ডুমুরিয়া মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে নিরব বিপ্লব

সুব্রত কুমার ফৌজদার, ডুমুরিয়া>
খুলনার ডুমুরিয়াতে মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে নিরব বিপ্লব ঘটে চলেছে। বর্তমান ১৭ হাজার ৮’শ ৫৪ হেক্টর জমিতে গলদা ও বাগদা চিংড়ী চাষ হচ্ছে। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে নিরাপদ চিংড়ি উৎপাদনে রিতিমতভাবে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরকেও প্রশিক্ষনসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে উদ্ধুদ্ধ করছে উপজেলা মৎস্য বিভাগ।
সরেজমিনে ঘুরে চাষি এবং মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মৎস্যসম্পদে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলায় ছোট বড় বিভিন্ন জলাশয় মিলিয়ে প্রায় ১১ হাজার ১’শ ৫৪ হেক্টর জমিতে গলদা চিংড়ী এবং ৬ হাজার ৭’শ হেক্টর জমিতে বাগদা চিংড়ি চাষ হচ্ছে। বর্তমান অধিকাংশ চাষিরা মৎস্য বিভাগের প্রশিক্ষণ নিয়ে সনাতন পদ্ধতি ছেড়ে প্রাকৃতিক উপায় নিরাপদ চিংড়ী চাষে ঝুঁকে পড়েছে। এতে করে ডুমুরিয়ায় মৎস্যখাতে নতুন দিগন্তের যাত্রা শুরু হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে মাছ ও চিংড়ি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে উপজেলা মৎস্য বিভাগ বিগত ১ বছর ধরে চাষীদের গুড এ্যাকুয়াকালচার প্রাকটিস ও ফুড সেফটি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, চাষীর খামার পরিদর্শন ও পরামর্শ প্রদান, প্রদর্শনী খামার স্থাপন, মাঠ দিবস, উদ্বুদ্ধকরণ, জলাশয় সংস্কার, চিংড়ি চাষে নারীর অংশগ্রহন বৃদ্ধি, ক্লাষ্টার ভিত্তিক চিংড়ি চাষ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। ইতিমধ্যে ১ হাজার ১’শ ৭১ জন চাষীকে উন্নতমানের প্রশিক্ষণ প্রদান, ৭’শ ২০টি খামার পরিদর্শন ও পরামর্শ প্রদান, ৩০ টি সচেতনতা সভা, ২৪ টি ক্লাস্টারে সর্বমোট ৬শ’ জন নারী চিংড়ি চাষিকে প্রশিক্ষণ, উৎসাহ প্রদান এবং কারিগরি সহযোগিতা প্রদান ইত্যার্দি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। বর্তমানে ডুমুরিয়াতে ১৫ হাজার ১৫০ মে.টন মাছ এবং ১ হাজার ১শ’৭ মে.টন চিংড়ি উৎপাদন হচ্ছে।
শুধু মাছ উৎপাদন বৃদ্ধিই নয় বরং নিরাপদ মাছ ও চিংড়ি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও উপজেলা মৎস্য বিভাগ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। চিংড়ি চাষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার না করে, গোবর, হাঁস মুরগীর বিষ্টা, ইত্যাদি ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে নিরাপদ চিংড়ি উৎপাদনের লক্ষ্যে উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নের বড়ডাঙ্গা গ্রামের ২২৮ জন চিংড়ি চাষীকে একত্রিত করে গড়ে তোলা হয়েছে চিংড়ি চাষ পল্লী। ইতোমধ্যে সেখানে চিংড়ি চাষের বড়ডাঙ্গা মডেল নামে ব্যপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ভান্ডারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হিমাংশু বিশ্বাস মৎস্য বিভাগের উন্নয়নের কর্মকান্ডের দিক তুলে ধরে বলেন, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা যেভাবে সাধারণ চাষীদের সঙ্গে মিলে মিশে তাদের আপন করে সেবা প্রদান করেন এতে আমার ইউনিয়নের চাষিরা অত্যন্ত খুশী এবং আনন্দিত। সাহস গ্রামের নারী চিংড়ি চাষী রীতা চৌধুরী বলেন, আমি আগে অসুস্থ স্বামী সন্তান নিয়ে খুব অভাবের মধ্যে ছিলাম। মৎস্য কর্মকর্তা সরোজ স্যারের পরামর্শে ২৫ জনের একটি দল গঠন করে প্রশিক্ষণ নিই। বর্তমানে আমি চিংড়ি চাষ করে খুব ভাল আছি। এ বছর আমি ৭০ শতাংশ জায়গায় চিংড়ি চাষ করে প্রায় ৫৫ হাজার টাকা লাভ পেয়েছি।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সরোজ কুমার মিস্ত্রি বলেন, ডুমুরিয়াকে মৎস্যখাতে উন্নয়নে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এমপি বলেন, মৎস্যখাতে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ খাতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইতিমধ্যে ডুমুরিয়াতে সাদামাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া ও কুচিয়া চাষকে জনপ্রিয় করার জন্য বিভিন্ন কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে মৎস্য বিভাগ অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কাজ করছে। যার ফলে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ ৪র্থ স্থান অর্জন করেছে। আমরা আশা করছি আগামীতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মৎস্যখাত ২য় বা ৩য় স্থানে পৌছে যাবে।