ঢাকায় ‘জঙ্গি আস্তানায়’ মিলল গ্রেনেড, আটক ৭

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক:ঢাকার মিরপুরে ছয়তলা একটি ভবনে ১৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) ‘আস্তানা; থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও ‘সুইসাইড ভেস্ট’ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গণমাধ্যম) জাহাঙ্গীর আলম জানান, এক জেএমবি সদস্যকে গ্রেফতারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শাহ আলী থানার ৯ নম্বর রোডের ‘এ’ ব্লকের ওই বাড়িতে বুধবার রাত ২টার দিকে এই অভিযান শুরু হয়।
এরপর ভবনের বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত সেখানে অভিযান ও তল্লাশি চালায় গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাব ও সোয়াট ইউনিটের সদস্যরা।
ভবনটির ছয় তলার একপাশের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে ১৬টি ‘হাতে তৈরি গ্রেনেড’ এবং দুটি হাতবোমা পাওয়ার পর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের সদস্যরা উত্তর বিসিল সারেং বাড়ি মাজার সংলগ্ন একটি খালি জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সেগুলো ধ্বংস করেন।
ওই বাড়ি থেকে আটক করা হয় আরও ছয়জনকে। আটক এই সাতজনের মধ্যে অন্তত তিনজন জেএমবির ‘গুরুত্বপূর্ণ’ সদস্য বলে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলামের ভাষ্য।
বিদেশ থেকে ‘পরামর্শ ও অর্থায়নে’ সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি হত্যাকা-সহ বিভিন্ন নাশকতার ঘটনা ঘটিয়ে আইএস-জেএমবির নাম দেওয়া হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর একদিন পার না হতেই খোঁজ রাজধানীতে এই জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মিললো।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল সাংবাদিকদের বলেন, হোসাইনী দালান, কামরাঙ্গীর চরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এর আগে যে ধরনের হাতে তৈরি গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছিল, মিরপুরের বিস্ফোরকগুলোও সেরকম।
পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ছানোয়ার হোসেন জানান, বুধবার সন্ধ্যার পর থেকেই ওই ভবনসহ আশপাশের এলাকায় নজরদারি শুরু হয়, মূল অভিযান চালানো হয় রাত ২টা থেকে।
পাশের বাড়ির বাসিন্দা শাহিন বলেন, “রাতে এসেই নির্দেশ ছাড়া কেউ যেন বাইরে বের না হয়- তা আশপাশের সব বাড়ির মালিককে জানিয়ে দেয় পুলিশ। পুরো ৯ নম্বর রোড ব্লক করে দেওয়া হয়।”
ভবনের অন্য বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরই ছয়তলার পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয় বলে মনিরুল ইসলাম।
পাশের বাড়ির মালিক হাসিনা বেগম বলেন, “মধ্যরাতে হঠাৎ করে হৈ চৈ চিৎকার শুনি। আমরা শুনলাম যে পুলিশ এসেছে, কাউকে বের হতে দিচ্ছে না। সারা রাত টেনশনে ছিলাম, পুলিশ-র‌্যাবের গাড়িতে এলাকা ভরে গেল।”
সকাল ১০টার দিকে ওই ভবনে ডজনখানেক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং ষষ্ঠ তলার বাসা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখেন বলে জানান হাসিনা।
বৃহস্পতিবার বিকালে অভিযান শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত ভবনটির বাইরে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও আইনশৃঙ্খল বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্যকে অবস্থান নিয়ে থাকতে দেখা যায়।
দুপুরে ওই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মনিরুল সাংবাদিকদের বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে ভবনের ভেতর থেকে গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে জানালার কাচ ভেঙে যায়। জবাবে পুলিশও গুলি করতে বাধ্য হয়।”
আটকদের বয়স ২০ থেকে ৩৫ এর মধ্যে জানিয়ে তিনি বলেন, “এদের মধ্যে অন্তত তিনজন জেমএবির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। জিজ্ঞাসাবাদ করে বাকিদের পরিচয় জানা যাবে।”
মোট ১৬টি গ্রেনেড ও দুটি হাতবোমা উদ্ধার ও ধ্বংস করার কথা জানিয়ে অভিযান শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এখানেই বোমা তৈরি করা হতো বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখানকার তৈরি গ্রেনেডই হোসাইনী দালানে নিয়ে হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে।”
সেখানে বোমা তৈরির যেসব সরঞ্জাম পাওয়া গেছে, তাতে ‘আরও অন্তত ২০০’ গ্রেনেড বানানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
উপ-কমিশনার ছানোয়ার হোসেন বলেন, ছয়তলার দুই ফ্ল্যাটের একটি থেকে বিস্ফোরকসহ দুজনকে আটক করা হয়। সেখানে রান্নাঘরে ট্রাঙ্ক ও কাপড়ে প্যাঁচানো অবস্থায় বিস্ফোরকগুলো পাওয়া যায়। আর পাশের ফ্ল্যাট থেকে আটক করা হয় বাকি চারজনকে।
বাড়ির মালিকের বরাত দিয়ে ছানোয়ার বলেন, আটকরা চারমাস আগে ছয়তলার ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে। ভাড়া নেওয়ার সময় তারা নিজেদের স্থানীয় একটি কলেজের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল।
“এরা ওই বাসায় গ্রেনেড বানানোর কাজ করত বলে প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি,” বলেন তিনি।
অভিযান শেষে পুলিশ ওই বাসা থেকে একটি ট্রাঙ্ক, দুটি কম্পিউটার ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম নিয়ে যায়। এরপর প্রথম থেকে পঞ্চম তলার ভাড়াটিয়ারা নিজেদের বাসায় ফিরে যান।
তবে এরপরও পুলিশ ওই বাড়ি ঘিরে রেখেছে। সংবাদ কর্মীদেরও সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।