ছুটছে তামিম-রথ

বিডিনিউজ>অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের আগের রাতে টিম হোটেলের লবিতে চলছিল আড্ডা। উঠল অস্ট্রেলিয়ান বোলিংয়ের প্রসঙ্গ। “মিচেল স্টার্ক কিন্তু প্রথম ওভারেই বিষাক্ত সুইং আর ইয়র্কার মারবেৃ”, একজন সাবধান করে দিতে চাইলেন তামিম ইকবালকে। হাসিমুখে তামিম বললেন, “তো কি? বড়জোর আউট হব, জীবন তো শেষ হবে নাৃ!”

সেই স্টার্কের বলেই আউট হয়েছেন তামিম। তবে প্রথম ওভারে নয়, ৪২ ওভার শেষে। স্টার্কের সেটি চতুর্থ স্পেল। তামিমের নামের পাশে ৯৫ রান!

বলটিও এমন আহামরি কিছু ছিল না। লেগ স্টাম্পে শর্ট বল। এর চেয়েও ভয়ানক সব বল দারুণভাবে সামলেছেন তামিম, করেছেন প্রতি আক্রমণ। এক পায়ে ক্যারিবিয়ান পুল তো বরাবরই দারুণ খেলেন। এই বলেও সেটিই খেলেছিলেন। ব্যাটের কানায় ছুঁয়ে বল উড়ে গেল ফাইন লেগের হাতে।

৫ রানের জন্য সেঞ্চুরি পাননি। টুর্নামেন্টে টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরির কীর্তি হয়নি। কিন্তু ওই যে, ক্রিকেট দর্শনই পাল্টে গেছে তার। জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তামিম জানেন, সুযোগ আবার আসবে।

সুযোগ অবশ্য তিনি নিয়েই যাচ্ছেন। এই ম্যাচে স্রেফ সেঞ্চুরিটাই হয়নি। কিন্তু ম্যাচটি হলো যতটা না অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ, তার চেয়ে বেশি অস্ট্রেলিয়া বনাম তামিম!

চ্যালেঞ্জিং কন্ডিশনে, অস্ট্রেলিয়ার দুর্দান্ত পেস আক্রমণের বিপক্ষে লড়েছেন শৌর্য দিয়ে, খেলেছেন টেকনিক দিয়ে। ৬ চার ও ৩ ছক্কায় করেছেন ৯৫। দলের বাকি সবাই মিলে ৮৭!

আগের ম্যাচেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করেছিলেন ১২৮ রান। সময়টা তার যাচ্ছে অসাধারণ। মৌসুমের শুরুতে যদি ফিরে যাওয়া যায়, আন্তর্জাতিক মৌসুমের প্রথম ম্যাচেই গত সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে করেছিলেন ৮০। ওই সিরিজের শেষ ম্যাচে সেঞ্চুরি।

ইংল্যান্ড সিরিজে ওয়ানডে কাটল সেঞ্চুরিবিহীন। নিউ জিল্যান্ডে কঠিন পরীক্ষায় একটি অর্ধশতক। শ্রীলঙ্কায় গিয়ে প্রথম ওয়ানডেতেই ১২৭। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে দলের মান বাঁচানো অপরাজিত ৬৪। শেষ ম্যাচে দলকে জেতানো ৬৫। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগে প্রস্তুতি ম্যাচে সেঞ্চুরি। মূল টুর্নামেন্টে অন্যতম ফেবারিট দুই দলের বিপক্ষে অসাধারণ দুটি ইনিংস।

‘অসাধারণ’ শব্দটি শোনা গেল সাকিব আল হাসানের কণ্ঠেও। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে অনেকটা সময় উইকেটের আরেকপাশ থেকে দেখেছেন তামিমের ব্যাটিং। দেখে আসছেন মাঠের ভেতরে বাইরে থেকে। তামিমের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ সাকিব।

“অসাধারণ ব্যাট করছে তামিম। শুধু এ ম্যাচে নয়, দুই ম্যাচেই। বেশ কিছুদিন থেকেই ও আমাদের দলের সবচেয়ে ধারাবাহিক পারফরমার।”

তামিমকে এই চেহারায় দেখতে পারা মাশরাফি বিন মুর্তজার জন্য একটি ব্যক্তিগত তৃপ্তির ব্যাপারও। তামিমের ক্যারিয়ারে খুব বাজে সময় এমনিতে তেমন আসেনি। তবে একটু-আধটু যা খারপ সময় এসেছে, সমালোচকদের প্রিয় লক্ষবস্তু ছিলেন তামিম। সেই সময়ে মাশরাফি ক্রমাগত পাশে থেকেছেন তামিমের। সমর্থন দিয়ে গেছেন। উৎসাহ দিয়ে গেছেন। ভরসা জুগিয়েছেন। তামিমকে এমন ফর্মে দেখে তাই উচ্ছ্বসিত মাশরাফি।

“পরপর দুটি ম্যাচে বিশ্বের সেরা দুটি দলের বিপক্ষে ও যে ব্যাটিং করেছে, এটাই বলে দিচ্ছে ও কেমন ফর্মে আছে। শুধু এখানেই নয়, শেষ কয়েকটি ইনিংসেই। শ্রীলঙ্কায় সেঞ্চুরি করে এসেছে, আয়ারল্যান্ডে ভালো করেছে, এখানে প্রস্তুতি ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছে, এরপর টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি করেই ফেলেছিল।”

“আমার কাছে মনে হয়, বিশ্বমানের ব্যাটসম্যানরা ফর্মে থাকলে যেমন খেলে, ও ঠিক সেভাবেই ব্যাট করছে। ফর্ম বলতে এটিকেই বোঝায়। ফর্মে আছে, সেটিকে দারুণভাবে কাজে লাগাচ্ছে।”

ক্যারিয়ার জুড়ে তামিমের ব্যাটিংয়ের ধরনটাও ছিল তুমুল আলোচিত, অনেকের কাটাছেড়ার প্রিয় উপকরণ। তামিমের ব্যাটিংয়ের ধরনটাও বাড়তি তৃপ্তি দিচ্ছে মাশরাফিকে।

“ব্যাটিংয়ের ধরনটাও যদি দেখেন, এক পাশে উইকেট পড়ছে, সে ডাউন দা উইকেটে এসে বোলারদের চার-ছয় মারছে। যে একাগ্রতা, প্রগাঢ়তা নিয়ে ব্যাটিং করেছে, ওর ভেতরের বোধটাই অন্যান্য ব্যাটসম্যানের চেয়ে আলাদা।”

ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে একটি কথা সবসময়ই বলা হয়, ফর্মে থাকলে সেটি সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে। ছন্দে থাকতেই রানের স্রোত বইয়ে দিতে। ফর্ম যে প্রায় হয়ে ওঠে মরীচিকা!

সাকিব তাই দারুণ খুশি যে তামিম ফর্মটা কাজে লাগাচ্ছেন, রানের স্তুপ গড়ে তুলছেন। এই রানের পাহাড়ে তামিমকে আরও উঁচুতে দেখতে চান সাকিব।

“আশা করি, পরের ম্যাচটিও এভাবে ভালো করবে। কারণ যেহেতু ভালো সময় যাচ্ছে, আমি চাইব যতদিন পারে, যত বেশি দিন পারে, ভালো সময়টা যেন টেনে নেয়। আর আমরা যারা বাইরে আছি, তারাও যেন অবদান রাখতে পারি, যেন দল ভালো করে।”

এটিই এখনকার তামিম। শুধু একজন রান মেশিনই নন, সতীর্থদের জন্য উদাহরণ, সাকিবের মতো বিশ্বসেরা একজনের কাছেও অনুপ্রেরণা!