কচুরিপানায় চাপা বাঘারপাড়ার অভয়আশ্রম

ইকবাল কবির:
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে চিত্রা নদীর মৎস্য অভয়আশ্রমটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যে অভয়আশ্রম ফিরিয়ে দিয়েছিল দেশি মাছের সম্ভার, তা এখন কচুরিপানার নিচে চাপা পড়েছে। মৎস্য বিভাগ আর নদী ব্যবস্থাপনা সমিতির উদাসীনতায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় মৎস্যজীবীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভয়আশ্রম প্রতিষ্ঠার কারণে শুস্ক মৌসুমে মাছের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও প্রজনন মৌসুমে বিস্তর ক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় মাছের উৎপাদন বৃদ্বি পায় ব্যপকভাবে। ফিরে আসে এ এলাকার বিলুপ্ত প্রজাতির অনেক মাছ। কিন্তু অযন্ত আর অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা আর পরিকল্পনাহীনতার কারণে তা ধবংস হয়ে গেছে।
চিত্রা নদী উন্নয়ন সমিতির সাধাারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান জানান, ২০০১ সালের প্রথম দিকে মৎস্য অধিদপ্তর, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ফিস সেন্টার, ও বাঁচতে শেখার যৌথ উদ্দোগে প্রতিষ্ঠা পায় অভয়আশ্রমটি। এটিই ছিল দেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের বৃহত্তম অভয়আশ্রম। নদীর সব থেকে গভীরতম ও প্রশস্থ এলাকা বাঘারপাড়া থানার পাশেই দশ একর জলাকার নিয়ে গড়ে তোলা হয় ‘অভয়আশ্রম’ নামে নিরাপদ বেস্টনী। এ বেস্টনীতে নিষিদ্ধ করা হয় মাছ ধরা। নদীর বাকি জলাশয়ে মাছ ধরার জন্য উন্মুক্ত থাকে। মফিজুর রহমান আরো বলেন, অভয়আশ্রম প্রতিষ্ঠার আগে সেখানে সারা বছরই বিভিন্ন উপায়ে মাছ ধরতো মৎসজীবীসহ স্থানীয়রা। মাছ ধরারর জন্য ব্যবহার হত এক ধরণের মশারির মত নেট। যাতে মাছের রেনু পর্যন্ত রক্ষা পেতনা। একারণে অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিছু প্রজাতির সংখ্যা কমে যায়। অভয়আশ্রমকে ঘিরে গঠন হয় চিত্রা নদী উন্নয়ন সমিতি। চিত্রা নদীর বিল জলেশ্বর থেকে ধলগ্রাম স্লুইস গেট পর্যন্ত নদীর দুই পাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে নিয়ে গঠন হয় এ সমিতি। সমিতির কর্মকান্ড ছিল অভয়আশ্রম রক্ষনাবেক্ষণ, নদী ও খালের আড়বাঁধ, কারেন্ট জাল উচ্ছেদ, কচুরিপানা পরিস্কার ইত্যাদি। এ সব কর্মকান্ডে প্রত্যাক্ষভাবে সহযোগিতা করত উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসন। অভয়আশ্রম প্রতিষ্ঠার দুইবছর পার না হতেই অভাবনীয় সাফল্য দেখা যায়। হারিয়ে যাওয়া কৈ, দেশি স্বরপুঁটি, পাবদা, বাতাশি, রয়না, গাঙখয়রা, মায়া, এমনকি চিতল মাছ ফিরে আসে নদীতে। প্রাণ ফিরে পায় চিত্রা নদী। হাটে বাজারেও আগের তুলনায় দেশি প্রজাতির মাছ বেশি পাওয়া যেতে শুরু করে।
দোহাকুলা গ্রামের মৎসজীবী খোকন বিশ্বাস জানান, অভয়আশ্রম প্রতিষ্ঠার পর নদী পরিস্কার থাকা ও আড়বাঁধ উচ্ছেদের কারণে শুস্ক মৌসুমে মাছ আনায়াসে অভয়আশ্রমে আশ্রয় নিত আবার প্রজনন মৌসুমে (বৈশাখ, জৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাস) মাছ নির্বিঘেœ খালে বিলে গিয়ে মাছের বংশ বিস্তার করত। অভয়আশ্রমে বেশ কয়েকটি প্রজাতি বিশেষ করে চিতল মাছের উৎপাদন বৃদ্বি পায় অকল্পনীয়হারে। নদীর দুই পাড়ে মানুষ দাঁড়িয়ে চিতল মাছের খেলা দেখত। নদীতে মাছের অভাবে বিভিন্নপেশায় ঝুঁকে পড়া মৎস্যজীবীরা আবার নদীতে ফিরে আসতে শুরু করে। এখন অভয়আশ্রম ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় আর নদীতে অপরিমান কচুরিপানা হওয়ায় মাছের উৎপাদন আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। মৎস্যজীবীরা আবার নদী বিমুখ হয়ে পড়েছে। অভয়আশ্রম প্রতিষ্ঠার পর আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্ত আমাদের সে আশা আজ দুরাশায় পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে বাঘারপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরিফ আরিফ বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কচুরিপানায় নদীর চেহারা বদলে গেছে। এ অবস্থায় অভয়আশ্রমের কর্মকান্ড চালানোর কোন সুযোগ নেই। তবে মৎস্য অধিদপ্তরের বৃহত্তর যশোর প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। সে সুযোগে নতুন করে অভয়আশ্রমের কাজ শুরু করা যাবে।