্য অতি প্রয়োজন ছিল দ্বিতীয় শিল্প নগরী গড়ে উঠার। কেননা এঅঞ্চলে অচিরেই গ্যাস সংযোগ চলে আসবে। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে গ্যাস সংযোগের সব প্রস্তুতি নেয়ার পর বর্তমান সরকার পাইপ লাইনের কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় শিল্প নগরী গড়ে তুলতে না পারলে এখানকার নতুন বিনিয়োগ হবেনা। কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্থ হবে।
সূত্র মতে, ইতোপূর্বে বিসিক প্রধান কার্যালয়ে আরও যেসব পত্র দেয়া হয় এতে যশোর সদর আসনের সাবেক সাংসদ খালেদুর রহমান টিটো, বাঘারপাড়ার এমপি রণজিৎ কুমার রায়, জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান সুপারিশ করেছিলেন। এছাড়া ২০১২ সালের ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানের নির্দেশে বেনাপোলে শিল্পনগরী স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিলে দ্বিতীয় শিল্পনগরী যশোর নাকি বেনাপোলে হবে সেটা নিয়েও সংশয় দেখা দেয়। কিন্তু বিসিক চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে গত বছরের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে যশোর কার্যালয়ে নির্দেশ আসার পর যশোরে দ্বিতীয় শিল্পনগরী গড়ে তোলার আবার স্বপ্ন জেগে উঠেছে। কিন্তু প্রধান কার্যালয়ের পরিদর্শন টিম না আসলে এর অগ্রগতি হচ্ছেনা।
এব্যাপারে যশোর বিসিকের ডিজিএম৪রেজাউল করিম জানান, যশোরে দ্বিতীয় শিল্পনগরী গড়ে তুলতে জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিসহ ৫ সদস্যর একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির লোকজন গত ডিসেম্বর মাসে পরিদর্শনে আসার কথা ছিল। কিন্তু কি কারণে তারা আসেনি আমি বলতে পারবনা। কেননা আমি যশোরে নতুন যোগদান করেছি।