৪৫ বছর পর বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের বাইসাইকেল সংরক্ষিত হচ্ছে জাদুঘরে

ফরহাদ খান>
৪৫ বছর পর বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের বাইসাইকেল জাদুঘরে সংরক্ষিত হচ্ছে আজ! নূর মোহাম্মদের ৮১তম জন্মবার্ষিকীতে আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে বাইসাইকেলটি জাদুঘরে হস্তান্তর করা হবে।
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের আত্মীয় (শ্যালক) নড়াইলের ডৌয়াতলা গ্রামের মশিয়ার রহমান জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পরিবারের সাথে দেখা করতে যশোর থেকে বাইসাইকেল চালিয়ে নূর মোহাম্মদ একবার বাড়িতে (নড়াইলের মহিষখোলা) আসেন। পরে যশোরে ফিরে যাওয়ার সময় সাইকেলটি মশিয়ারের বড় ভাই অলিয়ার রহমানের কাছে রেখে যান নূর মোহাম্মদ। মশিয়ার রহমানের ভাই সে সময় দশম শ্রেণিতে লেখাপড়া করতেন। মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে নূর মোহাম্মদ শহীদ হওয়ার পর বাইসাইকেলটি সযতেœ সংরক্ষণ করা হয়। মশিয়ার রহমান বলেন, আমার বড় ভাইয়ের (অলিয়ার) মৃত্যুর পর ভাতিজা এমদাদুল হক সাইকেলটি ব্যবহার করে আসছিলো। এ সাইকেলটি আজ রোববার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘদিন পর ২০১৬ সালের প্রথম দিকে নূর মোহাম্মদের ব্যবহৃত বাইসাইকেলটি সম্পর্কে ব্যাপক জানাজানি হলে তা সংরক্ষণের দাবি উঠে। ওই বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক স্পন্দন পত্রিকায় এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর জেলা প্রশাসন বাইসাইকেলটি জাদুঘরে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। অবশেষে আজ রোববার তা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। সাইকেলটির ব্যবহারকারী এমদাদুল হক বলেন, বাবার (অলিয়ার) মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন সাইকেলটি আমি ব্যবহার করছি। বীরশ্রেষ্ঠের সাইকেল চালিয়ে আমার খুব ভালো লাগত। জাদুঘরে হস্তান্তরের কথা ভেবে আরো আনন্দ বোধ করছি। টাকা বিনিময় ছাড়াই সাইকেলটি জাদুঘরে দেয়া হচ্ছে। তবে আমার যোগ্যতা অনুযায়ী (এসএসসি পাশ) নড়াইল ডিসি অফিসে চাকরির আশা করছি। একটা চাকরি পেলে আমাদের সংসারে স্বচ্ছলতা আসবে। বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরের লাইব্রেরিয়ান রজব আলী জানান, এখানে বই ও পত্রিকা পড়ার সুযোগ থাকলেও নূর মোহাম্মদের স্মৃতি বিজড়িত দেখার মতো তেমন কিছু নেই। বাইসাইকেলটি জাদুঘরে রাখা হলে দর্শনার্থীরা তা দেখতে পারবেন।
এদিকে নূর মোহাম্মদ নগরে যাতায়াতের একমাত্র সড়কটি দীর্ঘ দুই বছর ধরে ভেঙে বড় বড় খানাখন্দক সৃষ্টি হওয়ায় সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে দর্শনার্থীসহ এলাকাবাসীর। রোমেনা বেগম ও আফজাল হোসেন জানান, সড়কটির প্রায় চার কিলোমিটার অংশ ভেঙ্গেচুরে ছোট-বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। বেশির ভাগ সড়কে পিচ ও খোয়া উঠে বালি এবং মাটি বেরিয়ে গেছে। দ্রুত সংস্কার করা না হলে বর্ষাকালে এ সড়কে ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি হবে। অপরদিকে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি এমপিওভূক্ত হলেও কলেজটি ১২ বছরেও এমপিওভূক্ত হয়নি। জাতীয়করণের (সরকারি) জন্য ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে। কলেজের একাদশ শ্রেণির হায়াত ও পারমিতা মুখার্জী এবং দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী তরিকুল ও কবিতা খানম বলেন, শিক্ষকেরা আন্তরিক ভাবে পাঠদান করলেও তারা কোনো বেতন পান না। আমাদের খুব খারাপ লাগে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ের প্রভাষক এসএম রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ১২ বছরে কত শিক্ষার্থী এ কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে পাশ করে বেরিয়েছে। লেখাপড়া শেষ করে অনেকে ভালো চাকরি করছে। অথচ আমাদের মতো ননএমপিও শিক্ষক-কর্মচারী বছরের পর বছর মানবেতর জীবনযাপন করছে। কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রণব কান্তি অধিকারী বলেন, কলেজটি দ্রুত জাতীয়করণের জোর দাবি জানচ্ছি। নূর মোহাম্মদ শেখের স্ত্রী ফজিলাতুন নেসা জানান, প্রায় দেড় বছর যাবত বাম চোখে দেখতে পান না তিনি। তাই স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারেন না। এছাড়া নূর মোহাম্মদ শেখের বসতভিটায় নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভের পাশে একটি বিশ্রামাগার নির্মাণের দাবি করেছেন তিনি।
জেলা প্রশাসক হেলাল মাহমুদ শরীফ বলেন, অনুন্নত সড়কের কারণে নূর মোহাম্মদ নগরে যেতে সমস্যা হচ্ছে। আশা করি সড়কটি দ্রুত সংস্কার হবে। এছাড়া কলেজটি জাতীয়করণের জন্য আন্তরিক ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ব্যবহৃত বাইসাইকেলটিও জাদুঘরে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর উপজেলার মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০৮ সালে ‘মহিষখোলা’র নাম পরিবর্তন করে ‘নূর মোহাম্মদ নগর’ করা হয়। এখানে নির্মিত হয়েছে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরসহ স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যশোরের গোয়ালহাটি ও ছুটিপুরে পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শাহাদাতবরণ করেন নূর মোহাম্মদ। যশোরের শার্শা থানার কাশিপুর গ্রামে তাকে সমাহিত করা হয়।