ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে ধানের সংগ্রহ মূল্য: খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও কমেছে মাথাপিছু প্রাপ্যতা

খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও সম্প্রতি কমেছে মাথাপিছু প্রাপ্যতা। তবে কৃষিতে বেড়েছে ভর্তুকি। ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে ধানের সংগ্রহ মূল্য। কৃষি উপকরণ হিসেবে কমানো হয়েছে সারের দামও। সরকারের এসব প্রণোদনায় খাদ্য শস্যের উৎপাদন বেড়েছে। তবে তা জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমান্তরালে নয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড পলিসি মনিটরিং ইউনিট বলছে, দেশে খাদ্য শস্যের (ধান ও গম) উৎপাদন বাড়লেও কমেছে মাথাপিছু প্রাপ্যতা। এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন শনিবারের বণিক বার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়েছৈ, ২০০৯-১০ অর্থ বছরে দৈনিক জনপ্রতি ধান ও গমের নিট পাপ্যতার পরিমাণ ছিল ৬০৯ গ্রাম। পরের অর্থ বছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪১ গ্রামে যা দেশেল ইতিহাসে জনপ্রতি খাদ্যশস্য প্রাপ্যতায় সর্বোচ্চ এর পরের অর্থ বছরগুলোয় অবশ্য আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি এ হার। এ সময় খাদ্য শস্যের উৎপাদন ধীর গতিতে বাড়ায় মাথাপিছু খাদ্য শস্যের প্রাপ্যতা কমে যায়। ২০১১-১২ অর্থবছরে জনপ্রতি দৈনিক খাদ্য শস্যের প্রাপ্যতার পরিমাণ ছিলো ৫৮২ গ্রাম ও পরের অর্থবছরেও তা একই ছিলো। তবে গত অর্থবছরে দৈনিক জনপ্রতি খাদ্য প্রাপ্তির পরিমাণ কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯৮ গ্রাম। এতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ২৮ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি, যা নিট খাদ্য শস্য উৎপাদনের ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে খাদ্য শস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা খুব বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়নি। তবে আমদানি বাড়তে পারে দ্বিগুণের বেশি। অর্থ বছরের ১৯ মে পর্যন্ত চাল ও গম আমদানি হয়েছে, ৪৭ লাখ ৯৩ হাজার টন, যা প্রাক্কলিত নিট খাদ্য শস্য উৎপাদনের প্রায় ১৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি অর্থবছর জনপ্রতি খাদ্য শস্য প্রাপ্যতার পরিমাণ হয়তো আমাদিন বাড়িয়ে ধরে রাখা যাবে। তবে আমদানি বাড়িয়ে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার অর্থ হলো দেশের কৃষকের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য যে নীতি সহায়তা দেখা হচ্ছে, তা দক্ষভাবে কাজ করছে না। তাই জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় শস্য উৎপাদন বৃদ্ধির হারকে নতুন ভাবে উজ্জীবিত করতে নীতি পুনঃমূল্যায়নের পাশাপাশি নতুন পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা গত কয়েক অর্থবছরে শস্যের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি বেশ হতাশাজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এর তথ্য মতে, ২০০৯-১০ অর্থ বছরের কৃষিখাতের অন্যতম উপখাত শস্য ও শাক সবজি খাতে প্রবৃদ্ধি ছিলো ৭ শতাংশের ওপর। কিন্তু এ জোয়ার আর ধরে রাখা যায়নি। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি প্রায় শুন্যের কোটায় অর্থাৎ দশকি ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। যা চলতি অর্থ বছরে ১ দশমিক ৯১ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ বিষয়ে সাবেক খাদ্য সচিবের বক্তব্য হলো, জনপ্রতি খাদ্য শস্যের প্রাপ্যতা কমার তথ্যই প্রমাণ করে জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় বাড়েনি খাদ্য শস্যের উৎপাদন। যে হারে উৎপাদন তা বাড়ছে যথেষ্ঠ নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারিভাবে যে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, তা কৃষককে যথেষ্ট আকৃষ্ট করতে পারছে না। মাথাপিছু খাদ্য শস্যের প্রাপ্যতা বাড়াতে হলে অবশ্যই উৎপাদন ৩ শতাংশের বেশি হারে রাখতে হবে। সেটি করতে গেলে অবশ্যই কৃষককে ন্যায্য দাম দেয়ার মাধ্যমে প্রণোদনা দিতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কৃষকের ফসলের দাম সফলভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইএফপিআরআই) সম্প্রতি ভারত, চীন ও বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যের ওপর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশের কৃষক ফসলের দাম সবচেয়ে কম পান। এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেশের বাজারে ফড়িয়া বা মধ্যসত্ত্বভোগীদের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতিকেই দাীয় করেছে সংস্থা দুটি। তবে খাদ্য শস্য উৎপাদন বাড়াতে দাম নিশ্চিতের পাশাপাশি বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এর সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পরামর্শকের বক্তব্য হলো, জমি থেকে শুধু ফসল উৎপাদন নয়, জমির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সঠিক মাত্রায় উর্বরাশক্তি ধরে রাখতে হবে। এ জন্য সারের সুষম ব্যবহার ও শস্য অঞ্চল চালু করতে হবে। এছাড়া উৎপাদিত খাদ্য শস্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা না গেলে বিকল্প আবাদে ঝুঁকবেন কৃষক। তাই এটিকেও বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন। ফসল-উত্তর ক্ষতি কমিয় আনা এবং নাগালের মধ্যে কৃষি উপকরণেল দাম রাখা গেলেই কেবল খাদ্যশস্য উৎপাদনে কৃষককে ধরে রাখা সম্ভব হবে।