রোগীর স্বজনদের জিম্মি করে কর্মচারীদের অর্থবাণিজ্য

বিল্লাল হোসেন>
যশোর সদর উপজেলার ভাতুড়িয়া গ্রামের আক্তারুজ্জামান ওরফে আক্তার (৫৬) শনিবার গভীর রাতে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে আনা হয় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। দয়িত্বরত চিকিৎসক রোগী আক্তারকে ভর্তি করে করোনারি কেয়ার ইউনিটে পাঠান চিকিৎসার জন্য। তাকে ক্যাথেটার লাগানোর কথা বলা হলে সেখানকার ওয়ার্ডবয় কাজল রোগীর স্বজনদের কাছে ৩শ’ টাকা দাবি করে। এ টাকা না পেয়ে তিনি রোগীর ক্যাথেটার না লাগিয়ে চলে যান। পরে ২শ’ টাকার বিনিময়ে অন্য এক ওয়ার্ডবয়কে দিয়ে ওই রোগীর ক্যাথেটার লাগানো হয়। সামান্য টাকার জন্য হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর ক্যাথেটার না লাগানোর ঘটনায় বহিরাগত কর্মচারী কাজলের প্রতি রোগীর স্বজনেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, শুধু কাজল নয় তার মতো অধিকাংশ কর্মচারী টাকা ছাড়া রোগীর কাছে যান না। তবে সবচেয়ে বেশি রোগীর স্বজনদের জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে থাকেন, এখানে কর্মরত বহিরাগত কর্মচারীরা। কর্তৃপক্ষের সঠিকভাবে তদারকি ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা না থাকায় কর্মচারীরা বেপরোয়া অর্থ বাণিজ্যে মেতে রয়েছেন। তাদের কারণেই হাসপাতালে মারাত্মক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগী ভর্তির পর থেকে ছাড়পত্র না নেয়া পর্যন্ত স্বজনদের টাকা গুনতে হয়। এসব বিষয় নিয়ে বিগত দিনে বিভিন্ন পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হলেও কর্তৃপক্ষ অসাধু কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। যে কারণে বন্ধ হয়নি তাদের অর্থ বাণিজ্য। রোগী ও স্বজনদের ভাষ্যমতে হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে কর্মচারীরা টাকা ছাড়া কোনো কাজ করতে চান না। টাকা না দিলেই করা হয় দুর্ব্যবহার। ক্যাথেটার লাগাতে গেলে টাকা, খুলতে গেলেও টাকা দিতে হয়। রোগীর স্বজনদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে তারা ৩/২শ’ করে টাকা হাতিয়ে নেয়। হাশেম আলী নামে এক রোগীর স্বজন জানিয়েছেন, গতকাল সোমবার সকালে তার ভাইকে হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিৎসক তিন তলার পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে নিয়ে যেতে বলেন, ট্রলি করে নিয়ে যাওয়ার জন্য জরুরি বিভাগের এক কর্মচারী তার কাছে ২শ’ টাকা দাবি করে। পরে অনেকবার বলার পর ১শ’ টাকার বিনিময়ে তার রোগীকে ওয়ার্ডে পৌঁছে দেয়া হয়। প্রসূতি ওয়ার্ডে এক রোগীর স্বজন আফরোজা বলেন, এখানকার আয়া ও ঝাড়–দাররা বখশিস বাণিজ্য করে থাকেন। কোনো রোগীর ছেলে হলে ১ হাজার ও মেয়ে হলে ৫শ’ টাকা হাতিয়ে নেন। চাহিদামত টাকা না দিলে তাদের নানাভাবে নাজেহাল হতে হয়। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, হাসপাতালের পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে ৫শ’ টাকা না দেয়া হলে বিষপান করা কোনো রোগীর শাকসান (ওয়াশ) করা হয় না। এ নিয়ে প্রায় রোগীর স্বজনদের সাথে কর্মচারীদের বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। অন্যান্য ওয়ার্ডে রোগীর ড্রেসিং করা বাবদ ১/২ টাকা হাতিয়ে নেয় কর্মচারীরা। জরুরি বিভাগ ও অপারেশন থিয়েটারে সবচেয়ে বেশি ট্রলি বাণিজ্য হয়ে থাকে বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে একই স্থানে কাজ করার সুযোগে এ অনিয়ম করে চলেছেন। আর বহিরাগত কর্মচারীরা বছরের পর বছর কাজ করার কারণে তারা ইচ্ছামতো অর্থবাণিজ্য করছেন। এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ সাহা দৈনিক স্পন্দনকে বলেছেন, রোগীর স্বজনদের জিম্মি করে কর্মচারীদের অর্থবাণিজ্যের বিষয়টি তিনি শুনেছেন। বিয়ষটি গোপনে তদন্ত করে দেখছেন। হাসপাতালের নিজস্ব কর্মচারী এ অবৈধ বাণিজ্যে লিপ্ত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর বহিরাগতরা এ অনিয়ম করলে তাকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হবে।