মহানায়কের মৃত্যু নেই

বঙ্গবন্ধু কেবল একজন নেতাই নন, তিনি এই ভূখণ্ডের নাগরিকদের জন্য একটি যুগের স্বপ্নদ্রষ্টা ও বাস্তব রুপদাতা।
পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতার যে সূর্য একদিন অস্তমিত হয়েছিল, মেহেরপুরের (মুজিবনগর) আম্রকাননে সেই সূর্যই আবার উদিত হলো ভূখা-নাঙা মানুষের জন্য নতুন দ্বীপশিখা হয়ে। ঠিক যেমন নজরুল বলেছিলেন, ‘ওই গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দীবাকর! উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার!’ নজরুলের সেই কবিতার বিষয়বস্তু বা স্থান-কাল ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তা আমাদের জন্য ঢের বেশি প্রযোজ্য।
কিন্তু ইতিহাসতো পাহাড়ের শেষ প্রান্ত থেকে ঝরে পড়া কোনো ফল্গুধারা নয় যে, তা নির্দিষ্ট দিকেই ধাবিত হবে। সেতো বহমান নদীর গ্রোতধারার মতো। কখন কোথায় বাক নেবে তা নদী নিজেই জানে না।
মহাপুরুষরা ইতিহাস রচনা করেন, আবার কাপুরুষরাও ইতিহাস রচনা করেন। মহাপুরুষদের রচিত ইতিহাস একটি দেশ বা কালের মানুষের জন্য খুলে দেয় নতুন দ্বার। মানুষকে পথ দেখায় আলোর। জাতিকে করে ঐক্যবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী ও ভবিষ্যতমুখী। আর কাপুরুষদের রচিত ইতিহাস সেই পথকে করে অবরুদ্ধ। ভবিষ্যতের পথে নির্মাণ করে এক অপ্রতিরোধ্য দেয়াল। কিন্তু তারপরও তা ইতিহাস।
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ যেমন অবিচ্ছিন্ন, ১৫ই আগস্টও এ জাতি ও রাষ্ট্রের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। এ কলঙ্ক কোনো দিনই মুছে ফেলা যাবেনা। ১৪ আগস্ট তিমিরান্তে যে হত্যাযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল তার ফলে জাতি হিসেবে আমরা এক চির অমানিশায় নিক্ষিপ্ত হলাম। সে অন্ধকার আজও দূর হয়নি।
বঙ্গবন্ধু ভুল করেছিলেন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, ২১৪ বছর আগের লর্ডক্লাইভ-মীর জাফরের বংশধর ও প্রেতাত্মারা তখনো জীবিত ছিলেন। তাইতো কিসিঞ্জার-আথারটন বলুন আর ফারুক-রশিদ-ডালিমই বলুন, সিরাজউদ্দৌলার উত্তরসূরীদের তারা মুখোশ পরে নগ্ন ছুরি নিয়ে খুঁজে বেড়াবেন, এটাই স্বাভাবিক। সেটা দুশ’ বছর কেন, হাজার বছর পরের ইতিহাসও এভাবেই রচিত হবে।
কিন্তু ইতিহাসের পরম শিক্ষাতো এই যে, আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেই না। তাই জাতির জনককে খুন করেও সে জাতির রাষ্ট্রদূত হওয়া যায়! বুক ফুলিয়ে বলা যায় আমিই খুনি! শুধু তাই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও তাদের ঠাঁই হয়।
তাই, আমাদের কৃষ্ণ প্রহর আর শেষ হয় না। অন্ধকার থেকে যতোই আমরা বের হয়ে আসতে চাই, ততোই গভীরতর অন্ধকারে নিমজ্জিত হই।
ঘাতকচক্র তাদের পুরোনো সেই নীল নকশার বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ইতিহাসের গায়ে যে কলঙ্ক লেপন করেছিল ১৫ই আগস্ট, তারই ধারাবাহিকতায় জাতির জনকের নাম-নিশানাও মুছে ফেলার চক্রান্ত চলে দীর্ঘ দুই দশক ধরে। কিন্তু ইতিহাসতো একবারই রচিত হয়। কালের গর্ভে তা কখনো হারিয়ে যায় না। সময়ের আবর্তে যা হারিয়ে যায়, তার নাম ইতিহাস নয়-ঘটনামাত্র। সব ঘটনাই ইতিহাস নয়। কিছু কিছু ইতিহাস। স্বাধীনতার মহানায়কদের কখনো মৃত্যু হয় না।
ইতিহাসের অমোঘ সত্যকে এতো সহজে মুছে ফেলা যায় না। টুঙ্গিপাড়ার যে রাখাল রাজা বাঙালি জাতিকে মুক্তির গান শোনালেন, স্বাধীনতার কবিতা শোনালেন, উপহার দিলেন শান্তির পায়রা, দিলেন নতুন মানচিত্র-তাঁর বজ্রবাণী আজও জাতিকে পথ দেখায়, হৃদয়কে আন্দোলিত করে। মহানায়করা বুঝি এমনই হন।
শুনেছি সেদিন আকাশে ছিল শ্রাবণের মেঘ। ৩২ নম্বরে রক্তের যে ধারা সেদিন বইছিল, শ্রাবণের বৃষ্টির সঙ্গে মিশে তা প্রবাহিত হলো পদ্মা-মেঘনা-গৌরির স্রোতধারায়।
বঙ্গবন্ধু তাই একটি অবিরাম শোকের নাম।