যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানানোর বিচারও হবে: প্রধানমন্ত্রী

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক:যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি তাদের যারা মদদ দিয়েছেন এবং মন্ত্রী বানিয়েছেন তাদেরও বিচারের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিজয় দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা বলেন,“যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যখন হয়েছে,সেই বিচারে,সেই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হয়েছে। খালেদা জিয়া জাতির কাছে কী জবাব দেবে? কী জবাব দেবে?

“যুদ্ধাপরাধীদের মদদ দেওয়া,তাদের সম্মান দেওয়া,এটা তো বাংলাদেশের মানুষের ভুলে গেলে চলবে না। এটা বাংলাদেশের মানুষকে মনে রাখতে হবে। এর বিচারও একদিন ইনশাল্লাহ বাংলার মাটিতে হবে। এর বিচারও একদিন হবে। কারণ আমার হাজার হাজার মানুষকে তারা হত্যা করেছে।”

যুদ্ধাপরাধের দায়ে গত ২২ নভেম্বর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মো. মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। চারদলীয় জোট সরকারে খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় ছিলেন একাত্তরের বদর কমান্ডার মুজাহিদ। সে সময় সালাউদ্দিন কাদেরকে মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা করেছিলেন খালেদা জিয়া।

যুদ্ধাপরাধে ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীও খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় ছিলেন।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন,“বিচারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে,এরা যুদ্ধাপরাধী। সাজা হয়েছে এবং সাজা কার্যকর হয়েছে।

“তাকে যে মন্ত্রী বানিয়ে সম্মান দেওয়া হয়েছিল স্বাধীন দেশে- এর দায়দায়িত্ব তো খালেদা জিয়াকেও একদিন নিতে হবে।”

বৃহস্পতিবার বিকালে ফার্মগেইটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন,“১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছে, সেটা আমাদের নতুন প্রজন্ম দেখে নাই।

বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করলেও তার হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এই বিচার বন্ধ করে দেন। পাশাপাশি তাদের রাজনীতি করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেন।

শেখ হাসিনা বলেন, “যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী,যুদ্ধাপরাধী,সেই যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতায় বসানো শুরু করেছিল জিয়াউর রহমান। আর পরবর্তীতে সেটাই অনুসরণ করেছে তা স্ত্রী খালেদা জিয়া।

“যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়েছে, লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত পতাকা তাদের হাতে তুলে দিয়েছে।”

কারও নাম উল্লেখ না করে শেখ হাসিনা বলেন,“স্বাধীনতার দোসর যারা,তারা এখনো থাকে বাংলার মাটিতে,আর স্বপ্ন দেখে ওই পাকিস্তানের।

“তাদের পেয়ারে পাকিস্তানের কথা তারা কখনো ভুলতেই পারে না। পেয়ারে পাকিস্তানের কথাটাও তাদের ভুলিয়ে ছাড়তে হবে। এটা বাংলাদেশ। এটা বাংলাদেশ। ওই পরাজিত শক্তির দালালি করলে চলবে না। আর পরাজিত শক্তির যারা দালাল,তাদের অস্তিত্ব এই বাংলাদেশে থাকবে না।”

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে বলে বিএনপির অভিযোগ নাকচ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি দেখি,বিএনপির অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে মামলা। এ মামলা কীসের মামলা? যারা মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে,যারা হুকুমদাতা,যারা অর্থ প্রদান করেছে,সেই সমস্ত সকলেরই বিচার ইনশাল্লাহ বাংলার মাটিতে হবে।

“মামলা মামলা করে চিল্লালে হবে না। মামলা হয়েছে মানুষ পোড়ানোর জন্য। মামলা হয়েছে মানুষ হত্যা করার জন্য। মামলা হয়েছে গাড়ি পোড়ানোর জন্য, জাতীয় সম্পদ ধ্বংস করা হয়েছে।”

শেখ হাসিনা বলেন,“তারা মানুষ মারবে,জাতীয় সম্পদ ধ্বংস করবে,আর তাদের বিচার হবে না- এটা হতে পারে না। তাদেরকেও অবশ্যই একদিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে।

“খুনি খুনিই। খুনিদের বিচার বাংলাদেশে হবেই। তাদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না।”

দেশে গণতন্ত্র নিয়ে বিএনপির সমালোচনার জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “গণতন্ত্রের কথা কার মুখে শুনি আমরা? সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে অবৈধ উপায়ে যে দল গঠন করেছিল, তাদের মুখে শুনতে হয় গণতন্ত্রের কথা। তারা কোন গণতান্তিক পক্রিয়ায় দল করেছিল, আর ক্ষমতায় এসেছিল? গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটা কী? এটুকু তারা জানে কি না,গণতন্ত্রটা বানান করতে পারবে কি না, সেটাও আমার সন্দেহ আছে।”

জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’ পরিণত করতে চেয়েছিলেন- মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন,“বাংলাদেশ যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, বাংলাদেশ যেন ফেইলড স্টেট হয়-এটাই ছিল খালেদা জিয়ার চক্রান্ত। এটাই ছিল জিয়াউর রহমানের চক্রান্ত। এটাই তারা করতে চেয়েছিল।

“লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হতে পারে না,ব্যর্থ হতে আমরা দেব না।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা জানি এই দেশকে নিয়ে অনেক খেলা,অনেক কথা। কিন্তু আমরা আত্মবিশ্বাস নিয়েই দেশ চালাই।”

দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বলেন,“আমাদের কর্তব্য,কোনোভাবেই যেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ব্যর্থ না হয়। ২১ বছর সময় নষ্ট হয়ে গেছে। আর একটা দিনও,একটা ঘণ্টা সময়ও নষ্ট করতে চাই না। বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে আমরা অব্যাহত রাখতে চাই।

“আমি জানি বাঙালি অসাধ্য সাধন করতে পারে। একাত্তরে যেমন পেরেছি, সেই ভাবে পারব।”

বক্তব্যের শুরুতেই দেশে-বিদেশে মানুষের স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজয় দিবস উদযাপনের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন,“এবারের বিজয় দিবস আমার মনে হয়েছে,শুধু বাংলাদেশে না, প্রবাসেও যারা বাঙালি সকলের মাঝে যেন একটা নতুন উদ্দীপনা নিয়ে,নতুন চেতনা নিয়ে এবং স্বাধীনতার আদর্শ নিয়েই এবারের বিজয় দিবস পালিত হয়েছে।”

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যেদিন পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় তখনও মা, বোন ও এক ভাইসহ বন্দি ছিলেন শেখ হাসিনা।

সেই স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আমার এখনো মনে পড়ে ১৬ ডিসেম্বর সমগ্র বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছিল, কিন্তু আমরা কিন্তু মুক্ত হতে পারিনি। তখনও ১৮ নম্বর রোডের (ধানমন্ডির তৎকালীন ১৮ নম্বর সড়ক) একটি বাড়ি,ছাদের উপর বাংকার করা,তখনও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ওই বাড়িটা ঘিরে রেখেছিল। ১৭ তারিখ সকালে আমরা ওই বাড়ি থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ১৮ নম্বরের ওই বাড়ি থেকে স্যারেন্ডার করেছিল ১৭ তারিখে।”

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বেগম ফজিলাতুন্নেছা,শেখ হাসিনা,শেখ রেহানা ও শেখ রাসেল ওই বাড়িতে বন্দি ছিলেন।

“১৬ই ডিসেম্বরের কথা আমার এখনও মনে হয়। আত্মসমর্পণের পর সারা ঢাকা শহরে ‘জয় বাংলার’ স্লোগান। রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ আমরা কয়টি প্রাণী বন্দিখানায়। চারিদিকে বিজয় উল্লাস। আর আমরা মৃত্যুর প্রহর গুণছি তখনও।

“কারণ ১৬ই ডিসেম্বর স্যারেন্ডারের পর থেকে ওই বাড়ি থেকে হানাদার বাহিনী অনবরত গুলি চালিয়েছে।”

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলির সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত,সভাপতিমণ্ডলির সদস্য মতিয়া চৌধুরী ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম বক্তব্য দেন।