দেশের মর্যাদা ধরে রাখতেই আস্থা রাখবে জনগণ: শেখ হাসিনা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক>
গত সাত বছরের অগ্রযাত্রায় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের যে মর্যাদা তৈরি হয়েছে তা ধরে রাখতে জনগণ আবারও আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে বলে আশা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিজয় দিবস উপলক্ষে শনিবার আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস আছে, জনগণ আবারো… যে মর্যাদাটা বিশ্বব্যাপী সৃষ্টি হয়েছে, তা ধরে রাখতে হলে; আমরা যারা এখনও দেশের সেবা করে যাচ্ছি, আওয়ামী লীগসহ আমাদের জোট এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি- আমাদেরকেই জনগণ আবার ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলেই এই ধারা অব্যাহত থাকবে।”

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ভোটে প্রত্যাখ্যাত হবে বলে মনে করেন শেখ হাসিনা।

এই ধারণার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, “যে নির্বাচনেও পরাজিত, আন্দোলনেও পরাজিত, ভবিষ্যতে জনগণ কেন তাকে ভোট দেবে?”

বর্তমান ধারায় দেশকে এগিয়ে নিতে জনগণের সমর্থন প্রত্যাশা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যে উন্নয়নের ধারা আমরা সূচিত করেছি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ চলছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে- তা অব্যাহত রাখতে হবে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে একসাথে বসবাস করবে।”

এর বিপরীতটা ঘটলে ফের এদেশে একাত্তরের মতো গণহত্যা চালানো হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “ওই রাজাকার, আল-বদর, খুনি- যাদের আমরা বিচার করেছি, তারা যদি এদেশে আবার আসে, তাহলে এদেশের মানুষকে আবার একাত্তরের ভয়াবহ সেই হত্যার মতোই গণহত্যা চালাবে।”

আর তাতে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার এতটুকু ‘দ্বিধা’ নেই বলেও মনে করেন তিনি।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম শক্তিধর দল জামায়াতে ইসলামী একাত্তরের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করে। সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মিলে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এই দলটির শীর্ষ পাঁচ নেতার মৃত্যুদণ্ড এরইমধ্যে কার্যকর হয়েছে। দণ্ডিত হয়েছেন আরও কয়েকজন নেতা।

বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে একই অপরাধে।

কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিকালে এই আলোচনায় জনগণের ওপর আওয়ামী লীগের আস্থার কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “আমরা জনগণের স্বার্থে কাজ করেছি। আমরা জনগণের উন্নয়ন ও কল্যাণে কাজ করেছি। সেই জন্য আমরা জনগণের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা হারাই না।

“জনগণই আমাদের মূল শক্তি।”

বিএনপিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এখন ওনাদের চেষ্টা- এমন কিছু একটা হোক যেন নাগরদোলায় করে ওনাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। সেই দোলা নিয়ে কেউ আসবে না। আর ডুলিতে করে কেউ ক্ষমতায় বসাবে না। ওই আশাও দূরাশা। যাদের আশা করেন তারাও ‘কোলির বুঝ’ বুঝে গেছে। তাদের ডাকে সাড়া দেবে না। সেই চেষ্টা তো করেছে, কেউ আসেনি।”

বিএনপি নেতৃত্বকে ‘গণতন্ত্র চর্চার’ পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “যদি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তাহলে এটা ওটা নানা ধরনের কথা না বলে গণতন্ত্রের চর্চা করুক।”

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে বিএনপির প্রস্তাব এবং তা নিয়ে আলোচনার জন্য রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণের প্রসঙ্গও তোলেন শেখ হাসিনা।

“রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি ডেকেছেন। তারা আলোচনা করবেন। রাষ্ট্রপতি সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।”

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “নির্বাচনে কারচুপির জন্য জনগণের চাপে পদত্যাগ করতে যে বাধ্য হয়েছিল, তার মুখে আবার নির্বাচনের শুদ্ধতার কথা কোথা থেকে আসে?”

শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা আওয়ামী লীগ এই দেশের জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছি। এই দেশের জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না।”

দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস বিক্রির নিশ্চয়তা দিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০১ সালের ভোটে জয়ী হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।

ওই নির্বাচনের আগে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের সরকারি বাসভবনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, “২০০১ সালে ক্ষমতায় আসা আমার জন্য এতো কঠিন ছিল না, যদি আমি একটু কম্প্রোমাইজ করতাম। সেই কম্প্রোমাইজটা হল- আমার দেশের গ্যাস আমার দেশের মানুষের কাজে লাগাব না, সেটা বেচে দেব।

“গ্যাস উত্তোলনে বিনিয়োগ করবে আমেরিকান কোম্পানি, বিক্রি করবে ভারতের কাছে। আর আমার দেশের মানুষ বঞ্চিত হবে।”

ওই প্রস্তাবে না করেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি জাতির পিতার কন্যা। আমার দ্বারা এদেশের মানুষের এতোটুকু স্বার্থহানি হোক, আমার দ্বারা সেটা হতে পারে না।”

ওই প্রসঙ্গ বিস্তারিত তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন যখন এসেছিলেন, তখন তিনি প্রস্তাব দেন। আমাকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যায় আমেরিকায়। সেখানেও তারা প্রস্তাব দেন। আমার একটিই কথা ছিল। যেখানে যা বলেছি, একটি কথাই বলেছি।

“ঠিক নির্বাচনের আগে ফরমার প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার আসেন প্রতিনিধি হয়ে। তখন তত্ত্বাবধায়কের প্রধান ছিল লতিফুর রহমান। তখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারিকে দাওয়াত দেওয়া হয়। সেখানে লাঞ্চের আয়োজন হয় আর এই কথা আলোচনা হয়। আমি চলে আসি। খালেদা জিয়া থেকে যায়। ডিমি কার্টার এতোই খুশি হন যে, খালেদা জিয়ার ঘাড়ে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে যান।

“সেখানে বসে তাদের চুক্তি হয়- খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসলে গ্যাস বেচবে। বিএনপিকে ক্ষমতায় তারা নিয়ে আসল।”

যানজটে ‘গর্বিত’ প্রধানমন্ত্রী

বিজয় দিবসে শুক্রবার বিকালে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে যানজটে পড়েন শেখ হাসিনা। ওই সময় রমনার ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউশনের সামনে থেকে ধানমণ্ডি অভিমুখে বিজয় মিছিল বের করে আওয়ামী লীগ।

এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “গতকাল আমি যখন যাচ্ছিলাম, আমার মিছিলেই আমি ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ে যাই। আমি গর্বিত, এবারে যত মানুষের ঢল, এত মানুষের ঢল আমি দেখিনি। সব থেকে বড় কথা- যুব সমাজ, ছাত্র, জনতা তাদের অবস্থানটা চোখে পড়ার মতো।

“তাদের ভিতরে উল্লাস ও উদ্দীপনা দেখতে পারছি। এটাই আশার আলো দেখাতে পারছে। আগামীতে কেউ ইতিহাস আর বিকৃত করতে পারবে না।”

তিনি বলেন, “আমার ৫০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় আমি বলতে পারি, এখন আর কেউ বাংলার মানুষকে বিকৃত ইতিহাস গেলাতে পারবে না।”

আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে আমীর হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদ, মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ওবায়দুল কাদের বক্তব্য রাখেন।