ঢাকার আশকোনায় অভিযান: জঙ্গিনেতা কাদেরীর ছেলেসহ নিহত ২

স্পন্দন ডেস্ক>
রাজধানীর আশকোনার জঙ্গি আস্তানায় প্রায় ১২ ঘণ্টার পুলিশি অভিযানে জঙ্গিনেতা তানভীর কাদেরীর ছেলেসহ দুজন নিহত হয়েছেন।
আহত অবস্থায় একটি শিশুকে উদ্ধারের পাশাপাশি আত্মসমর্পণ করেছেন নিহত আরেক জঙ্গি http://d30fl32nd2baj9.cloudfront.net/media/2016/12/24/militant-hideout_ashkona_05.jpg/ALTERNATES/w640/militant-hideout_Ashkona_05.jpgনেতা জাহিদুল ইসলামের স্ত্রীসহ চারজন।
দক্ষিণখানের পূর্ব আশকোনায় হজ ক্যাপম্পের কাছে তিন তলা বাড়ি সূর্যভিলায় শনিবার ভোররাতে অভিযান শুরু করে বিকালে তা শেষ হয়।
বিকাল পৌনে ৪টার দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও পুলিশ প্রধান এ কে এম শহীদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সামনে এসে অভিযানের সমাপ্তির কথা জানান।
তিন তলা ওই বাড়ির নিচ তলার জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের পরও অনেক বিস্ফোরক পড়েছিল বলে কাউকে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ।
আবেদাতুল ফাতেমা খাদিজাসহ আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানা থেকে আটক তিনজন (ফাইল ছবি)স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সেখানে অনেক গ্রেনেড পড়ে আছে, বিস্ফোরক পড়ে আছে। তাজা বোমা রয়েছে। আমাদের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটগুলো এখন কাজ করছে।”
ঘটনাক্রম
এক প্রবাসীর মালিকানাধীন ওই বাড়িটি মধ্যখরাতে ঘিরে ফেলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, পরে অন্য শাখাগুলোও যোগ দেয়।
বাড়ির নিচতলায় জঙ্গিদের আস্তানা বলে সন্দেহের কথা জানায় পুলিশ; বের করে আনা হয় অন্য। ঘরগুলোর বাসিন্দাদের।
জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করতে আহ্বান জানানো হয় হ্যাান্ড মাইকে; সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জঙ্গিনেতা জাহিদের স্ত্রী, মেয়েসহ চারজন পুলিশের হাতে ধরা দেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া তখন জানান, ভেতরে জঙ্গিনেতা কাদেরীর ছেলেসহ আরও তিনজন রয়েছেন।
দুপুর ১টার দিকে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়; এক নারী বেরিয়ে এসে তার দেহের সঙ্গে বাঁধা গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটান বলে জানায় পুলিশ। তার দেহ সেখানই পড়ে থাকে।
ওই নারীর সঙ্গে থাকা একটি শিশু আহত হন। তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ।
এরপর থেকে সেখানে থেকে থেকে গুলির শব্দ আসতে থাকে; বিকাল পৌনে ৪টায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের সামনে এসে বলেন, কাদেরীর ছেলেও নিজের বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন।
নিহত-আহত-উদ্ধার ব্যক্তিদের পরিচয়
ওই বাড়িতে ‘আত্মঘাতী বিস্ফোরণে’ নিহত দুজনের একজন হলেন জঙ্গিনেতা তানভীর কাদেরীর ১৪ বছরের ছেলে, যাকে এলাকাবাসী শহীদ কাদেরী নামে চিনত। নিহত অন্য্জন জঙ্গিনেতা সুমনের স্ত্রী বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।
আহত অবস্থায় উদ্ধার করা ৪/৫ বছরের শিশুটি জঙ্গি ইকবালের মেয়ে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তার মায়ের নাম শাকিরা। স্প্লিন্টারে জখম শিশুটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তার আগে সকালে যে চারজন আত্মসমর্পণ করেন, তারা হলেন সাবেক মেজর জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী জেবুন্নাহার শীলা ও তার মেয়ে এবং জঙ্গিনেতা মুসার স্ত্রী তৃষ্ণা ও তার মেয়ে।
বাবার পথে ছেলেও
বছরের মাঝামাঝিতে গুলশান হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেক গত ১০ সেপ্টে¤॥^র আজিমপুরের একটি বাড়িতে অভিযানের সময় টিকতে না পেরে তানভীর কাদেরী আত্মহত্যাম করেন বলে পুলিশ জানায়।
গোয়েন্দারা বলছেন, তামিম চৌধুরী নিহত হওয়ার পর নব্য্ জেএমবির সমন্বয়কের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছিলে কাদেরী। ‘আব্দুল করিম’ ও ‘শমসেদ’ নামে সংগঠনে পরিচিত ছিলেন তিনি। করিম নাম ব্যবহার করেই তিনি বসুন্ধরা আবাসিকে গুলশান হামলাকারীদের জন্য ফ্ল্যাট ভাড়া করেছিলেন।
কাদেরীর স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা এবং তার জমজ ছেলেদের একজন আজিমপুরের ওই অভিযানের সময় আহত অবস্থায় গ্রেফতার হন।
তখন অন্যব ছেলের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তার সাড়ে তিন মাস পর আশকোনার বাড়িটিতে কাদেরীর আরেক ছেলের খোঁজ পেয়ে অভিযানের কথা জানান পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম।
সূর্যভিলা ঘিরে ফেলার পর পুলিশ সদস্যররা জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়।
ঢাকার পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সকাল ১০টার দিকে সাংবাদিকদের বলেন, দফায় দফায় আত্মসমর্পণ করতে বলার পর নিহত জঙ্গিনেতা জাহিদের স্ত্রী ও তার মেয়ে এবং পলাতক জঙ্গিনেতা মুসার স্ত্রী ও মেয়ে পুলিশের কাছে ধরা দেন। তারা একটি পিস্তল ও ছয় রাউন্ড গুলিও পুলিশের কাছে জমা দেন।
ভেতরে থাকা বাকি তিনজনের মধ্যের এক নারী এক শিশুকে নিয়ে দুপুরে বেরিয়ে এসে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটালেও কাদেরীর কিশোর ছেলেটি বেরিয়ে আসছিল না বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান।
তিনি বলেন, “ছেলেটি কিছুতেই আত্মসমর্পণ করছিল না। তখন আমাদের পুলিশ গ্যাস নিক্ষেপ করে। সে গুলি চালানো শুরু করে। তখন সে ভেতরে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে আমাদের পুলিশ দেখে সেখানে সে মৃত অবস্থায় পড়ে আছে।”
ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সকালে বলেছিলেন, “ভেতরে তিনজন রয়েছেন। তাদের কাছে প্রচুর এক্সপ্লোসিভ (বিস্ফোরক) ও সুইসাইড ভেস্ট রয়েছে।”
ঘটনাস্থলে থাকা উত্তরা ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, “যারা ভেতরে আছে তাদের বারবার অত্মসমর্পণ করতে বলা হচ্ছে। কিন্তু তারা ভেতর থেকে বলছে-তাদের শরীরে গ্রেনেড বাঁধা, গ্রেপ্তারের চেষ্টা করলে বিস্ফোরণ ঘটাবে।”
কাদেরীর ১৪ বছর বয়সী এই ছেলে এলাকায় কিশোরদের মধ্যে জঙ্গিবাদের প্রচার চালাতেন বলে ওই এলাকার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
১৪ বছর বয়সী এক কিশোর দোকানি জানায়, সখ্যএ গড়ে ওঠায় সে মাঝেমধ্যে কাদেরীর ওই ছেলের সঙ্গে ব্যা ডমিন্টন খেলতে ওই বাড়ি যেত।
“আমাকে ধর্মীয় গান শোনাত, জিহাদের কথা বলত। রাতে প্রায়ই আমাকে তার বাসায় থাকতে বলত। বলত- ধর্ম নিয়ে কথা আছে।”
গত ১৫ ডিসে¤॥^র কাদেরীর ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল এই কিশোরের।
“সেদিন সে আমাকে তার বাসায় ডেকে নিয়ে জিহাদে যোগ দিতে বলেছিল। সে বলে- ইসলামের পথে আসতে হবে, বন্দুক হাতে নিতে হবে, জিহাদ করতে হবে।”
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাটিকামারি গ্রামের কাদেরী লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে দুটি বেসরকারি কোম্পানি ঘুরে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং শাখায় উচ্চ পদে যোগ দিয়েছিলেন।
২০০১ সালে তিনি বিয়ে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে লেখাপড়া শেষ করে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘সেইভ দ্য চিলড্রেন’এ চাকরিরত ফাতেমাকে।
২০১৪ সালে হজ করতে সপরিবারে সৌদি আরবে যান তানভীর। সেখান থেকে ফিরে আসার পর তানভীরের মধ্যে ধর্মীয় উগ্রতা ধরা পড়ে আত্মীয়দের চোখে। ফাতেমাও তখন থেকেই হিজাব পরা শুরু করেন বলে স্বজনরা জানান।
হজ থেকে ফিরে ২০১৪ সালে ডাচ-বাংলার চাকরি ছেড়ে ‘আল সাকিনা হোম ডেলিভারি সার্ভিস’ নামে একটি ব্যবসা শুরু করেছিলেন কাদেরী।
এর মধ্যেই তিনি জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন বলে পুলিশের ভাষ্যা। তার স্ত্রী আদালতে নিজের কর্মকা-ের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, স্বামীর কারণেই নাশকতার এই পথে নেমেছিলেন তিনি।