ফিলিপিন্সের মারাউয়িতে জঙ্গিদের ‘দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি’

নিউজ ডেস্ক, বিডিনিউজ >
দুই সপ্তাহ আগে ফিলিপিন্সের শহর মারাউয়ির একটি অংশ দখল নেওয়া ইসলামী জঙ্গিরা শহরটির মসজিদগুলোতে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও খাবার মজুদ করছে, বানাচ্ছে টানেল।

দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রয়টার্স বলছে, আইএস সংশ্লিষ্ট মাউতি জঙ্গিরা ওই শহরে দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসনাইলন হাপিলন নামের এক ব্যক্তিকে গত বছর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আইএস এর ‘আমির’ ঘোষণা করা হলে তাকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপিন্স সরকার।

এই জঙ্গি নেতাকে ধরতে মারাউয়িতে ফিলিপিন্সের সেনাবাহিনীর একটি ব্যর্থ অভিযানের পর গত ২৩ মে শহরটি দখল করে নেয় হাপিলনের অনুসারীরা। তখন থেকেই ইসলামী ওই জঙ্গি দল দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সেনা কর্মকর্তাদের ধারণা।

ওই ঘটনার পর থেকে শহরটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকারি বাহিনী। দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে অন্তত ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ শহরটি থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।

প্রেসিডেন্টের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, মারাউয়িতে এ পর্যন্ত ১২০ জন জঙ্গি এবং সেনাবাহিনীর ৩৮ সদস্য নিহত হয়েছে। বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যেও ২০ থেকে ৩৮ জন নিহত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফিলিপিন্সের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক খ্রিস্টান হলেও মারাউয়ি মুসলিমপ্রধান এলাকা। শহরটির নানা অংশে এখনও জঙ্গিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর লড়াই চলছে।

রয়টার্সের প্রতিনিধি শহরটির উপর দিয়ে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার উড়ে যেতে দেখেছেন; বিভিন্ন জায়গা থেকে শোনা যাচ্ছে মেশিনগানের গুলির শব্দ; ধোঁয়া উড়ছে বিভিন্ন এলাকায়।

আইএস সংশ্লিষ্ট জঙ্গিরা মারাউয়ি দখলে নেওয়ার পর তারা ফিলিপিন্সের দক্ষিণ সীমান্তের মিন্দানাও দ্বীপে আঞ্চলিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মিন্দানাও য়ের মাদকচক্রগুলো মাউতি জঙ্গিদের অর্থায়ন করছে বলে এর আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তেও অভিযোগ করেছিলেন।

মাদকের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ চালিয়ে আসা দুতের্তে শনিবার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিন দিনের মধ্যে মারাউয়িকে জঙ্গিমুক্ত করা হবে।

কিন্তু সোমবার সেনাবাহিনীর সদস্যরা বলেছেন, এত সহজে সেখান থেকে জঙ্গিদের তাড়ানো সম্ভব হবে না।

তাদের ধারণা, এখনো ওই শহরে ৪০ থেকে ২০০ জঙ্গি অবস্থান করছে। ফিলিপিন্স ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত, সৌদি আরব, চেচনিয়া ও মরক্কো থেকে আসা জিহাদিরাও তাদের মধ্যে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফিলিপিনো সেনাবাহিনীর পশ্চিম মিন্দানাও অংশের কমান্ডার মেজর জেনারেল কারলিতো গালভেজ বলেন, “সেখানে এমন ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও বেইজমেন্ট আছে, যা ৫০০ পাউন্ডের বোমা মেরেও ধ্বংস করা যাবে না।”

জঙ্গিরা সেখানে দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে খাদ্য ও অস্ত্রের মজুদ তৈরি করেছে বলে এই সেনা কর্মকর্তার ধারণা।

“মাউতিরা যদি দুই মাসও যুদ্ধ করে, তবুও তারা খাদ্য সঙ্কটে পড়বে না,” বলেন জেনারেল গালভেজ।

সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীর আরেক কর্মকর্তাও মারাউয়ি উদ্ধারের জটিলতাগুলো তুলে ধরেন।

“নানা ধরনের জটিলতা আছে, যেমন তারা ধারাবাহিকভাবে সাধারণ নাগরিকদের ব্যবহার করছে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিম্মি এখনও তাদের হাতে। ধর্মীয় স্থাপনাগুলো তারা যেভাবে ব্যবহার করছে… শহরের ভৌগোলিক অবস্থাও যুদ্ধের জন্য বেশ জটিল,” বলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেসতিতুতো পাদিলা।

তিনি জানান, শহরটির মাত্র ১০ শতাংশ জঙ্গিদের দখলে থাকলেও ধর্মীয় স্থাপনা ব্যবহারসহ তাদের নানা কৌশলের কারণে প্রেসিডেন্টের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে মারাউয়ি দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না।

শহরে আটকা পড়া নাগরিকদের জন্য রোববার চার ঘণ্টা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করেছিল সরকারি বাহিনী; কিন্তু তারপরও পাঁচ থেকে ছয়শ নাগরিক ভেতরে রয়ে গেছে।

পাদিলা বলেন, সব মিলিয়ে শহরটি থেকে প্রায় ১৫ শ নাগরিককে তারা উদ্ধার করতে পেরেছেন। বাকি যারা আটকে আছেন, তাদের খাদ্য, পানীয়সহ অন্যান্য রসদের পরিমাণও কমে আসছে।

“শত্রু এলাকার ভেতরেও এমন কিছু এলাকা আছে, যেগুলোকে আমরা প্যাসেজওয়ে হিসেবে ব্যবহার করতে পারছি। কিন্তু যখন সেখানে যাচ্ছি, এমন অনেক দুর্বল বৃদ্ধ লোককে পাচ্ছি, খাদ্যের অভাবে যারা এখন নিজেরা চলাচল করতে পারছেন না।”

মারাউয়িতে সেনা অভিযান শুরুর পরপরই কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়ে শহরটিতে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন দুতের্তে।

সোমবার বিরোধী দলের ছয় সদস্য ওই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন জারি করেছেন।