সড়কে ঝরে গেলো স্বপ্ন

বিল্লাল হোসেন>
মেধাবী ছাত্রী কানিজ ফাতেমা পপি (২৬) ও রুমিছা খাতুন রুমি (২৫)। তাদের বুক ভরা স্বপ্ন ছিলো উচ্চশিক্ষিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবেন ও পিতামাতার মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগেই তারা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ঘাতক ট্রাক কেড়ে নিলো এ দুই মেধাবীর জীবন প্রদীপ। সোমবার দুপুরে যশোর শহরতলী বকচর আল আমিন জামে মসজিদের সামনের এ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে নিহত হন পপি। আর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রুমি। তাদের বহনকারী মোটরসাইকেলের চালক নাসির উদ্দিনের (৩৫) অবস্থাও গুরুতর। ওই দুই ছাত্রী যশোর সরকারি এমএম কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্সে ভর্তি ফরম পূরণ করে বাড়ি ফিরছিলেন। স্বজনেরা জানিয়েছেন, মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার কারণে তাদের স্বপ্ন সড়কেই ঝরে গেলো। নিহতদের বাড়ি একই গ্রামে হওয়ায় এলাকাবাসীর মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন সকালে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার দত্তকোনা গ্রামের আজিজুর রহমানের মেয়ে পপি ও মোহাম্মদ আলীর মেয়ে রুমি একই এলাকার ওয়াজেদ আলীর ছেলে নাসির উদ্দিনের মোটরসাইকেলে করে যশোর এমএম কলেজে আসেন ভর্তি ফরম পূরণ করার জন্য। সেখানে ফরম পূরণ শেষে তারা মোটরসাইকেলে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় দুপুর ১টার দিকে। পথিমধ্যে তারা বকচর এলাকার আল আমিন জামে মসজিদের সামনে পৌঁছালে পিছন থেকে একটি ট্রাক মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। সড়কের উপর ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলে নিহত হন পপি। স্থানীয় লোকজন মারাত্মক জখম অবস্থায় রুমি ও নাসিরকে উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে মারা যান আরেক মেধাবী রুমি। কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই মাহবুব জানিয়েছেন, সড়ক দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি সেখানে গিয়ে দেখতে পান পপির মৃতদেহ সড়কের উপর পড়ে আছে। পরে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। এসআই মাহবুব আরো জানান, ঘাতক ট্রাকের পিছনের একটি চাকা ওই ছাত্রীর মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে। আহত নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, ট্রাকটি বেপরোয়া গতিতে এসে মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। আঘাতে পপি সড়কের উপর এবং তিনি ও রুমি পাশে ছিটকে পড়েন। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মনিরুজ্জামান লর্ড জানিয়েছেন, মাথা ও বুকে প্রচণ্ড আঘাত লাগার কারণেই কলেজছাত্রী রুমির মৃত্যু হতে পারে। উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হলো না। বিকেলে হাসপাতাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নিহত দুই ছাত্রীর স্বজনদের কান্না ও বুকফাটা আর্তনাদে সেখানকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে। তাদের আহাজারিতে অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। মৃতদেহ দেখতে আসা প্রতিবেশীরা বলেন, পপি ও রুমি খুব ভালো বান্ধবী ছিলেন। কলেজে যাওয়া, আসাসহ দিনের প্রায় সময় কাটাতেন এক সাথে। আবার দু’জন একই দিনে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাদের অকাল এ মৃত্যু অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। হাস্যোজ্জ্বল পপি ও রুমির মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহত পপির খালাতো ভাই মণিরামপুর ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক আব্দুল হালিম জানিয়েছেন, পপির বুকভরা স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। শেষ পর্যন্ত তার এ স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। নিহত দুই ছাত্রীর পরিবারের লোকজন বলেছেন, সকালে তারা হাসিমুখে বাড়ি থেকে বের হয়ে লাশ হয়ে বাড়ি ফেরার বিষয়টি ভাবতে তাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। করুণ এ মৃত্যু তারা মেনে নিতে পারছেন না। সন্তানকে হারিয়ে শোকে পাগল প্রায় পপি ও রুমির পিতা-মাতা। উল্লেখ্য, এর আগের দিন রোববার যশোর সদর উপজেলার সাতমাইল বারীনগর এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম ও হোটেল ম্যানেজমেন্টের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান (২৪)। তিনি পরীক্ষা শেষে যশোরে বন্ধু রেজওয়ানের বাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন।