ধাক্কা দেওয়ার সময় এসেছে: মুহিত

স্পন্দন ডেস্ক :বাজেটের ২ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনকে ‘চ্যালেঞ্জ’ হিসাবে নেওয়ার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দেশের মানুষের ভাগ্য বদলাতে এখন একটি ‘ধাক্কা দেওয়ার’ সময় এসেছে।

রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুক্রবার ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ছবি: তানভীর আহাম্মেদআসন্ন ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য সংসদে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট দেওয়ার পরদিন শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

বরাবরের মতোই রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এই বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, যাতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের চারজন মন্ত্রী ও সচিবরা মুহিতের সঙ্গে মঞ্চে ছিলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমরা সত্যিই যদি অগ্রগতির পথে যেতে চাই, ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই, তাহলে রাজস্ব আদায় অবশ্যই বাড়াতে হবে। আর সেই চ্যালেঞ্জই আমি আমার এই বাজেটে নিয়েছি। সেই চ্যালেঞ্জ সাকসেস করব বলে আমি প্রত্যাশা করছি।”

রাজস্ব আদায়ের এই ‘কঠিন চ্যালেঞ্জ’ জয় করা সরকারের জন্য ‘কঠিন হবে’ বলে ইতোমধ্যে মত দিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক জায়েদ বখত। গবেষণা সংস্থা সিপিডিও তাদের বাজেট বিশ্লেষণে একই মত দিয়েছে।

তবে মুহিতের বিশ্বাস, বাজেটের লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব বাবদ দুই লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা দিতে জাতি ‘প্রস্তুত আছে’। আর এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা এনবিআরও প্রস্তুত রয়েছে।

“আমরা নতুন করদাতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছি, এই করদাতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে। এ কথা ঠিক যে এই রাজস্ব আদায়ের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা দেওয়া দরকার। এই ধাক্কা দেওয়ার সময় এসেছে এবং আমরা সেই ধাক্কাটিই দিতে চাই।”

আওয়ামী লীগ সরকারের হয়ে টানা সপ্তমবারের মতো বাজেট দেওয়ার বিরল কৃতিত্ব দেখানো মুহিত বলেন, ২০০৯ সালে তিনি যখন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান, তখন দেশে সক্রিয় করদাতার সংখ্যা ছিল সাত লাখ। এখন তা বেড়ে ১১ লাখ হয়েছে।

“ইট ইজ ভেরি ভেরি স্লো। এই সংখ্যা বাড়ানোর জন্য আমাদের এনবিআর একটি জরিপ করেছে, সেই জরিপের ভিত্তিতেই আমরা নতুন করদাতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত এই কর আদায় করব।”

মুহিত বলেন, “আমরা জানি, আমাদের এই টার্গেট উচ্চাভিলাষী, টার্গেট ইজ ভেরি হাই, তবে আমাদের রেকর্ড আছে, এই সাত বছরে একবার আমরা রাজস্ব আদায়ে ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিলাম।”

সে বিষয়টি মাথায় রেখেই সরকার ও এনবিআরের পক্ষ থেকে এবার ‘অতিরিক্ত উদ্যোগ’ নেওয়া হবে বলে জানান মুহিত।

“দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের স্বার্থেই এ উদ্যোগের প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয়”, বলেন তিনি।

এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। এরমধ্যে এনবিআরকে আদায় করতে বলা হয়েছে এক লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।

“রাজস্ব আদায় বাড়াতে আমরা এনবিআর ডিজিটালাইজেশনসহ, রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার, নতুন কর্মকর্তা নিয়োগসহ নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি। সে সব পক্ষেপের মাধ্যমে অবশ্যই আমরা আমাদের লক্ষ্য পূরণ করব।”

এক লাখ ৭৬ হাজার নয়, এনবিআরের দুই লাখ কোটি টাকা আদায়ের সামর্থ্য আছে বলেও তিনি দাবি করেন।

অনুষ্ঠানমঞ্চে মুহিতের ডান পাশে ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। আর বাঁ পাশে ছিলেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

তাদের পেছনে গভর্নর আতিউর রহমান, অর্থ সচিব মাহাবুব আহমেদ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান এবং পরিকল্পনা সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আযম উপস্থিত ছিলেন।

বিকাল ৪টায় নিজে কোনো বক্তব্য না দিয়ে সাংবাদিকদের কাছে প্রশ্ন আহ্বানের মধ্য দিয়ে সংবাদ সম্মেলন শুরু করেন অর্থমন্ত্রী।

দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে প্রায় ৩০ জন সাংবাদিকের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।

মুহিত বলেন, “বাজেট বাস্তবায়নে বড় সমস্যা ছিল- এ কথা আমি স্বীকার করছি। কিন্তু এখন আমি জোর দিয়ে বলছি, এক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট এগিয়েছি। আগে বাজেটের ৭৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হতো। এখন ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত আমরা বাস্তবায়ন করছি।

“আমাদের বাজেট বাস্তবায়নের সামর্থ্য নেই বলে যারা সমালোচনা করেন, তারা ভুল বলেন,” বলেন মুহিত।

‘কালো টাকা বলে কিছু নেই’

সংবাদ সম্মেলনে কয়েকজন সাংবাদিক ‘কালো টাকা’ নিয়ে প্রশ্ন করেন।

মুহিত বলেন, “আমার এবারের বাজেটে কালো টাকা বিনিয়োগের কোনো সুযোগ রাখিনি। আয়কর আইনে জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের যে সুযোগ আছে সেটাই আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে।”

এ বিষয়ে বিশেষ বক্তব্য রাখার কোনো প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন মুহিত।

‘কালো টাকা’ আর ‘অপ্রদর্শিত আয়ের’ মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কিনা- এ প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আয়কর আইনে কালো টাকা বলে আসলে কিছু নেই। আমাদের বিধানে-টিধানে আসলে কালো টাকার কোনো কথা নেই।”

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো কারণে তার আয়কে করের আওতায় আনতে না পারেন, অর্থাৎ আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শন না করেন, তাহলে তার সেই অর্থ ‘অপ্রদর্শিত’ হয়ে যায়। আর সেই অপ্রদর্শিত আয়কেই ‘কালো টাকা’ বলা হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, “এবারের বাজেটে এ নিয়ে কোনো আলোচনাই করিনি।”

‘প্রবৃদ্ধির আশা পূরণ হবে’

‘বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা হবে’ জানিয়ে মুহিত বলেন, “আমাদের দেশে বিনিয়োগকারী রয়েছে। তবে জমির সঙ্কটে অনেকেই বিনিয়োগ করতে পারছে না। সরকার আগামী ১৫ বছরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করবে। এর মধ্যে ৩০টি ইতোমধ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছর ছয়টির কাজ শুরুও হবে।”

মুহিতের মতে, দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি এখন এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ‘খুব একটা প্রভাব ফেলতে’ পারবে না।

“এখন দেশের সব মানুষ অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কারও আর রাজনীতির জন্য অর্থনীতির ক্ষতির মানসিকতা নেই। ফলে সরকার চাইলেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব।”

এতোদিন রাজনীতি দেশের অর্থনীতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করত মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “এখন অর্থনীতি আমাদের রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। জানুয়ারিতে যে বিধ্বংসী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল সেটা কিন্তু অর্থনীতির স্বার্থেই দেশের মানুষ বিতাড়িত করেছে।”

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে মুহিত বলেন, গত ছয় বছর আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের উপরে রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় অর্থনীতি মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়ালেও লক্ষ্যচ্যুত হয়নি। চলতি অর্থবছর এ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫১ শতাংশের উপরে রয়েছে।

“আগামী অর্থবছর ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। আর সরকারি-বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমেই সেটা করা হবে।”

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চলতি মূল্যে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে (সাময়িক হিসাবে) ১৫ লাখ ১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপির এই পরিমাণকে ৭ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী মুহিত।