বই আলোচনা> নারী মুক্তির পাঠশালা : নারী জাগরণ মন্ত্রের হাতিয়ার

তহীদ মনি>

নারী মুক্তি ভিন্ন মানব সমাজের উন্নয়ন সম্ভব না। নারী –পুরুষ মিলেই এই সমাজ ব্যবস্থা তাই মিলিত দায়িত্ব নিয়েই রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন ও উন্নয়ন সম্ভব-সম্ভব মুক্তির প্রকৃত পথ আবিষ্কার করা এই দাবি নিয়েই জাহানারা মুক্ত‘র বই ‘নারী মুক্তির পাঠশালা’ । মূলত নারী জাগরণের প্রয়োজনীয়তা, নারীর অধিকার, নারী জাগরণের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা- সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ধর্মীয় গোঁড়ামি, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, পূঁজিবাদ ব্যবস্থায় নারীরর অন্ধত্ব, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অর্জন ও অর্জনের পথে সমস্যা নানাবিধ দিক এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। গবেষণাধর্মী পুস্তকটি একশত নারী শিক্ষকের উপর পরিচালিত জরিপ, তাদেরকে দেয়া প্রশ্নের উত্তরের ভিত্তিতে সংগৃহীত সাক্ষাৎকার মূলক তথ্য নির্ভর । বর্বর পুরুষ তান্ত্রিকতা নয় আবার দাস মানসিকতার নারী নয় মানুষ হিসেবে সবাইকে একই মঞ্চে আসতে হবে, তবেই নারী মুক্তিও সম্ভব।
এই নারী শিক্ষকরা যশোরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেকেই কাজ করেন। অনেকেই অনেক দরিদ্র্য অবস্থায়ও সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে, শ্রেনী শোষণের মধ্যে দিয়েই সংগ্রাম করে বেড়ে উঠেছেন। শোষক-শোষিতের এই চির চরিত প্রতিবন্ধকতায় চলার পথে অজ¯্র বিষাক্ত ছোবল হজম করে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন এবং দিতে সক্ষম হয়েছেন তাদের যোগ্যতার পরিচয়। অনেকেই প্রাণ খুলে সাক্ষাতকার দিয়ে কয়েকদিন পর বিনয়ের সাথে সেই সাক্ষাৎকার প্রত্যাহার করার আবেন জানিয়েছেন, না ছাপানোর জন্য অনুনয় করেছেন সামাজিক ও স্বামী দেবতার নির্যাতনের ভয়ে। আবার অনেক স্কুলের পুরুষ শিক্ষক অনেক ডিগ্রিধারী মানসিক উর্বরতা ও উদারতার অভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে করেছেন হাজতখানা। ফলে সেই সব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষিকারা নির্যাতিতা হন যেভাবে ঘরে ঘরে নির্যাতিতা হন। লেখিকার মতে, এভাবে নারীরা পুরুষের ভোগ্যপণ্যে পরিণত হচ্ছে, শুধু সাটিফিকেট নির্ভর শিক্ষকতা বাড়ছে নারীদের- কিন্তু মানসিক বিকাশ হচ্ছে না। তারা যতটা পুরুষের মনোরঞ্জনের প্রসাধনী নিয়ে এবং বিউটি পার্লারে সময় দিচ্ছে নিজেদের জ্ঞান বিস্তারে বইয়ের সাথে সেই সময় দিচ্ছেন না। ধনী মহিলার্ওা পুরূষতান্ত্রিক আভিজাত্য ধরে রাখতে নি¤œবিত্ত পুরুষ-নারীকেও নির্যাতন করে চলেছে।
বহুদিন ধরে বহু পরিশ্রম স্বীকার করে লেখিকা নানাবিধ গঞ্জনা সহ্য করে এই সব নারীদের উপর গবেষণা করেছেন এবং একই ধরণের প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করেছেন যাতে সমাজে নারীদের অবস্থান, তাদের সমস্যা, সমস্যা সমাধানের পথ দেখানো যেতে পারে। ফলে অনেক সত্যের কাছাকাছি যেয়েও শুধু তাদের নিরাপত্তার কারণে, সামাজিক-রাষ্ট্রীয়-অর্থনৈতিক, গোষ্ঠিগত-জাতিগত সমস্যা ও নির্যাতনের ভয়ে সাক্ষাৎকারদানকারি নারীরা যেমন পিছিয়ে এসেছেন লেখিকাও তেমনি অনেক কিছুই প্রকাশ করতে পারেননি।
লেখিকা শুধু নারীদের সমস্য ও জাগরণের বিষয়ে কথা বলেননি, এই দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়্ওে কথা বলেছেন। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশু যে মানসিক শক্তি হারাচ্ছে, সাহিত্য ও সস্কৃতিচর্চাহীন শিক্ষা ব্যবস্থা বিকালঙ্গ এক ভিন্ন ধরণের সমাজের জন্ম দিচ্ছে সে সম্পর্ক্ওে লেখিকা সতর্ক করেছেন। এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের পথ বলেছেন। ধনতান্ত্রিকতা, অসাম্য সমাজব্যবস্থা, জুলুম ও শোষণের সমাজক্ষেত্র এবং মুক্তির উপায় নিয়েও কথা বলেছেন।
সাক্ষাৎকার গুলো ধীরে ধীরে সাজিয়ে তোলার আগে ‘ভ’মিকার বদলে’ এবং ‘নারী মুক্তির পাঠশালা’ নামক দুটি প্রবন্ধে সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে জমে থাকা অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলেছেন। তার নিজের মত তুলে ধরেছেন সাথে সাথে বিশ্ববিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক সমাজবিদ, রাষ্ট্রনায়কদের বক্তব্য উত্থাপন করে নারীদের তারা কতটুকু মূল্যায়ন করেছেন, কতটা অবহেলা করেছেন সে সম্পর্কে নিজের মত দিয়েছেন। মূলত এই দুটি প্রবন্ধই সমাজ পরিবর্তনের স্বতন্ত্র মলম হিসেবে কাজ করার ক্ষমতা রাখে। বিষয় ভিত্তিক যত যুক্তি তর্ক ও পথ এতে রয়েছে তা আলাদা বইয়ের মর্যাদা পাওয়ার দাবি রাখে। কিন্তু লেখিকা প্রবন্ধ দুটি সংযুক্ত করেছেন এই নারীদের অবস্থা ও অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্যে এবং প্রবন্ধ দুটি সংযোজিত হওয়ায় বইটি আরো শক্তিশালী ও সমৃদ্ধি অর্জন করেছে।
লেখক জাহানার মুক্ত কখনোই পুরুষকে নারীর প্রতিপক্ষ তৈরি করেননি। তিনি বার বার স্বীকার করেছেন নারীদের শিক্ষা ও স্বাতন্ত্রের কথা। নারীদের বুদ্ধির মুক্তি না ঘটলে, ভৃত্য -মনিব সম্পর্কের বাইরে না আসতে পারলে, শোষণ-বঞ্চনার যাঁতাকল থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে, সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন না ঘটলে এই সমাজ নিজেই ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। আর সেই সমস্যা থেকে বাচঁতে নারীকে পুরুষের পাশাপাশি থাকতে হবে, বন্ধু হয়ে সমাজ বিনির্মাণে এক হতে হবে, শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। যোগ্যদের যেমন যোগ্য জায়গায় দিতে হবে তেমনি প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে এসে প্রথিবীর প্রগতিশীল অবস্থার সাথে- বিজ্ঞান ও যোগাযোগ, প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। একই সাথে শিশুকে ব্সযোগ্য পৃথিবী উপহার দিতে হবে যেনো তার মেধা বিকাশের সব পথ খোলা থাকে এবং আগামীতে সেই সকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁিড়য়ে সাম্য ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভ’মিকা রাখতে পারে।
বইটিতে বিভিন্ন দিক বিশেষত নারী মুক্তির বিভিন্ন দিক উত্থাপিত হলেও হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান ধর্মসহ বিভিন্ন ধর্ম নারীকে কোন চোখে দেখেছে তার কিছু উদ্ধৃতি ও সামান্য ব্যখ্যা থাকলে গোঁড়ামির দিকটা ভালোভাবে দৃষ্টিগোচর হতো। লেখিকা বিপ্লবী নারী। তাই তিনি নিজেই ভালোভাবে উপলব্ধি করেছেন নারী মুক্তির পথের বাধাঁ আর মুক্তির প্রয়োজনীয়তা। একশত নারীর সাক্ষাৎকারের মাধ্যমেও তিনি সেই সমস্যারই সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছেন।
চাররঙা প্রচ্ছদ আর ঝকঝকে সাদা কাগজের ১৭৬ পৃষ্ঠার বইটি সব বয়সের নারী জাগরণ মন্ত্রের হাতিয়ার বলে আমার মনে হয়েছে এবং সব বয়সের নারীর সংগ্রহে এই বইটি থাকা দরকার বলেই আমার বিশ্বাস। বইটি শুধু সুখপাঠ্যই নয় তথ্যবহূলও বটে। গবেষণার জন্যে বইটি চিরকাল প্রতিটি লাইব্রেরির সেলফে জায়গা করার দাবিদারও।

বইয়ের নাম- নারী মুক্তির পাঠশালা
লেখক- জাহানার মুক্ত
প্রকাশক- অগ্রদূত এন্ড কোম্পানি, ঢাকা
প্রচ্ছদ- চারু পিন্টু
প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বই মেলা
মূল্য- ৩৫০/- (তিনশত পঞ্চাশ) টাকা মাত্র। উৎসর্গ- দুনিয়া সকল বিপ্লবী নারী।
পরিবেশক- আদর্শ বই, কনকর্ড এম্পোরিয়াম, কাঁটাবন, ঢাকা।

@ Tohid moni