৯ শতাধিক রোগী ফেলে চিকিৎসকদের নির্বাচনী সভা

বিল্লাল হোসেন>
অন্তঃসত্ত্বা জুই খাতুন (২৫)। প্রসব যন্ত্রণায় হাসপাতালের মেঝেতে ছটফট করছিলেন। তার স্বজনেরা এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছেন। কিন্তু কোনো চিকিৎসকের দেখা মেলেনি। এক প্রকার উন্নত কোনো চিকিৎসা ছাড়াই পড়েছিলেন জুই। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত আরেক রোগী মঞ্জুর হোসেনের বেলায়ও একই ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকের চিকিৎসা না পেয়েই তারা দু’জন চলে যান না ফেরার দেশে। রোববার ঘটনাটি ঘটেছে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপতালে। এদিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত অন্য রোগীরাও চিকিৎসা সেবা পাননি। কেননা চিকিৎসকরা রোগীর চিকিৎসা না দিয়ে তাদের পেশাগত সংগঠনের নির্বাচনের প্যানেল পরিচিতি সভায় ব্যস্ত ছিলেন। স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে জুই খাতুন ও মঞ্জুর হোসেনের অকালে মৃত্যৃ হয়েছে। এর জন্য তারা ওই নির্বাচনী সভাকে দায়ী করেছেন। এ সময় হয়রানির শিকার রোগী ও স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। হাসপাতালে উপস্থিত অনেকেই বলেছেন অফিস সময় দুপুর দুটোর পরও এ নির্বাচনী সভার আয়োজন করা যেতো।
এদিন বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় বহিঃবিভাগের চিকিৎসকদের চেম্বারের সামনে রোগী ও স্বজনদের জটলা। তারা চিৎসার চেঁচামেচি করছেন। অধিকাংশ কক্ষে চিকিৎসকের চেয়ার ফাঁকা। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো চিকিৎসকরা রোগীদের সেবা বন্ধ করে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) নির্বাচনের প্যানেল পরিচিতি সভায় ব্যস্ত রয়েছেন। তাই রোগীরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। আবার আন্তঃবিভাগের রোগীদের ওয়ার্ডে চিকিৎসা দিতে আসেননি কোনো চিকিৎসক। জরুরিবিভাগ থেকে দেয়া ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী তাদের চিকিৎসা চলছিল।
যশোর সদর উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের ডাকাতিয়া গ্রামের জাহিদ হোসেন কাঁদকে কাঁদতে বলেন, সকাল সাড়ে ৮টায় তার অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে জুইকে হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। জুনিয়র একজন চিকিৎসক সিজারের জন্য ওষুধের তালিকা দেন। ওষুধ কিনে আনা হয়। পরে আর কোনো চিকিৎসকের দেখা পাওয়া যায়নি। এক প্রকার বিনাচিকিৎসায় মারা যান অন্তঃসত্ত্বা জুই খাতুন। তার মতো বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন মঞ্জুর হোসেন (২৮) নামের আরো এক রোগী। তার স্বজন আব্দুর রহমান অভিযোগ করেন, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মঞ্জুরকে এদিন সকালে হাসপাতালের পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। অবস্থা গুরুতর হলেও বিশেষজ্ঞ কোনো চিকিৎসককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। উন্নত চিকিৎসা না পেয়েই মৃত্যু হয় মঞ্জুর হোসেনের।
এসময় হাসপাতালের বহিঃবিভাগের টিকিট কাউন্টারে গিয়ে জানা যায় এই আড়াই ঘন্টায় তারা ৯শ’১৩টি টিকিট বিক্রি করেছেন এবং জরুরি বিভাগে এ সময় ৬৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের স্বজনেরা জানিয়েছেন, এদিন সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত অধিকাংশ চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করেননি। তারা বিএমএ নির্বাচনের অংশগ্রহণকারী মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও এহতেশামুল হক চৌধুরী প্যানেলের পরিচিতি সভায় ছিলেন। সরকারি এ হাসপাতালের নিজস্ব মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএমএ ও স্বাচিপ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ডা. বাহারুল ইসলাম। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন যশোরের সিভিল সার্জন ডা. গোপেন্দ্র নাথ আচার্য্য, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ সাহা, সহকারী পরিচালক ডা. একেএম কামরুল ইসলাম বেনু, স্বাচিপের সভাপতি ডা. ইয়াকুব আলী মোল্যাসহ চিকিৎসকরা।
সরেজমিনে অবস্থান করে দেখা গেছে, বেলা ১২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত বহিঃবিভাগের চেম্বারে ফেরেনি. ডা. গোলাম ফারুক, ডা. সোলাইমান কবির, ডা. আমিনুর রহমান, ডা. জিজি এ কাদরি ডা. সিরাজুল ইসলাম, ডা. হিমাদ্রি শেখর সরকার, ডা. গিয়াস উদ্দিন, ডা. অলোক সরকার, ডা. তৌহিদুর রহমান, ডা. মাধবী রানী বিশ্বাস ও ডা. গোলাম কিবরিয়া।
বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী শিরিনা খাতুন, লুৎফর রহমান, স্বজন আনিছুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলমসহ আরো অনেকে জানিয়েছেন, সরকারি হাসপাতালে নিয়মনীতি বলে কিছুই নেই। চিকিৎসক যেন নিজেদের ইচ্ছামতো দায়িত্ব পালন করেন। রোগী দেখা বাদ দিয়ে সভায় অংশগ্রহণ করা রীতিমতো অমানবিক, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে বসে থেকে তাদের দুর্ভোগের শিকার হতে হয়েছে। এদিন অনেক রোগী চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ফিরে যান।
এ বিষয়ে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. একেএম কামরুল ইসলাম বেনু বলেছেন, চিকিৎসকরা ১০/১৫ মিনিটের জন্য নির্বাচনী পরিচিতি সভায় এসেছিলেন। পরে রোগীদের চিকিৎসাসেবার জন্য তারা বেরিয়ে যান। তার চিকিৎসকরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিনা চিকিৎসায় কোনো রোগীর মৃত্যু হয়েছে এ অভিযোগ মিথ্যা বলে তিনি দাবি করেন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ সাহা জানান, হাসপাতালের বিএমএ নির্বাচনের প্যানেল পরিচালিতসভা করা হয়েছে রোগীদের চিকিৎসাসেবা বাদ দিয়ে এ তথ্য সঠিক নয়। সভায় কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও চিকিৎসকরা রোগীদের চিকিৎসাসেবায় ব্যস্ত ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে মিথ্যাচার করা হয়েছে।