আলুর দাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন

আলু হলো একটি পচনশীল পণ্য। এ পণ্যটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজন হিমাগার। কিন্তু আমাদের দেশে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় যে পরিমাণ আলুর উৎপাদন হচ্ছে, ওই উৎপাদিত আলু রাখার মত পর্যাপ্ত হিমাগার নেই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে। যা আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এতে অধিকাংশ চাষি তাদের উৎপাদিত আলু সংরক্ষণ করতে না পেরে মৌসুমেই বিক্রি করতে বাধ্য হয়। তারপর এবার তো বাজারে প্রায় আলু অবিক্রী। এতে করে কৃষকের মাথায় হাত উঠেছে। চলতি বছর আলুর ভাল ফলন হওয়া সত্ত্বেও চাষির মুখে হাসি নেই। দাম কম হওয়ায় খরচের অর্থই প্রায় ঘরে তুলতে পারছেন না অধিকাংশ কৃষক। এখন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ। আলুর ভাল দাম না পাওয়ায় এ ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে আলু চাষিরা হয়ে পড়ছেন ঋণখেলাপী। মাঠ পর্যায়ে চাষিদের এ অভিযোগ। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ ও নওগাঁ সদর উপজেলার কয়েকজন মাঠ পর্যায়ের চাষি জানান, তারা বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আলুর চাষ করেন মুনাফার আশায়। কিন্তু চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারে দাম নেই। এমন কী অনেক আড়ৎ বা বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে না। যা বিক্রি হচ্ছে তাতে খরচের অর্ধেক অর্থই ঘরে যাচ্ছে না। এতে করে এনজিও ও ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের টাকা পরিশোধ তো দূরের কথা, কৃষক ক্রমেই হয়ে পড়ছেন ঋণখেলাপী। এতে করে বেহাল হাজার হাজার আলু চাষি। এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন ২৫ ফেব্র“য়ারি (মঙ্গলবার) বণিক বার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাদ দিয়ে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, এবার সারা দেশে ৪ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আলু আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে। সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায়। দু’টি বিভাগে আলু আবাদ হয়েছে যথাক্রমে ১ লাখ ৬৭ হাজার ও ১ লাখ ৭১ হেক্টর জমিতে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হলো, এবার এ দুই বিভাগে ১০টি এনজিও থেকে এক লাখেরও বেশি চাষি ঋণ নিয়ে আলু আবাদ করেছেন। অনেকেই আলুর দাম না পেয়ে নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হবেন। এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি চাষি ঋণখেলাপী হওয়ার পথে। তবে কৃষকের এ দুরাবস্থায় ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে বলে জানান, একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র ঋণ বিভাগের সমন্বয়ক বলেছেন, প্রতিদিনই ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতার নোটিস আসছে। বিশেষ করে নীলফামারির কিশোরগঞ্জ, জলঢাকা উপজেলা থেকে। তবে কৃষকের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাদের প্রতি সহনশীল হওয়া ও কিস্তির টাকা আদায়ে সময় বাড়াতে স্থানীয় শাখাগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এদিকে, বিকল্প ফসল আবাদের জন্য যাদের পর্যাপ্ত জমি রয়েছে, তারা ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে মন্তব্য করেছেন রংপুর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। উদ্ভুত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিকল্প ফসল আবাদে চাষিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরিষা, ভুট্টা ও গম আবাদ বাড়ানোর সুপারিশ করা হচ্ছে। আর ঋণের চাপ কমাতে স্থানীয় এনজিওগুলোর সঙ্গেও পরামর্শ করা হচ্ছে, যাতে সর্বোচ্চ ছাড় পেতে পারেন আলু চাষিরা। এদিকে, গত দশকে উৎপাদন বাড়াতে আলু চাষে কৃষককে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দেয়া হয় প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা, তবে উৎপাদন বাড়লেও আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষি। বিশ্লেষকদের অভিমত হলো, উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়েনি আলুর বিকল্প ব্যবহার, বাড়েনি সংরক্ষণ ক্ষমতাও। পণ্যটির বিকল্প ব্যবহারে প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলেও সেগুলো চলছে ধুঁকে ধুঁকে। এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্তার বক্তব্য হলো, আলুর দাম নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কোল্ড স্টোরেজ মালিক, ব্যবসায়ী ও রফতানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। রফতানিতে নগদ প্রণোদনার সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে রফতানিও শুরু হয়েছে। হিমাগারে আলু নেয়া শুরু হলে বাজারে চাহিদা বাড়বে।