বৃক্ষ রোপণ ইবাদততুল্য

 অধ্যাপক মোঃ মসিউল আযম>

প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও তিন মাস ব্যাপী জাতীয় বৃক্ষরোপন অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০১৬ আয়োজন করা হয়েছে। ২ আগষ্ট থেকে ৮ আগষ্ট পর্যন্ত সামাজিক বন বিভাগ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে এবং জেলা প্রশাসন যশোর এর সার্বিক সহযোগিতায় সপ্তাহব্যাপি এর আয়োজন করা হয়েছে।
জীবন জীবিকা ও পরিবেশের জন্য বৃক্ষ অপরিহার্য। জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনের মাধ্যমে বৃক্ষ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রাখছে। ধরনীর প্রাণীকূল বস্তুত উদ্ভিদ রাজির উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে দিন দিন বনাঞ্চল সংকুচিত হচ্ছে। বৃক্ষ রোপনের মাধ্যমে বনজ সম্পদ বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। এ বছরের বৃক্ষরোপনের মূল প্রতিপাদ্য হলো :
“জীবিকার জন্য গাছ
জীবনের জন্য গাছ”
মহান আল্লাহ পাকের অপূর্ব সৌন্দর্য জীবের মধ্যে গাছ একটি জীব। গাছ এমন একটি জীব যা ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকার কোন উপায় নেই। গাছ মানুষের পরম বন্ধু। গাছপালা বিহীন পৃথিবীর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
সেকালে পর্যাপ্ত বন থাকা সত্ত্বেও প্রাচীনকালে বৃক্ষ রোপন বা বাগান ব্যবস্থা পদ্ধতি এদেশে খুব জনপ্রিয় ছিল। প্রচলিত খনার বচনে পাই-
‘হাত বিশেষ করি ফাঁক
আম, কাঠাল গাছ পুঁতে রাখ
শাল সত্তর আশন আশি
জাম বলে গাছেই আছি।
তাল বলে যদি পাই কাত
বার বছরে ফলে এক রাত।

শুনরে বাপু চাষার পো
সুপারী বাগে মান্দার রো
মান্দারের পাতা পড়লে গোড়ে
ফল বাড়ে পাই পাই করে।’
এমনি অসংখ্য ছড়া এ দেশে প্রচলিত রয়েছে।
গৌতম বুদ্ধের কথায়,
অরণ্য একটি অসামান্য জীব। এর অসামান্য দয়া ও বদান্যতার আঁধার। প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মাঝে তার আনন্দ। এমনি ভাবে যে কাঠুরে তাকে ধ্বংস করে তাকেও ছাড়া দিতে সে কার্পন্য করে না।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে প্রকৃতি বা বৃক্ষরোপন বিষয়ক আলোচনা ভাবাই যায় না। গাছকে ভাল বাসতে জানলে, মন ভাল থাকে, যান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত থাকা যায়। মঙ্গল কামনা করা যায় দেশ ও দশের।
রবীন্দ্রনাথ দেশ বিদেশে বাগান নিয়ে অনেক চিঠি লিখেছেন। কবি বাগান শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। বাংলাদশের মৃত্তিকায় একখানি বাগান করিয়া রাখা মাধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের সাধ্যতীত তাহাও নহে, তবে আলস্য একটি অন্তরায়- এই উক্তি সর্বকালে সর্ব যুগে প্রয়োজন।
গাছ পালা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আমৃত্যু চিন্তিত ছিলেন। বৃক্ষ হয়ে উঠেছিল তার জীবনের সখা।
কোরান হাদীসের আলোকে বৃক্ষ রোপন একটি বড় ধরনের ইবাদত। প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (সা.) কে এক সাহাবীর প্রশ্ন ইয়া রাসুলুল্লাহ যদি কেয়ামত খুব নিকটবর্তী, মৃত্যু আসন্ন এমতাবস্থায় আমি কি করবো? তিনি বললেন- “তোমার হাতের কয়েক মূহুর্ত সময় আছে তাহলে একটি গাছ রোপন করে যাও”। কেননা সে তোমার জন্য দোয়া করবে। গাছ থেকে যে ফল চুরি হয়ে যায় তার পক্ষে একটি সদকায়ে জারিয়া। এর ছোয়াব হিসাব নিকাশ কেয়ামতের আগ পর্যন্ত জারী থাকবে। যার ছোয়াব রোপন কারী কবরে বসে লাভ করবে। এর গাছের ফল থেকে আরেক গাছ হবে, সে গাছের ফল মানুষ পশুপাখী খাবে, ছায়ায় শরীর জুড়াবে এভাবে গাছের বিস্তৃতি, জন কল্যাণ যত বেশী বৃদ্ধি পাবে এর ছোয়াবও তত বৃদ্ধি পাবে।
এক মনীষি মৃত্যুর আগে ভক্তদের বলেন, আমি মারা গেলে একটি ফলদ বৃক্ষেরা নীচে কবর দেবে। ভক্তরা প্রশ্ন করে বৃক্ষে নীচে কেন? তিনি বললেন, আমার দেহ পচে সার হবে, এর ফলে গাছটি বেশী শক্তি পবে। মানুষ পশুপাখি সেই ফল খাবে, এর অছিলায় আল্লাহ যদি আমাকে মাফ করে দেন।
গাছ আল্লাহর যিকির করে। গাছে পাখিরা বসে তারাও আল্লাহর জিকির করে। পাখিরা গাচে বসে চি চি করে চূচু করে। শেখ শাদী (রহ.) বলেন চূচু নেহী ‘বেচু’ ‘বেচু’ করে। পাখীরা আল্লাহ আল্লাহ বলে কলরব করে। যে এলাকায় আল্লাহর জিকির বেশী হয় সে এলাকায় আল্লাহর রহমত বেশী বেশী নাযিল হয়।
একটি গাছ অনেক সময় সন্তানের চেয়েও বড় হতে পারে। ছেলেরা বৃদ্ধ কালে পিতা মাতাকে না দেখলেও বৃদ্ধ কালে গাছ তাকে ফেলে দেয় না বৃদ্ধকালে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু লাছি। সে লাঠিও আসে বৃক্ষ থেকে।
পরিশেষে আমি বলবো এই পৃথিবীর অফুরন্ত সম্পদ আল্লাহর নেয়ামত আমরা ভোগ করছি। এ ক্ষেত্রে আমরা তার প্রতিদানে মানব কল্যাণে, মানব সেবায় করছি আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করছি।
আমরা স্বার্থপরের মত নিজেদের সুখ শান্তির জন্য পাহাড় কেটে, বন উজাড় করে বসতি স্থাপন, শিল্প, কলকারখানা নির্মান করছি।
তাই আসুন! এ বছরে বৃক্ষ মেলার এই সাপ্তাহব্যাপী আয়োজন শুধু আনুষ্ঠনিকতায় পর্যবসিত না হয়, শুধু বক্তৃতা ও কথার ফুলঝুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সেজন্য গাছ লাগাই, গাছ পরিচর্যা করি, বৃক্ষ নিধন বন্ধ করি। নিজে বাঁচি, দেশ ও পৃথিবীটাকে বাঁচাই। আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর সবুজ শ্যামলিমায় বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলি।

লেখক >
মোঃ মসিউল আযম
প্রবীণ সাংবাদিক,
কলাম লেখক ও সমাজ উন্নয়ন কর্মী।
মোবাইল : ০১৭১১১১৬৩৭২