মোরেলগঞ্জে দাখিল পরীক্ষায় নকলের মহোৎসব

হেমায়েত হোসেন হিমু, মোরেলগঞ্জ >
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে মাদ্রাসা পরীক্ষায় আবার ফিরে এসেছে নকলের মহোৎসব। রওশন-আরা ডিগ্রি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে চলমান দাখিল পরীক্ষায় কেন্দ্র সচিবের তত্বাবধানে তারই খলিফাদের নিয়ে গঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ফ্রি-স্টাইলে নকলের উৎসব চলছে।
অভিযোগ সূত্র ধরে প্রমাণ পাওয়া গেছে, কেন্দ্র সচিব মাওলানা ফখরুল ইসলাম তার কয়েকজন খলিফার মাধ্যমে গোটা কেন্দ্রে ফ্রিস্টাইলে নকল চালাচ্ছেন। দেখা গেছে প্রতিটা কক্ষেই নকল চলছে, একে অপরের খাতা দেখে লেখালেখির প্রতিযোগিতা করছে। আর এ কাজে সহযোগিতা করছেন প্রতিটি কক্ষের দায়িত্বরত পরিদর্শক ও বহিরাগতরা। অনুসন্ধানে জানাগেছে, সূর্যমূখি দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা শাহ-আলমের ছেলে, কাঁঠালতলা গিয়াসিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক আ.রশিদের ছেলে, আবুল কাশেম স্মৃতি দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক ওবায়দুলের ছেলে, নিশানবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার সহসুপার আ. হাইয়ের মেয়ে এই কেন্দ্রে চলতি দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোন শিক্ষকের নিজ সন্তান পরীক্ষার্থী হলে ওই শিক্ষক কোন ক্রমেই পরীক্ষা সংক্রান্ত কোন দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিন্তু কেন্দ্র সচিব ফখরুল ইসলাম পরীক্ষা সংক্রান্ত এ নীতিমালার তোয়াক্কা না করে ওই শিক্ষকদেরকে বিশেষ চুক্তিতে কেন্দ্র ও কক্ষ পরিদর্শকের দায়িত্ব প্রদান করেন। দেখা গেছে ওই শিক্ষকদের সন্তানেরা যে সব কক্ষে পরীক্ষা দিচ্ছে তারা তার পাশের কক্ষে নিয়মিত কক্ষ পরিদর্শক থেকে নিজ নিজ সন্তানকে নকলে সহায়তা করছেন। যেমন আ. রশিদের ছেলে পরীক্ষা দিচ্ছে ১ নম্বর কক্ষে তিনি রয়েছেন ২ নম্বর কক্ষে, আ. হাইয়ের মেয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে ১৭ নম্বর কক্ষে তিনি পরিদর্শক আছেন ১৮ নম্বর কক্ষে, ওবায়দুলের ছেলে পরীক্ষা দেয় ৭ নম্বর কক্ষে তিনি দায়িত্ব পালন করেন ৬ নম্বর কক্ষে।
আবার মাওলানা শাহ আলমের নিজ ছেলে পরীক্ষার্থী হলেও তিনি কেন্দ্রে প্রশ্ন আনা নেয়া ও কক্ষ পরিদর্শকদের দায়িত্ব বন্টনের নামে সার্বক্ষনিক কেন্দ্রে অবস্থান করে নিজ সন্তানদেরকে নকলে সহায়তা করছেন।
কেন্দ্র সচিব ফখরুল ইসলামের নিজ মাদ্রাসা হাজী ইব্রাহিম স্মৃতি দাখিল মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের নকলে সহায়তার জন্য নিয়মিত কক্ষ পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া হয় আবু হুরায়রা (রা.) দাখিল মাদ্রাসার একজন মেধাবী শিক্ষককে। ইউসুফিয়া আলিম মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের নকলের সহায়তার জন্য নিয়মিত কক্ষ পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া হয় ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মশিউর রহমানের স্ত্রীর পরিচালিত তালিমুন্নেছা মহিলা দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক আবুল বাশারকে। নিশানবাড়িয়া দাখিল মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয় ৪ ও ৫ নম্বর কক্ষে। কিন্তু ওই মাদ্রাসার সুপার শহিদুল ইসলাম নিয়মিত সার্বক্ষনিক ওই কক্ষের সামনে চেয়ার টেবিল দিয়ে বসে থেকে তার শিক্ষার্থীদেরকে নকলে সহায়তা করেন। মানিক মিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক খায়রুল বাশার সার্বক্ষনিক তার মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের কক্ষের ভেতরে অবস্থান করে নকলে সহায়তা করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই খায়রুল কেন্দ্রে বা কক্ষে কোন দায়িত্বে না থাকলেও কেন্দ্র সচিবের সঙ্গে তার মাদ্রাসার সুপার শহিদুল ইসলামের বিশেষ চুক্তিতে শিক্ষক খায়রুল সার্বক্ষনিক অবৈধভাবে কেন্দ্রে থেকে তার মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের কক্ষে প্রবেশ করে নকলে সহায়তা করেন। আর এভাবে পরীক্ষা চলাকালে ফ্রিস্টাইলে নকলে সহায়তা করছেন কেন্দ্র সচিব মাওলানা ফকরুল ইসলামের খলিফা হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রে ও কক্ষে দায়িত্ব পালনকারী ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রধান ও তাদের নিয়েজিত প্রতিনিধিরা।
একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, গণিত পরীক্ষার দিন কেন্দ্র সচিবের প্রধান খলিফা হিসেবে পরিচিত বিএসএস দাখিল মাদ্রাসার সুপার অহিদুল ইসলামকে নকলসহ আটক করে আবার ছেড়ে দেন ওই কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মনজুরুল আহসান। এ বিষয় তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অহিদুলসহ অন্য এক শিক্ষক নকল দেয়ার চেষ্টা করছিল তাই তাদেরকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেন্দ্রে অবাধ নকলের সুযোগ করে দেয়ার জন্য বিভিন্ন পর্যায় সম্মনি প্রদান ও অন্যান্য খরচ মেটাতে কেন্দ্র সচিব তার নির্ধারিত খলিফাদের মাধ্যমে প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে প্রবেশপত্র ফি, এমসিকিউ কারেক্ট করে দেয়ার জন্য ২০০টাকা, কেন্দ্রে কড়াকড়ি না দেয়ার জন্য ঠান্ডা ফি বাবদ ১০০ টাকা ও পানি পান করানো বাবদ ১০০টাকা করে আদায় করেন। আবার ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য ৩০০টাকা করে ফি ধার্য করেছেন বলে জানাগেছে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. মনজুরুল আহসানের কাছে জানতে চাইলে অভিযোগের বিষয়টি তিনি তদন্ত করে দেখবেন বলে জানান। এসব বিষয় কিছুই জানা নেই বলে জানান কেন্দ্র সচিব মাওলানা ফখরুল ইসলাম।