সাংবাদিকের আত্মকথা

“নড়াইলে ঢাকাগামী বাস উল্টে নারী ও শিশুসহ আহত ২৫” শিরোনামে সোমবারের (১৯ ডিসেম্বর) দৈনিক স্পন্দন পত্রিকার একটি সচিত্র সংবাদ ছাপা হয়েছে। এ সংক্রান্ত খবর বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায়ও বেরিয়েছে। টেলিভিশনের স্ক্রলসহ অনলাইনেও এসেছে। কিন্তু, সাধারণ মানুষের সাফকথা আহত নয়, নিহত হয়েছে। তাও একজন নয়, চারটি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। সাধারণ মানুষের সোজাসাপ্টা মন্তব্য, নিশ্চিত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। অনেকের মতে, পাঁচ থেকে সাতজন নিহত হয়েছেন। প্রাণস্পন্দন কেড়ে নেয়া (!) কথিত সংখ্যাতত্ত্বের ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে সংবাদকর্মী হিসেবে কম বেগ পেতে হয়নি। সঠিক তথ্য মেনে নিতে নারাজ জনসাধারণ। এখনো তাই কৈফিয়তের শেষ নেই। কতজন নিহত হয়েছে, সেই খবর জানতে এখনো ফোন রিসিভ করতে হচ্ছে। সরাসরিও জবাব দিতে দিতে বড় ক্লান্ত।
রোববার (১৮ ডিসেম্বর) নড়াইলের মালিবাগ মোড়ে দুর্ঘটনার পর থেকে বন্ধুমহলসহ পরিচিতজন চার বাসযাত্রীর নিহতের খবর জানার জন্য সে কী আগ্রহ! বিষয়টি জানতে চেয়ে অসংখ্যবার ফোন দিয়েছেন সবাই। সহকর্মী বন্ধুদের (সাংবাদিক) কাছেও এমন খবর জানতে চেয়ে অসংখ্য ফোন এসেছে বলে জানিয়েছেন তারা। জনসাধারণের ধারণা, এ দুর্ঘটনায় কমপক্ষে চারজন নিহত হয়েছে। অনেকে বলেছেন, পাঁচ থেকে সাতজন নিহত হয়েছেন।
প্রিয় পাঠক, সড়ক দুর্ঘটনাসহ অন্য কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটলে বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজনসহ সাধারণ মানুষ সবসময় মৃত্যু বা নিহতের খবর নিয়ে নানা ধরণের গুজব ছড়িয়ে থাকেন। সাংবাদিক হিসেবে অনেকে ফোনে জানতে চায় প্রকৃত ঘটনা। যদিও ‘গুজব’ বিষয়টি নিতান্তই ‘গুজব’ বলে তাদের আশ্বস্ত করি। কিন্তু আমাদের (সাংবাদিক) এ কথা মানতে নারাজ অনেকেই। সঠিক ব্যাপারটি বোঝাতে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়। কেউ কেউ আবার কোনো ভাবেই প্রকৃত ঘটনা বিশ্বাস করতে চায় না। তাদের ধারণা, বিষয়টিকে আড়াল করে যাচ্ছি আমরা।
কিন্তু, গুজবে বিশ্বাসী মানুষদের কাছে যদি জানতে চাই-কোথায় মৃতদেহ দেখলেন, তার বা তাদের পরিচয় কী জানেন। নিহতের পরিবার বা স্বজন কী আপনাকে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। এক্ষেত্রে হাসপাতালে কী মৃতদেহ দেখেছেন। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী আপনাকে বা আপনাদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন? তখন, সেইসব পরিচিত কিংবা অপরিচিত মুখগুলো থেকে বিভিন্ন উত্তর শুনতে হয়।
কেউ বলেন, নিহতের খবরটি আমার এক আত্মীয় জানিয়েছেন। কেউ বলেন, বাসে আসার সময় অন্য যাত্রীরা বলাবলি করছিলেন। আবার কেউ বলেন, যাতায়াতের সময় আমি দেখে এলাম-ঘটনাস্থলে রক্ত ভেসে যাচ্ছে, তিন চারজন ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পড়ে আছে। সে কী দৃশ্য! ‘আমি নিশ্চিত সেই চারজন মারা গেছেন !’ আরো কত কী যে বলেন, তার শেষ নেই!!
প্রিয় পাঠক, প্রিয় বন্ধুরা-তিন চারজন ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকা মানেই কী মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া। আপনি নিশ্চয় কর্তব্যরত চিকিৎসক (ডাক্তার) নন। কিংবা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতালসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নন। তবু আপনি মৃত্যু নিশ্চিত করে ‘গুজব’ ছড়িয়ে দিলেন-‘আমি নিশ্চিত সেই চারজন মারা গেছেন !’ মৃত্যুর নিশ্চিত খবর ফেসবুকেও ছড়িয়ে দিলেন। এতে করে প্রতিটি মানুষের বুক কেঁপে উঠলো। পরিবার-পরিজনসহ প্রতিটি মানুষের মোবাইল ফোন ব্যস্ত হয়ে উঠলো। ব্যস্ত হলো কোম্পানিগুলোর নেটওয়ার্ক। স্বল্প সময়ে কোম্পানিগুলোর বাড়তি টাকা আয় হলো।
সর্বোপরি যারা বাড়ি থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে গাড়ি চড়েছেন-তাদের পরিবারে শুরু হলো দুচিন্তা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর হাউমাউ শব্দ। নিহত হওয়ার এমন গুজবে বয়োবৃদ্ধ কেউ থাকলে আরো দুর্বল হয়ে গেলেন। এমন কী ‘গুজব মৃত্যুর’ এ খবরে বাড়ির বয়োবৃদ্ধ বাবা-মা, সদস্য বা অন্য কেউ মারা গেলেন। এমন অপূরণীয় ক্ষতি করে ‘গুজব’ ছড়িয়ে লাভ কী বলেন? যদি প্রশ্ন করি-এ ধরণের ‘অদ্ভূত গুজব’ ছাড়ানোর ক্ষমতা বা অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? এতে করে সংবাদকর্মীদের মাঝেও সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি। এর প্রভাব অনেক সময় গণমাধ্যমে গিয়েও পড়ে।
সোমবার (১৯ ডিসেম্বর) সকালেও দেখলাম আমার এক ফেসবুক বন্ধু নড়াইলের মালিবাগ মোড়ের সেই যাত্রীবাহী বাস দুর্ঘটনার ভিডিও আপলোডসহ অসত্য তথ্য দিয়ে লিখেছেন-‘একজন স্পটডেড। কেউ কেউ বলছে ৪জন মারা গেছে।’ এই দুর্ঘটনার বাস্তবতা হলো-কেউ মারা যায়নি। মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষা কমকর্তা (নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা) শফিউল ইসলাম, ছয় নারী ও শিশুসহ ২০ জন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহতদের মধ্যে এক নারীর শরীর থেকে এক হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এছাড়া আরো তিনজনের অবস্থা গুরুতর। আমাদের আশা সবাই সুস্থ হয়ে উঠবেন। যাত্রাপথে গাড়ির চালকসহ সবাই সর্তক থাকবেন। আমরা চাই নিরাপদ সড়ক। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন সত্যিকার অর্থে সবার জীবনে সার্থক হোক। প্রসঙ্গত, রোববার (১৮ ডিসেম্বর) বেলা ১১টার দিকে নড়াইল-যশোর সড়কের মালিবাগ মোড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঢাকাগামী যাত্রীবাহী বাস (ফরিদপুর-ব-০৫-০০৩২) উল্টে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পাদটীকা: এ ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সহকর্মীরা তাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। এবার সেই মন্তব্যগুলো তুলে ধরা হলো। জৈষ্ঠ্য সাংবাদিক সুলতান মাহমুদের মন্তব্য-“আজ (গতকাল) বেলা ১১টার দিকে নড়াইলের এড়েন্দায় বাস থেকে নামতেই-কয়েকজন পরিচিতি মানুষের অবাক করা প্রশ্ন-নড়াইলের মালিবাগ মোড়ে বাস দুর্ঘটনায় সাত না আটজন মারা গেছে। উত্তর ছিল-কেউই মারা যাননি। কী সব অবান্তর প্রশ্ন! এমন গুজব তথ্য আর কখনো যেন শুনতে না হয়।” এসএ টিভির সাংবাদিক আবদুস সাত্তার লিখেছেন-“পরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট এক বন্ধু জানালেন ৭/৮ জন মারা গেছে। সব কাজ বাদ দিয়ে দৌঁড়ালাম। কেউ মারা যায়নি। হাসপাতালে ১৫জন চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ৪ জনকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে গুজবের সত্যতা যাচাই করা দরকার।” ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন ও আলোকিত বাংলাদেশের সাংবাদিক আসাদ রহমানের মন্তব্য-“অনেক মানুষ মৃত্যুবরণ (!) করলেই বোধ এরা (গুজব ছড়ানো মানুষেরা) খুশি হতেন। এমন কী আমাদের বাসার গৃহপরিচারিকার (নারী) সাফকথা-বাস দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ নিহতের খবর সাংবাদিকরা চেপে গেছেন।” চ্যানেল নাইনের সাংবাদিক ইমরান হোসেনের মন্তব্য-“নিউজ সংগ্রহের কাজে আমি যখন নড়াইল সদর হাসপাতলে যাই, তখন এক লোক ইজিবাইক থেকে আহতদের হাসপাতালে জরুরি বিভাগে নিতে সাহায্য করছিলেন। লোকটাকে দেখে বেশ ভদ্রলোক মনে হল। আমি তার কাছে কিছু জানতে চাইলাম, তিনি আমাকে বলল-ভাই আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম। সেখান থেকে রোগী নিয়ে আসছি। তার (ওই ভদ্রলোক) চোখের সামনে নাকি অনেক লোক মারা গেছে। আমি প্রশ্ন করলাম-ভাই আপনি কী লাশ দেখেছেন? তিনি আমাকে বললেন-ভাই আপনার যদি বিশ্বাস না হয় আপনি (আমি) ঘটনাস্থলে যেয়ে দেখেন গাড়ির চাকার নিচে এখনও একটি লাশ পড়ে আছে। আমি সত্যি দ্রুত গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে ৬ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছালাম। সেখানে দেখলাম কোনো মানুষ (লাশ) চাকার নিচে নেই। বিভিন্ন লোক আমার কাছে বিভ্রান্ত তথ্য দিচ্ছিল। এর মধ্যে একটা লোক আমাকে বললো-তার চোখের সামনেই ১২টা লাশ বের করেছে। কথাটা শুনে অনেক কষ্টের মাঝেও হেসে দিলাম। পরে সেখান থেকে চলে আসি। আমি সাংবাদিক হিসেবে যতটুকু জেনেছি, এ ঘটনায় আল্লাহর রহমতে একজন মানুষও নিহত হননি।” ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের নড়াইল জেলা সভাপতি সৈয়দ খায়রুল আলম বলেন, “মৃত্যুর বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রচার করা যায় না। গুজব না ছড়িয়ে সঠিক তথ্য জানানো নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব বলে মনে করি।”
লেখক: ফরহাদ খান, নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক স্পন্দন ও নড়াইল প্রতিনিধি, একুশে টেলিভিশন।