‘ইফতারি নিয়ে আর কেউ মা কয়ে ডায়ে না’

স্পন্দন ডেস্ক:
‘আমার ইমরান কুরানে হাফেজ। ছোট কালতে রুজা রাহে, নামাজ পড়ে। প্রতি রুজার সুমায় কত্তো রওমের ইফতারি নিয়ে বাড়ি আসতো। ইবার রুজায় আমার বাপ নেই। ইবার ইফতারি নিয়ে আর কেউ মা কয়ে ডায়ে না। আমি রাত্তিরি স্বপ্নে দেহিছি, ইমরানরে কারা আটকায়ে রাহিছে। সে রুজা রাহে নামাজ পড়ার জন্যি পাগল হয়ে গেছে।’- এই বুকফাটা বিলাপ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে নিখোঁজ ইমরানের মায়ের। সন্তান ফিরে আসবে আশায় বুক বেঁধে আছেন মাগুরা সদর উপজেলার ডেফুলিয়া গ্রামের এই মা হাসিনা বেগম।

বাড়িতে সাংবাদিক দেখে হাসিনা বেগম বিলাপ করে বলতে থাকেন, ‘বাবা আপনেরা আমার ইমরানের এট্টা খবর দেন। সেকি বাঁইচে আছে, না মইরে গেছে। মনে কয় বাঁইচে নেই। বাঁইচে থাকলিও না খায়ে আমার বাবা কঙ্কাল হয়ে গেছে। সে যেমনই থাক তারে আমার বুহি আনে দেন। জমি-জমা, টাহা পয়সা কিচ্ছু চাইনে। সব ফেলে দরকার হলি আমার পুলাপানগের বুহি নিয়ে নাস্তায় থাকপো। ভিক্কে ওরে খাব।’

হাসিনা বেগম জানান, গ্রামের দুই দালাল রবিউল ও ইয়ারুলের খপ্পরে পড়ে তার ছেলে ইমরান শেখ (২৫) তিন মাস আগে হাটগোপালপুরের জনৈক রাজ্জাকের মাধ্যমে বাড়িতে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি থেকে রওনা দেয়। ১২ মার্চ বাড়ি থেকে যাওয়ার পর দিন মোবাইল করে তিনি মাকে বলেন, ‘মা আমি চিটাগাং ট্রলারে উঠিছি মালেশিয়া যাচ্ছি।’

হাসিনা বেগম বলেন, ‘এর পর থেকে ইমরানের আর কোনো খোঁজ নেই। ইমরানের খোঁজে ডিসি, এসপি, র‌্যাব-এর কাছে দরখাস্ত দিছি। সাংবাদিকদের জানায়ছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত তার ভাল-মন্দ কোনো খোঁজ-খবর পাইনি।’

ইমরানের মা আরো জানান, তার স্বামী মফিজার শেখ সৌদি প্রবাসী। তিন ছেলে, এক মেয়ের মধ্যে ইমরান সবার বড়। ইমরান নিখোঁজের পর তার স্ত্রী দুই বছরের সন্তানকে ফেলে রেখে অন্য লোকের সঙ্গে চলে গেছে। এখন ছেলের শোকে নিজে মৃত্যুপথযাত্রী। হাসিনা বেগমের শঙ্কা, তার মৃত্যু হলে ইমরানের নাবালক শিশুটিকে কে দেখবে?

ইমরানের ছোট ভাই রাজু শেখ জানান, ইমরান পেশায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। গত ১২ মার্চ ঝিনাইদহের হাটগোপালপুরের লোক পরিচয়দানকারী রাজ্জাক নামে এক দালালের সঙ্গে তার ভাই ইমরানসহ মামাতো ভাই শাহিন ও প্রতিবেশী ইমরান নামে আরেকজন চট্টগ্রাম যায়। পরদিন ইমরান মোবাইলে জানান, তারা তিনজন সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। এ কথা বলার পর দালারা তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো নিয়ে নেয়। এর পর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ নেই। বিভিন্ন সময় রাজ্জাকসহ একাধিক লোক তাদের ফোন করে বলেছেন, ইমরান সমুদ্রের মধ্যে আছেন। কখনও বলেন, তাদের মালয়েশিয়া পাঠানোর জন্য থাইল্যান্ডে গোপন গুহায় রাখা হয়েছে। আবার বলেন, তারা না খেয়ে আছেন, তাদের খাওয়ার জন্য জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে লাগবে। কেউ কেউ ইমরানের সাথে মোবাইলে কথা বলিয়ে দেওয়ার জন্য বিকাশের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা দাবি করেছে।

রাজু শেখ বলেন, ‘আমরা ইমরানের সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দিলে তাকে সরাসরি টাকা দিতে রাজি হয়েছি। কিন্তু কেউ সরাসরি এসে টাকা নিতে রাজি হয়নি। পরে বিষয়টি লিখিতভাবে পুলিশ, র‌্যাবকে জানিয়েছি। পুলিশ মোবাইলের সূত্র ধরে রবিউল ওরফে রানা নামে এক দালালকে আটক করেছে।

এ ব্যাপারে মাগুরার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সুদর্শনকুমার রায় জানান, মানব পাচারের ঘটনায় সদর থানায় সম্প্রতি দুটি মামলা হয়েছে। পুলিশ এ পর্যন্ত অভিযুক্ত তিন জনকে আটক করে আদালতে সোপর্দ করেছে। মূল হোতাদের আটকের চেষ্টা চলছে।