যশোরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জনসভা হয়েছিল আজ

 রিমন খাঁন>
১১ ডিসেম্বর। স্মরনীয় একটি দিন। দিনটি শুধু যশোর নয় দেশবাসির জন্যে গৌরবের। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কবলমুক্ত বাংলাদেশের মাটিতে যশোর টাউন হল ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিজয় সমাবেশ। মুক্ত বাংলার প্রথম এই জনসভায় প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আর ধ্বংস নয়, যুদ্ধ নয়। এই মুহূর্তে কাজ হল যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তোলা। তিনি সর্বস্তরের মানুষকে স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনায় দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক রুকুন উদ দ্দৌলার লেখা ”মুক্তিযুদ্ধে যশোর”বই থেকে জানাযায়, সেদিন জনসভায় অস্থায়ী রাষ্টপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত সংসদ সদস্য ফণিভূষণ মজুমদার, মরহুম রওশন আলী, মরহুম মোশাররফ হোসেন, তবিবর রহমান সরদার, এম আর আকতার মুকুল, জহির রায়হান প্রমুখ।
জনসভায় প্রধানমন্ত্রী যশোরের তৎকালীন ডিসি ওয়ালি উল ইসলাম এবং কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাঞ্চন ঘোষালকে নির্দেশ দেন যে, আইন শৃঙ্খলায় যেন অবনতি না ঘটে। একই সাথে জনতাকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করবেন। তাজউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, স্বাধীন এই দেশে ধর্ম নিয়ে আর রাজনীতি চলবে না। আর তাই জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। এই জনসভা যখন হয় তখন যশোরের আশপাশে যুদ্ধ চলছিল। জনসভা শেষে তিনি সড়ক পথে কোলকাতা চলে যান।
মুক্ত স্বদেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত প্রথম এ জনসভার খবর সংগ্রহের জন্য উপস্থিত ছিলেন লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার সাংবাদিক পিটার গিল, নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার সিডনি এস এইচ সানবার্গ, বালটিমোর সান পত্রিকার প্রতিনিধি, ওয়াশিংটন পোস্ট’র প্রতিনিধিসহ বহু বিদেশি সাংবাদিক।
এর আগে যশোর শহর থেকে হানাদার বাহিনী ৬ই ডিসেম্বর দুপুর থেকেই চলে যেতে থাকে। তারা যখন বুঝতে পেরেছিল পরাজয় সুনিশ্চিত তখনই তারা গ্রহণ করে পোড়ামাটি নীতি। চালাতে থাকে পাইকারী হারে হত্যা, ধবংস ও নাশকতামূলক কাজ। ৭ ডিসেম্বর ভোর রাতে ৮ নং সেক্টরের অধিনায়ক মেজর মঞ্জুর মিত্র বাহিনীর নবম ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল দলবীর সিং যশোরে প্রবেশ করেন। এরপর ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ জনশূন্য যশোর শহরে পেট্রেপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেন।
বর্তমান যশোর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার রাজেক আহমেদ বলেন ১১ ডিসেম্বরের সমাবেশ জাতীয় জীবনের একটি স্মরনীয় দিন। তিনি বলেন ঐ সমাবেশ আয়োজনের দায়ীত্ব পালন করেছিলাম আমি। এবিষয়ে যুদ্ধকালিন বৃহত্তর যশোরের মুজিব বাহিনীর উপপ্রধান মুক্তিযোদ্ধা রবিউলর আলম বলেন ২ সহস্রাধিক লোকের ঐ সমাবেশে আমি নিজেও উপস্থিত ছিলাম।তিনি বলেন এই দিনটি জাতীয় জীবনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। রবিউল আলম বলেন, ৭১ এর ৬ ডিসেম্বরের পর মানুষ তখন গ্রাম থেকে শহরে আসতে শুরু করেছে । চারিদিকে বিজয়ের উল্লাস আর থেকে থেকে জয়বাংলা শ্লোগান এখনো কানে ভেসে আসছে। তিনি বলেন পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কবলমুক্ত বাংলাদেশের মাটিতে এই ১১ ডিসেম্বর প্রথম বিজয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় যশোর টাউন হল ময়দানে। তাই শুধু যশোর নয় দেশবাসির জন্যে দিনটি গৌরবের।