আটক দুইজনের আদালতে হত্যার বর্ণনা> চীনা নাগরিকের মরদেহ নিলেন স্বজনরা

নিজস্ব প্রতিবেদক>
যশোরে নিহত চীনা ব্যবসায়ী চ্যাং হি চংয়ের (৪৬) মরদেহ বুঝে নিয়েছেন তার স্বজনরা। শুক্রবার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নেয়ার পর রাত নয়টার দিকে পুলিশ লাশ হস্তান্তর করা হয়। ময়নাতদন্ত টিমের প্রধান যশোর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হুসাইন সাফায়েত শুক্রবার সাড়ে ৮টার দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। এরপর লাশ একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে যায়।
যশোর কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইলিয়াস হোসেন জানান, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর রাতে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। রাতে মরদেহ ঢাকায় নেয়া হয়েছে। এরআগে নিহতের স্বজন মি. চ্যান মওলান ওই প্রতিবেদনের কপি সংগ্রহ করেন। একই সাথে হত্যাকারীদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া যশোর কমার্স ব্যাংকের ২ লাখ টাকার একটি চেক এবং নগদ ২৬ হাজার ৩শ’ টাকাও বুঝে নেন। ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল ডেভিড টিংয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মরদেহ গ্রহন করেন।
ওসি আরও জানান, নিহত চীনা নাগরিক চ্যাং হি চংয়ের মালিকানাধীন উপশহরের অফিস ও গুদামে শুক্রবার ফের তল্লাশি চালানো হয়েছে।
এদিকে ময়নাতদন্ত টিমের প্রধান যশোর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হুসাইন সাফায়েত জানান, ময়না তদন্তকালে তারা মাথায় আঘাত ও শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার আটক দু’জন শুক্রবার রাতে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (আমলী-সদর) বুলবুল ইসলাম এই জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এতে তারা খুনের পরিকল্পনা ও ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আটক নাজমুল হাসান পারভেজ আদালতকে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে নিহত সং উপশহরস্থ গোডাউনে যান। এরপর টাকার হিসাব নিয়ে তাদের সাথে খারাপ আচরণ করেন। সে সময় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে সং এর মাথায় একটি লাঠি দিয়ে আঘাত করে। পরে সং অজ্ঞান হয়ে পড়ে এবং লাশ লুকিয়ে থানায় জিডি করতে যায়।
আসামি মোক্তাদির আহমেদ রাজু আদালতকে জানিয়েছে, ঘটনার দিন কথাকাটাকাটি হয়। এরপর উত্তেজিত হয়ে পড়লে পারভেজ একটি লোহার পাইপ দিয়ে আঘাত করে। পরে সং পারভেজের গলা চেপে ধরে। দুইজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। সং এর হাতের নখের আঘাতে পারভেজের চোয়ালে লাল দাগ হয়। এরপর তাকে দুইজনে ধরে গলাই ফাঁস দিয়ে হত্যা করে। বুধবার বেলা ১২টার দিকে লাশ একটি বস্তায় ভরে বাথরুমে রাখা হয়। পরে পারভেজ ও সে সং এর ঘোপ জেলরোডস্থ বেলতলার ভাড়াবাড়িতে যায় এবং নকল চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢোকে। এরপর সেখান থেকে একটি চেক, নগদ ৩৬ হাজার ৩০০ টাকা এবং মোবাইল ফোন নিয়ে তা বন্ধ করে রাখা হয়। পরে ঢাকায় সং এর স্ত্রী ট্রমা লাই এনের কাছে ফোন করে বলা হয় তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি নিকটস্থ থানায় জিডি করার পরমর্শ দিলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে তারা থানায় যায়। সে সময় পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে পুলিশ পারভেজের চোয়ালে খোচা দাগ দেখে সন্দেহ করে আর তার প্যান্টে রক্তের ফোটা দেখে পুলিশের সন্দেহ হয়। পরে আরো জিজ্ঞাসাবাদ এবং মারপিট করলে তারা ঘটনা স্বীকার করে। রাত ১১টার দিকে জবানবন্দী নেয়া শেষ হলে তাদের জেল হাজতে নেয় পুলিশ। কোতয়ালি থানা থেকে আদালতে নেয়ার সময় পুলিশ বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আসামিদের মাথায় হেলমেট এবং ব্লুটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে নেয়। এবং পুলিশের স্পেশাল স্কোয়াড পাহারা দেয়।
এরআগে এ ঘটনায় উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আব্দুর রহিম হাওলাদার বাদি হয়ে কোতয়ালি থানায় নাজমুল ও মুক্তাদিরকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ১৩৬।
১৫ ডিসেম্বর যশোর উপশহর মহিলা কলেজের পাশে ২ নম্বর সেক্টরের ৩৫ নম্বর বাড়ি থেকে চীনা নাগরিক চ্যাং হিং সংকে (৪৫) তার হাত পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় চীনা নাগরিকের কর্মচারী নেত্রকোনা জেলার চকপাড়া এলাকার মুজবর রহমানের ছেলে নাজমুল হাসান পারভেজ ও তার ভাইপো একই এলাকার রফিকুল আলম বাবুলের ছেলে মুক্তাদির রহমানকে আটক করা হয়।
চীনা নাগরিক চ্যাং হিং সং ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশে ব্যবসা করতেন। সর্বশেষ তিনি ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশে আসেন। গত সাত মাস ধরে উপশহরের এই বাড়িটির নিচতলা তিনি গুদামঘর হিসেবে ব্যবহার করতেন বলে জানান বাড়ির মালিক মাসুদুর রহমান মিলন।