পিছিয়ে রয়েছে অন্যান্য ফসলও: ৬৯ শতাংশ কৃষিপণ্য বিপণনের বাইরে

বিপণনের বাইরে ৬৯ শতাংশ কৃষিপণ্য। প্রধান খাদ্য শস্য হলো চাল। খাদ্য নিরাপত্তায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফসলটির উৎপাদন এখন প্রায় ৩ কোটি ৪৩ লাখ টন। তবে উৎপাদিত চালের মাত্র ৩৬ শতাংশ বিপণন হয়। বাকি সব চলে যায় কৃষকের নিজস্ব ভোগে। উৎপাদনে এগিয়ে আরেক ফসল আলু। বর্তমানে এর উৎপাদন ৯০ লাখ টনের কাছাকাছি হলেও বিপণন হয় মাত্র ১০ লাখ টন। চাল বা আলুই কেবল নয়, বিপণনে পিছিয়ে রয়েছে অন্যান্য ফসলও। এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন শুক্রবারের বণিকবার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ইউএসএআইডির গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিপণনের বাইরে থাকছে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের প্রায় ৬৯ শতাংশ। উদ্বৃত্ত ফসলের বিকল্প ব্যবহার না থাকা ও কৃষকের দাম না পাওয়াকেই এ জন্য দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ওই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দেশে চাল, গম, ডাল, আলু, সবজি ও ফলের উৎপাদন ছাড়িয়েছে ৪ কোটি ৮১ লাখ টন। এর মধ্যে বিপণন হচ্ছে ১ কোটি ৫১ লাখ টন বা মাত্র ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশ। বিপণন কম হওয়ার পেছনে কাজ করছে দুটি কারণ। একটি হলো কৃষক পর্যায়ে ভোগের পর উদ্বৃত্ত ফসল না থাকা। অন্যটি হলো, পচনশীল ফসলের বড় একটা অংশ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব ফসলের বাজার মূল্য বেশি এবং যা থেকে কৃষক বেশি মুনাফা পান, সেসব ফসল বিপণনে তুলনামূলক এনিয়ে যেমন গম ও ভুট্টা। এর বিপরীতে যেসব ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। তা বিপণনে আগ্রহও থাকে কম। ফলে অবিক্রিত থেকে যায় তা, যেমনটি হয় আলুর ক্ষেত্রে। উৎপাদিত ফসলের বিপণন কম হওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এর সাবেক মহাপরিচালক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের বক্তব্য হলো, বিপণনের বাইরে থাকা অর্থই হলো কৃষক উদ্বৃত্ত পণ্য উৎপাদন করতে পারছেন না। তার অন্যতম কারণ দেশের সিংহভাগ কৃষকই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্রায়তনের জমি আবাদ করেন। এ ধরনের স্বল্প জমি দিয়ে উদ্বৃত্ত ফসল উৎপাদন মোটেও সম্ভব নয়। তবে যেসব ফসলের দাম নিশ্চিত করা যাচ্ছে কিংবা যেসব ফসল অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন হচ্ছে, সেগুলোর বিপণন হচ্ছে বেশি। তাই বিপণনযোগ্য ফসল উৎপাদন করতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য স্বল্প পরিমাণ জমিতে অধিক ফসল তৈরিতে নজর দিতে হবে। আর সেটি করা সম্ভব একমাত্র প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষক এখনও তাদের প্রয়োজন অনুসারেই উৎপাদন করছেন। কেননা দেশের ৯০ শতাংশ পরিবারেরই জমি আছে এক হেক্টরের নিচে। আর দুই হেক্টর জমি আছে এমন পরিবারের সংখ্যা ৪ শতাংশের বেশি নয়। জমির পরিমাণ আরও ক্ষুদ্রায়তনের হিসাব করলে ৬৫ শতাংশ পরিবারের জমির পরিমাণ এক একর বা ১০০ শতকের নিচে। আর এ ধরনের ক্ষুদ্রায়তনের জমির মাধ্যমে বাণিজ্যিক কৃষি বা উদ্বৃত্ত পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব নয়। তবে নিজেদের ভরণপোষণ মিটিয়ে যেসব পন্যের দাম ভালো পাচ্ছেন, সেগুলোতেই বেশি উৎপাদনে যাচ্ছেন কৃষক। আর ফসল বেশি উৎপাদন হলে তা বাজারে বিক্রি করছেন। হরটেক্স ফাউন্ডেশনের প্যাকেজিং অ্যান্ড ট্র্যান্সপোর্টেশন প্রবলেম অ্যান্ড অপর্টুনিটিস ইন হর্টিকালচার সাপ্লাই চেইন শীর্ষক গেবষণায় জানা গেছে। ফসল উৎপাদনের পর তা সংগ্রহকারী ও পইকারী ব্যবসায়ী হয়ে খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে ভোক্তার কাছে ফসলের সিংহভাগই নষ্ট হচ্ছে। কৃষক পর্যায়ে উৎপাদনের ১৫-২০ শতাংশ সবজি ও ফলমূল নষ্ট হচ্ছে ভোক্তাদের কাছে আসার আগে। এছাড়া কৃষিপণ্য বিপণনে আঞ্চলিকভিত্তিক পার্থক্যও রয়েছে। দেশের সবচেয়ে কম বিপণন হয় বরিশাল অঞ্চলের উৎপাদিত ফসল। এ বিভাগে উৎপাদিত সব ফসলই জাতীয় গড় বিপণনের চেয়ে কম হারে বিপণন হচ্ছে। তবে জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি হারে বিপণন হচ্ছে রাজশাহী বিভাগে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং এফএও’র পরামর্শকের বক্তব্য হলো, কৃষকের এখন বেশি নগদ অর্থের প্রয়োজন। সেজন্য তাদের উৎপাদিত পন্যের বিপণন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে কৃষি উৎপাদন বন্ধ করে বিকল্প পেশায় ঝুঁকতে পারে। তখন দেশের খাদ্য নিরাপত্ত বিঘিœত হবে। এ জন্য কৃষকের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি উদ্বৃত্ত পণ্য বিপণনের নিশ্চিয়তা বিধান করতে হবে।