পরিবহন ধর্মঘট অবসানের ইঙ্গিত নেই

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক>সারাদেশে দিনভর জনদুর্ভোগের মধ্যে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পরিবহন শ্রমিকদের আহ্বান জানালেও তাতে কোনো সাড়া দেখা যাচ্ছে না।
ধর্মঘট মঙ্গলবার শেষ হচ্ছে কি না- জানতে চাইলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো উত্তর মিলছে না।

সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলছেন, শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে আছে, ফলে পরিস্থিতির উন্নতির আপাত আশা দেখছেন না তিনি।

শ্রমিক নেতারা ধর্মঘটের কর্মসূচির বিষয়টি সাধারণ শ্রমিকদের বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সহসভাপতি আব্দুল ওদুদ নয়ন বলছেন, শ্রমিকদের মানানো যাচ্ছে না।

অন্যদিকে আদালতের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় এই কর্মসূচি হওয়ায় ধর্মঘটীদের সঙ্গে কোনো আলোচনায় যেতে চাইছে না সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়।

এদিকে মঙ্গলবার সকাল থেকে বাস না পেয়ে চরমদুর্ভোগে রয়েছেন সাধারণ মানুষ। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় সড়ক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ। শ্রমিকরা বিভিন্ন স্থানে যান চলাচলেও বাধা দিচ্ছে।

সড়কে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মৃত্যুর জন্য দায়ী বাসচালককে শাস্তি দিয়ে গত সপ্তাহে মানিকগঞ্জের আদালতে রায়ের পর শ্রমিক বিক্ষোভের শুরু।

বাসচালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর তার জেলা চুয়াডাঙ্গার পরিবহন শ্রমিকরা প্রথম ধর্মঘট শুরু করে। এরপর গত রোববার খুলনা অঞ্চলের ১০ জেলায় ধর্মঘট শুরু করেন পরিবহন শ্রমিকরা।

এর মধ্যেই সোমবার ঢাকার আদালতের এক রায়ে সাভারে সড়কে এক নারীর মৃত্যুর ঘটনায় এক ট্রাকচালককে মৃত্যুদণ্ড দিলে মঙ্গলবার থেকে সারাদেশে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয় শ্রমিকরা।
তার আগে সোমবার রাতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের একটি বৈঠক হয়েছিল ঢাকায়; তারপর থেকে বাস চলাচল বন্ধ হলেও ধর্মঘটের আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে বাস মালিকদের নেতা এনায়েত মঙ্গলবার বিকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শ্রমিকদের কর্মসূচি শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না তিনি।

“এটা পর্যালোচনা করার জন্য শ্রমিক নেতারদের বলেছি বসার জন্য। তবে আমার মনে হচ্ছে না, আজকে কোনো ফয়সালা আসবে।”

কোথায় কারা কারা বসবেন- জানতে চাইলে মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েত বলেন, “আমরা চার-পাঁচজন বসব ঘরোয়াভাবে। তবে আমার মনে হচ্ছে না, আজকে কোনো সমাধানে আসতে পারব।”

বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আবার আলোচনায় বসতে চেয়েছেন তিনি।

আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না জানতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ এন সিদ্দিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের তরফে আলোচনার উদ্যোগের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শ্রমিকরা যেহেতু আদালতের একটি রায়ের বিপক্ষে গিয়ে ধর্মঘট করছে, সেখানে আমাদের কিছুই করার নেই। আমরা এনিয়ে কারও সঙ্গে কোনো কথাও বলব না। কোনো ধরনের যোগাযোগ করছি না।”
কর্মসূচির কী হবে- জানতে যোগাযোগ করা হলে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সহসভাপতি এবং সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল ওদুদ নয়ন বলেন, এ কর্মবিরতি শ্রমিকদের। নেতাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
“তারা আমাদের সঙ্গে আলাপ করে কর্মবিরতি দেয়নি। দুই-দুইটা রায় বিপক্ষে যাওয়ায় শ্রমিকরা সেন্টিমেন্টাল হয়ে গেছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তারা নেতাদের কথাও শুনছে না।”
“আমরা তাদের অনুরোধ করেছি, গাড়ি চালানো শুরু করার জন্য। কিন্তু তারা আমাদের কথা শুনছে না। তারা বলে- ‘আপনারা গাড়ি চালান, আমরা চালাব না’,” বলেন নয়ন।
তবে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলী সুবা বলছেন, মঙ্গলবারই কর্মবিরতির অবসান ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, “উচ্চ পর্যায়ে আলাপ আলোচনা চলছে। যোগাযোগমন্ত্রী-নৌপরিবহনমন্ত্রী মহোদয় আছেন, আমাদের সাধারণ সম্পাদক আছেন, মালিক সমিতির নেতারা আছেন। তারা আলাপ-আলোচনা করছেন। আশা করছি সমাধান হয়ে যাবে।”
নৌমন্ত্রী শাজাহান খান পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরি সভাপতি। ধর্মঘট শুরুর পর তা আদালত অবমানননার পর্যায়ে পড়ে বলে সমালোচনার মধ্যে তিনি বলেছিলেন, শ্রমিকরা ধর্মঘট ডাকতেই পারে।
সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও বলেন, শ্রমিকদের অসন্তোষ থাকলে তারা আদালতে যেতে পারেন, কিন্তু জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা ঠিক নয়।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ধর্মঘটী শ্রমিকদের কঠোরভাবে দমন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে শ্রমিকরা কথা শুনছে না বলে দাবি করেন সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলীও।
“শ্রমিক যদি গাড়ি না চালায় তাইলে আমরা কী করুম। আমরা তো মারপিট করতে পারুম না,” বলেন তিনি।
আদালতের রায়ে ক্ষুব্ধ চট্টগ্রাম-কুড়িগ্রাম রুটের সৌখিন পরিবহনের চালক মাসুদুর রহমান হিরণ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০ বছর ধরে গাড়ি চালাই। রাস্তায় যদি একটা সাপও পড়ে, তার পরও আমরা সেটাকে বাঁচাতে চাই। কিন্তু এভাবে সাজা দিলে আমরা গাড়ি চালাতে পারব না।”
ধর্মঘটের কারণে মঙ্গলবার ঢাকার গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো গাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে না।
এস আলম পরিবহনের ঢাকা অঞ্চলের ইনচার্জ মোহাম্মদ মঞ্জুর মোরশেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকেছে, আমরা অসহায়ের মতো এর সঙ্গে আছি। পক্ষেও নাই, বিপক্ষেও নাই।”
চালকরা রাজি না হওয়ায় সকাল থেকে কোনো গাড়ি চলছে না বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান ইউনিক পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক আবদুল হক।
“আমি কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু কেউ গাড়ি চালাতে রাজি নয়। এ কারণে গাড়ি বন্ধ।”
দেশের বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল বন্ধের পাশাপাশি পণ্যবাহী যান চলাচলও বন্ধ রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।