ঈদ সামনে রেখে যশোরের সীমান্ত দিয়ে তৈরি পোশাকের চোরাচালান বেড়েছে

আবদুল কাদের ও বিল্লাল হোসেন :
ঈদকে সামনে রেখে যশোরের সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে তৈরি পোষাকের চোরাচালান বেড়ে গেছে। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পোশাক আসছে চোরাচালান হয়ে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন জেলার পোশাক ব্যবসায়ীরা। গত ৩ মাসের ব্যবধানে যশোর বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার পোশাকের চালান আটক করেছে। অবৈধভাবে পোশাক আসার কারণে সরকারের রাজস্ব আদয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। চোরাচালানিরা বৈধভাবে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আবার চোরাচালান ঘাট দিয়ে এসব পণ্য দেশের বাজারে নিয়ে আসছে।
জানা গেছে, যশোরের ডিবি পুলিশ গত ১১ জুন যশোর-বেনাপোল সড়ক থেকে ট্রাক ভর্তি ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস এবং থান কাপড়সহ দু’জনকে আটক করে। উদ্ধাকৃত কাপড়ের মূল্য ছিল ৬০ লাখ টাকা।
যশোর ডিবি পুলিশের ওসি মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, যশোর-বেনাপোল সড়কের উলাশি নামকস্থানে ট্রাক তল্লাশি করে এক হাজার ৮১৬টি শাড়ি ও থ্রিপিস এবং ২ হাজার মিটার থান কাপড় উদ্ধার করা হয়েছে। জব্দকৃত মালামালের মূল্য ৬০ লাখ টাকা বলে তিনি জানান। এসময় পুলিশ চালক সোহেল এবং হেলপার সোহাগকে আটক করে।
আটক সোহেল শার্শার শ্যামলাগাছি গ্রামের রেজাউল করিমের ছেলে এবং সোহাগ দক্ষিণ বুরুজবাগান এলাকার আব্দুল খালেকের ছেলে। তাদের বিরুদ্ধে কোতয়ালি থানায় মামলা হয়েছে।
এর আগে ৪ জুন বিজিবির ২৬ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা মূল্যের আমদানি করা ঘোষণা বর্হিভুত ভারতীয় পোষাক আটক করে। আটককৃত পণ্যের মধ্যে রয়েছে থান কাপড়, থ্রিপিচ, জুতা-স্যান্ডেল, বেবী ফুড এবং ইমিটেশন সামগ্রী। যশোর-বেনাপোল সড়কের আমড়াখালি ব্রিজের কাছ থেকে কাভার্ড ভ্যান ( ঢাকা মেট্রো-ট-১৬-৯৭৪৪) ভর্তি ওই পণ্য আটক করা হয়।
যশোর ২৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার (সিও) লে. কর্ণেল জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, সরকারের রাজস্ব ফাকি দিয়ে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে পণ্য পরিবহন হচ্ছে- এমন সংবাদের ভিত্তিতে বেনাপোলের আমড়াখালী চেকপোস্ট থেকে দু’টি পণ্য বোঝাই কাভার্ড ভ্যান আটক করা হয়।
পরে গাড়ি তল্লাশি করে কাগজপত্র দেখে একটিতে বৈধ চা-পাতা পাওয়া যায়। যা ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অপরটিতে ঘোষণার বাইরে অতিরিক্ত পণ্য থাকায় তা আটক করে বেনাপোল কাস্টমস হাউজে জমা দেওয়া হয়েছে। আটককৃত পণ্যের মূল্য ৩ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা।
জান াগেছে, ‘আনুষা ইমপেক্সে’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ওই পণ্য আমদানি করে। আনুষা ইমপেক্সের লাইসেন্স নেয়া বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল ইসলাম লিটনের ভাই স্বপনের নামে। কিন্তু ওই লাইসেন্সে ব্যবসা পরিচালনা করেন মূলত মেয়র লিটন। তার ‘কাজ এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। বর্তমানে সেটি এনবিআর’র কালো তালিকাভুক্ত। একাধিক জালিয়াতির কারণে কাজ ইন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছে। যে কারণে ভাইয়ের নামে নতুন লাইসেন্স নিয়ে মেয়র লিটন এই জালিয়াতি করে থাকেন বলে অভিযোগ আছে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের ইন্সপেক্টর (গোডাউন ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ) মাহমুদ হোসেন বলেছেন, অবৈধ ঘোষণা দিয়ে পণ্য পরিবহনের অভিযোগে বিজিবি সদস্যরা ৪ জুন ভারতীয় একটি পণ্যের চালান আটক করে কাস্টমস গোডাউনে জমা দিয়েছেন। এ সকল পণ্যের মধ্যে থ্রিপিচ, থানা কাপড়, জুতা, স্যান্ডেল, বেবী ফুড ও লেস রয়েছে। এরকম গত ৩ মাসে অন্তত শত কোটি টাকার চোরাচালান পন্য আটক করেছে যশোর বিজিবি সদস্যরা।
বিজিবির ২৬ ব্যাটালিয়নের একটি টিম ১৬ জুন রাতে প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকার ভারতীয় বিভিন্ন প্রকার কাপড় উদ্ধার করে।
মণিরামপুরের মশিহাটি বাজারের কাছে একটি আম বাগান থেকে পরিত্যাক্ত অবস্থায় ওই কাপড় উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৯৩ পিস মাড়ি, ৬৫টি থ্রিপিস এবং ৫৯ বান্ডিল থান কাপড় জব্দ করা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি। জব্দকুত কাপড়ের মূল্য ১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শার্শা উপজেলার পুটখালি, দৌলতপুর, বড় আঁচড়া, বেনাপোল, সাদিপুর, রোঘুনাথপুর, ঘিবা, ধান্যখোলা, শিকারপুর, নারকেল বাড়িয়া, শালকোণা, শিববাস, টেংরালি, কাশিপুর এবং চৌগাছার কাবিলপুর, শাহাজদপুর, মাশিলা, বর্ণি, হিজলি, বল্লবপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পোশাক আসছে। অভিযোগ রয়েছে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদেও সাথে সখ্যতা গড়ে চোরাচালানের মাধ্যমে আবার কাস্টমের সাথে লেনদেনের মাধ্যমে বৈধমালের সাথে অবৈধ পন্য নিয়ে আসা হচ্ছে।
যশোর তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন কালেক্টরেট মসজিদ মার্কেটের সভাপতি নেসার আহমেদ মুন্না জানান, অবৈধভাবে পোশাক আসার কারণে আমাদেও ব্যবসায এর দারুণ প্রভাব পড়ছে। সেই সাথে দেশেীয় পোশাকের ব্যবসা মার খাচ্ছে। কেননা ভারতীয় পোশাক চোরাচলান হয়ে আসলে তার দাম অনেক কম রাখা হয়। এতে প্রতিযোগিতায় দেশীয় পোশাক বা যারা আমদানি করছেন তারা লোকসানের শিকার হন।
যশোর ২৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার (সিও) লে. কর্ণেল জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, আমরা প্রতিদিন চোরাচালান বিরোধী অভিযান চলে। তারপর ঈদকে সামনে রেখে আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কাস্টম এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট যশোরের রাজস্ব কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম খান জানান, অবৈধভাবে শুধু পোশাক নয়, যেকোনো পন্য আসলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমদানির উপর। এতে আমদানি কমে আসে। আর আমদানি কমে গেলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বিরুপ প্রভাব দেখা দেয়। কেননা বেনাপোল দিয়ে আমদানি করা পন্যেও উপর আমাদের এটিভি রাজস্ব এসে থাকে। #