ভারি বর্ষণে ধস-ঢল, ১০ জনের মৃত্যু

শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কেবল কক্সবাজারেই ২১০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

এ জেলায় পাহাড়ি ঢল, ঝড়ো হাওয়ায় গাছ চাপা পড়ে এবং পাহাড় ধসে আট জনের মৃত্যু হয়েছে। বান্দরবানে পাহাড় ধসে নিহত হয়েছে দুই ভাই-বোন, পানিবন্দী হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবার।

বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, ফরিদপুর ও ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। নিচু এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় পানি ঢুকেছে বহু ঘরবাড়িতে।

দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকায় আরও অন্তত একদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারি বৃষ্টি চলতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

কক্সবাজারে নিহত ৮

পাহাড়ি ঢল, ঝড়ো হাওয়ায় গাছ চাপা এবং পাহাড় ধসে কক্সবাজারে আটজন নিহত হয়েছে। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছে দুজন; আহত হয়েছে সাতজন।

বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার দিনভর বৃষ্টিতে জেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে এক হাজারের বেশি ঘরবাড়ি এবং দুই শতাধিক চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক পানিতে তলিয়ে জেলার বেশ কয়েকটি এলাকা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

টানা বৃষ্টিতে শুক্রবার কক্সবাজার শহরে পাহাড়ধস

টানা বৃষ্টিতে শুক্রবার কক্সবাজার শহরে পাহাড়ধস

ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রামুর পানিবন্দি লোকজন স্থানীয় বিদ্যালয়ে  আশ্রয় নিয়েছে

ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রামুর পানিবন্দি লোকজন স্থানীয় বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে

রামু উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে ভেসে গিয়ে পাঁচজন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে ঝড়ো হাওয়ায় গাছের নিচে চাপা পড়ে দুজন এবং কক্সবাজার শহরে পাহাড় ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়।

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ হোসেন জানান, পাহাড়ি ঢলে ভেসে যাওয়া পাঁচজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

এছাড়াও দুজন নিখোঁজ হয়েছে, যাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি।

নিহতরা হলেন- ফতেখারকুল ইউনিয়নের আমতলিয়া পাড়ার হালিমা বেগম (২৭) ও দক্ষিণ বিটের জিনু মিয়া (৬০), জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের মিতারছড়া এলাকার মো. রিদুয়ান (১০), কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের উখিয়ারঘোনার আমির হোসেন (২৩) ও কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের তিথিরপাড়ার খতিজা বেগম (৩৮)।

এদিকে কক্সবাজার শহরের ঘোনাপাড়া, লাইটহাউজ ও সাহিত্যিকা পল্লীতে পাহাড় ধসে এক শিশু নিহত ও সাতজন আহত হয়েছে।

নিহত মো. আবছার (৩) ঘোনাপাড়া এলাকার নূরুল মোস্তফার ছেলে।

আহতরা হলেন- ঘোনাপাড়ার জয়নাব বেগম (১৭), মো. সাকের (২৬), আব্দুল মান্নান (২২), উম্মে জামিলা (৪৫), লাইটহাউজ এলাকার শাকেরা খাতুন (৫৫), ইসমত আরা বেগম (৯) ও সাহিত্যিকা পল্লীর মো. ইয়াছির (১০)। তাদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের পরিদর্শক (অপারেশন) আব্দুল মজিদ জানান, ঘোনাপাড়ায় পাহাড় ধসের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল এক শিশুর মৃতদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি মাটিচাপা পড়া চারজনকে জীবিত উদ্ধার করেছে।

অপরদিকে দুপুর দেড়টার দিকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের কোনারপাড়া এলাকায় ঝড়ো হাওয়ায় গাছের নিচে চাপা পড়ে এক গৃহবধূ ও তার শিশু সন্তানের মৃত্যু হয় বল সেন্টমার্টিন দ্বীপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূরুল আমিন জানান।

সেখানে নিহতরা হলেন- কোনারপাড়া এলাকার আনোয়ারা বেগম (২৫) ও তার ছেলে জিসান (৩)।

শুক্রবার সকাল থেকে টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজার শহরে সড়কে জমেছে হাটু পানি। ছবিটি দুপুরে শহরের পর্যটন এলাকা কলাতলী থেকে তোলা। ছবি: সুমন বাবু

শুক্রবার সকাল থেকে টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজার শহরে সড়কে জমেছে হাটু পানি। ছবিটি দুপুরে শহরের পর্যটন এলাকা কলাতলী থেকে তোলা। ছবি: সুমন বাবু

কক্সবাজারে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। ছবি: সুমন বাবু

কক্সবাজারে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। ছবি: সুমন বাবু

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক জানান, কক্সবাজারে বৃহস্পতিবার রাতে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়।

বৃহস্পতিবার সারা দিনে জেলায় ২১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেও শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২০২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এর আগে বুধবার বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৪৬৭ মিলিমিটার ও মঙ্গলবার ছিল ৯৯ মিলিমিটার।

জেলায় ঝড়ো হাওয়াসহ ভারি বর্ষণ শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে পারে বলে জানান আবহাওয়াবিদ নাজমুল।

এদিকে ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে জেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কক্সবাজার পৌরসভার বৃহত্তর বাজারঘাটা প্লাবিত হয়ে সড়ক-উপসড়কগুলো খালে রূপ নিয়েছে। প্রধান সড়কে কোমরসমান পানি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়েছে পানি।

চকরিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান জাফর আলম জানান, চকরিয়া পৌরসভাসহ উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এতে দেড় শতাধিক চিংড়ি ঘের ও পাঁচ শতাধিক বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে চকরিয়া-বদরখালী সড়ক।

কক্সবাজার সদর উপজেলার পশ্চিম খরুলিয়া এলাকার ছুরতিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায় উঠে গেছে পানি। ছবি: সুমন বাবু

কক্সবাজার সদর উপজেলার পশ্চিম খরুলিয়া এলাকার ছুরতিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায় উঠে গেছে পানি। ছবি: সুমন বাবু

পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন রামু উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারা। ছবিটি শুক্রবার তোলা। ছবি: সুমন বাবু

পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন রামু উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারা। ছবিটি শুক্রবার তোলা। ছবি: সুমন বাবু

পেকুয়া উপজেলায় সাতটি ইউনিয়ন কম-বেশি প্লাবিত হয়েছে। এতে উপজেলার দেড় শতাধিক বসতবাড়ি ও অর্ধশত চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উপজেলা চেয়ারম্যান শাফায়াত আজিজ রাজু জানান।

রামু উপজেলার চেয়ারম্যান রিয়াজুল আলম জানান, ভারি বৃষ্টির পানিতে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিন শতাধিক বসতবাড়ি। দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের চেইন্দা এলাকায় কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক প্লাবিত হয়ে বন্ধ রয়েছে যানবাহন চলাচল।

সদর উজেলার চেয়ারম্যান জিএম রহিমুল্লাহ জানান, উপজেলার পোকখালী, চৌফলদণ্ডী, জালালাবাদ ও ঈদগাঁও ইউনিয়নসহ আরও কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্লাবন ও ঝড়ো হাওয়ায় শতাধিক বসতবাড়ি ও চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বান্দরবানে ভাই-বোনের মৃত্যু

বান্দরবান শহরে টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে ভাই-বোনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন তাদের বাবাসহ দুজন।

বান্দরবানে পাহাড় ধসে নিহতদের স্বজনদের আহাজারি

বান্দরবানে পাহাড় ধসে নিহতদের স্বজনদের আহাজারি

শুক্রবার ভোররাতে বনরূপা পাড়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে বান্দরবান সদর থানার ওসি আমির হোসেন জানান। নিহতরা হল- মো. আলিফ (১১) ও তার ছোট বোন ফারজানা মীম (৮)।

তাদের বাবা আব্দুর রাজ্জাক এবং শাহ আলম নামে আরেকজনকে জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে ওসি আমির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গত ছয়দিন ধরে টানা বৃষ্টির ফলে ভোর ৩টার দিকে পাহাড় ধসে রাজ্জাকের বসতবাড়ির উপর পড়ে। ঘরে ঘুমিয়ে থাকা দুই শিশু মাটিচাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়।”

পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল ও পুলিশ শিশু দুটির লাশ উদ্ধার করে।

এদিকে টানা বর্ষণে পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের প্রধান সড়ক কেরানীহাট ও রাঙ্গামাটি প্রধান সড়কের কয়েকটি স্থান এখনও পানির নিচে তলিয়ে থাকায় সারা দেশের সঙ্গে এ পার্বত্য জেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে।

ঝিনাইদহ

ঝিনাইদহে তিনদিনের টানা বৃষ্টিতে পৌরসভার নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

শহরের হামদো, আরাপপুর, মুরারিদহ, উপশহরসহ বিভিন্ন মহল্লার নিচু এলাকায় ঘর বাড়িগুলোতে পানি ঢুকেছে। অনেক স্থানে রাস্তার উপর হাঁটুসমান পানি ওঠায় ভোগান্তিতে পড়েছে এলাকাবাসী।

নগরবাসীর অভিযোগ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে এ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

ঝিনাইদহ পৌরসভার মেয়র সাইদুল করিম মিন্টু জানান, পৌরসভার নিচু এলাকাগুলোতে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনের কাজ চলছে। আর বৃষ্টি না হলে শনিবারের মধ্যে জমে থাকা পানি সরানো সম্ভব হবে।

চাঁদপুর

টানা বৃষ্টিতে চাঁদপুর শহরের নাজিরপাড়া, গুয়াখোলা, রহমতপুর কলোনি, প্রফেসরপাড়া, বাসস্ট্যান্ড এলাকা, তালতলা, রেলওয়ে কলোনি এখন হাঁটু পানিতে তলিয়ে গেছে। ডুবে গেছে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা, দোকান ও স্কুলের মাঠ।

জলাবদ্ধতার কারণে ঘর থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন শহরের নাজির পাড়া এলাকার বাসিন্দারা।

চাঁদপুর আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক আজহার উদ্দিন জানান, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চাঁদপুরে ৩৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

ফরিদপুর

ফরিদপুরে টানা ভারি বৃষ্টিতে নিম্ন আয়ের মানুষসহ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

অতি বৃষ্টির কারণে শহরের বড় বড় দোকান থেকে শুরু করে ফুটপাতের দোকানগুলোও ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে। শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত পুরো শহরের পথঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে।

তবে এ পরিস্থিতি উপেক্ষা করেও জীবিকার তাগিদে নিম্ন আয়ের মানুষদের বাইরে বের হতে হচ্ছে।

জেলা আবহাওয়া অফিস জানায়, চলতি সপ্তাহের শেষ তিন দিনে ফরিদপুর অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে ।