প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত আঠারোবাকি নদী পুনঃখননে তিন জেলার মানুষের মুখে হাসি

ফরহাদ খান, প্রকল্প অঞ্চল থেকে ফিরে >
প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত আঠারোবাকি নদী পুনঃখননে হাসি ফুটেছে তিন জেলার লাখো মানুষের মুখে। দীর্ঘ ৩০ বছর পর প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে আঠারোবাকি নদীর প্রায় ৫৭ কিলোমিটার নৌপথ। এছাড়া নদী সংলগ্ন ৩৩টি খালের ৮৯ কিলোমিটার অংশ পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। নিরসন হচ্ছে নড়াইল, বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলের ৪৩ হাজার হেক্টর জমির জলাবদ্ধতা। নিষ্কাশিত হবে ১৩টি বিলের পানিও। এছাড়া আঠারোবাকি নদীর দুই পাড়ে সামাজিক বনায়নসহ তৈরি হচ্ছে রাস্তা। নদী অভ্যন্তরে ৩২ কিলোমিটার অংশে সৃষ্টি করা হয়েছে মিঠাপানির জলাধার। আঠারোবাকি পুনঃখননের মধ্য দিয়ে নদী অভ্যন্তরীণ এবং আশেপাশের জীববৈচিত্র্য সজীব হয়ে উঠেছে। মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষিবিপ্লবসহ আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫৫ ভাগ নদী পুনঃখনন এবং খাল খননের ৮০ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) নড়াইল ও খুলনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারি আঠারোবাকি নদী পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করা হয়। এর মধ্যে ৪২ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার পুনঃখনন এবং সাত কিলোমিটার অংশে ড্রেজিং করা হচ্ছে। স্থান ভেদে প্রায় ১৩ থেকে ২২ ফুট গভীরতায় পুনঃখনন করা হচ্ছে আঠারোবাকি নদী। আর তলদেশের প্রস্থতা সর্বোচ্চ ১৫০ ফুট ও সর্বনিম্ন ৪৫ ফুট এবং উপরি ভাগের প্রস্থতা সর্বনিম্ন ৭৫ ফুট থেকে সর্বোচ্চ ২৮৫ ফুট পর্যন্ত। এদিকে নদীর বাকি আট কিলোমিটারে নাব্য থাকায় পুনঃখনন বা ড্রেজিং করা হচ্ছে না। নদীর মোট দৈর্ঘ্য ৫৭ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার। একটি স্লুইসগেট নির্মাণসহ আঠারোবাকি নদী পুনঃখনন কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১শ’ ২৫ কোটি ৪০ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে নদী পুনঃখননে ১শ’ ১৮ কোটি ৪০ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং আট ভেল্ট স্লুইসগেট নির্মাণে ৭ কোটি টাকা। ‘খুলনা জেলার ভূতিয়ার বিল এবং বর্ণাল-সলিমপুর-কোলাবাসুখালী বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন (২য় পর্যায়) প্রকল্প’ এর আওতায় আঠারোবাকি নদী পুনঃখনন চলছে। কাজটি বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী পরিচালিত বাংলাদেশ ডিজেল প্লান্ট (বিডিপি) লিমিটেড এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পের অধীনে আঠারোবাকি নদী পুনঃখননসহ ১০টি কাজ রয়েছে। এই ১০টি কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২শ’ ৮১ কোটি ৯০ লাখ ১৬ হাজার টাকা। প্রকল্পটি ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর একনেকে অনুমোদন পায়। এর আগে ২০১১ সালের ৫ মার্চ খুলনা সফরকালে প্রধানমন্ত্রী এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন, আঠারোবাকি নদী পুনঃখননসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের প্রতিশ্রুতি দেন। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ২০১৮ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও এরই মধ্যে নদী ও খাল পুনঃখননের সুফল পেতে শুরু করেছেন নড়াইল, বাগেরহাট ও খুলনা জেলার লাখ লাখ মানুষ। বদলে গেছে নদীবর্তী এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পাখিমারা গ্রামের বয়োবৃদ্ধ ফুলমিয়া বলেন, এ নদী অনেক ডাঙ্গর (বড়) ছিল। স্টিমার পর্যন্ত চলত। স্বাধীনতার পর নদী আস্তে আস্তে ভরাট হয়ে যায়। এখন নদী কাটায় আমাদের অনেক উপকার হয়েছে। পুরোদমে নদী কাটা শেষ হলে কৃষি জমির জলাবদ্ধতা দূর হবে। চরবল্লাহাটি গ্রামের নূর ইসলাম খান বলেন, এই নদী মরে সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। সেই সমতল ভূমি কেটে ‘আঠারোবাকি’ নদীকে যৌবনা করা হচ্ছে। এই নদী পুনঃখননের মধ্য দিয়ে এলাকার জীবনযাত্রা বদলে যাচ্ছে। নদীর পানি দিয়ে কৃষকেরা শুষ্ক মওসুমে ধান, পাট, পানের বরজসহ অন্যান্য ফসল আবাদ করছেন। বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার চুনখোলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৫নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মিরাজ শরীফ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই উন্নয়ন প্রকল্পে এলাকার মানুষের ভাগ্য বদলেছে। আঠারোবাকি নদী খননের মধ্য দিয়ে নড়াইল, বাগেরহাট ও খুলনা জেলার লাখ লাখ মানুষের উপকৃত হয়েছেন। জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি নোনা পানি থেকে ফসলি জমিগুলো রক্ষা পাবে। চুনখোলা গ্রামের হেনা বেগম বলেন, নদীর স্বচ্ছ পানি দিয়ে রান্নার কাজ, গোসলসহ গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে ব্যবহার করছি। অথচ আগে পানির জন্য অনেক কষ্ট করতে হতো। খুলনার তেরখাদা উপজেলার ছাগলাদহ ইউপি চেয়ারম্যান এসএম দীন ইসলাম বলেন, আঠারোবাকি নদী ও খাল পুনঃখননের ফলে ভূতিয়ার বিলের জলাবদ্ধতা নিরসন হচ্ছে। এতে এ অঞ্চলের চাষাবাদ বাড়বে। কৃষকের ’গোলা’ ধানে ভরে উঠবে। ইতোমধ্যে কৃষকেরা সুফল পেয়েছেন। নদী পুনঃখনন কাজে নিয়োজিত স্কেভেটর চালক আনোয়ার হোসেন জানান, আটটি স্কেভেটর মেশিন দিয়ে আঠারোবাকি নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে। আশা করছি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে। এ লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলেছে। নড়াইল প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি সুলতান মাহমুদ বলেন, দিনে দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। সেখানে আঠারোবাকি নদী পুনঃখনন করে প্রাণবন্ত করা আমাদের জন্য সুখবরই বটে। তবে, পরিবেশ রক্ষাসহ নাব্যতা ধরে রাখার জন্য নদীর বুকে বাঁশের পাঁটাতন, বাঁধ দেয়া ও শিল্প কারখানার বর্জ্য নিষ্কাশন বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপের পাশাপাশি সকলকে সচেতন থাকতে হবে।
বাপাউবো খুলনার তেরখাদা অঞ্চলের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) পলাশ কুমার ব্যাণার্জী জানান, আঠারোবাকি নদী পুনঃখনন কাজের মাটি দিয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় নির্দিষ্ট দুরত্ব বজায় রেখে নদীর পাশে রাস্তা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া নদীর দুইপাড়ে সামাজিক বনায়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বনবিভাগকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এলাকার জনসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে আঠারোবাকি নদীর বিভিন্ন স্থানে ব্রিজ করার জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকেও চিঠি দেয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাপাউবো, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জরিপ পরিচালনা করে এসএ রেকর্ড অনুযায়ী খাস জমিতে আঠারোবাকি নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে। এ কাজের জন্য মোল্লাহাট উপজেলার গাংনীবাজার এলাকায় চারতলা বসতবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি অবৈধ স্থাপনাও উচ্ছেদ করতে হয়েছে। কাটতে হয়েছে ফসলি জমিও।
বাপাউবো খুলনা বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শরীফুল ইসলাম বলেন, আঠারোবাকি নদীটি নড়াইলের নড়াগাতি থানার চাপাইল সেতু এলাকার মধুমতি নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে খুলনা জেলার জেলখানাঘাট নামক স্থানে রূপসা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। আঠারোবাকি নদীর প্রায় ৩২ কিলোমিটার অংশে মিঠাপানির জলাধার থাকছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে নড়াইল এবং খুলনা জেলার ভূতিয়ার বিল, পদ্ম বিল, বাসুখালী বিল, কোলা বিল, কেটলা বিল, সলিমপুর বিল, কালিয়া বিল এবং আশেপাশের অন্যান্য বিলের পানি নিস্কাশনের ফলে জলাবদ্ধতা দুর হবে। এছাড়া বসতবাড়িতে ব্যবহার, কৃষি সেচ সুবিধা, টিআরএম এর মাধ্যমে নদীর নাব্যতা বজায় রাখা এবং বিলের জমি উঁচুকরণ, সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ থেকে প্রকল্প এলাকাকে রক্ষা করা, কৃষি উৎপাদন ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ড গতিশীল করা। ইতোমধ্যে নদী পুনঃখননকৃত এলাকার জনসাধারণ সুফল পেতে শুরু করেছেন বলে মন্তব্য করেন প্রকৌশলী শরীফুল ইসলাম। এদিকে, প্রায় দুই বছর আগে চিত্রা ও আঠারোবাকি নদীর সংযোগস্থল থেকে পাটনা পর্যন্ত ২৯ দশমিক ১৫০ কিলোমিটার চিত্রা নদীও পুনঃখনন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) সূত্রে আরো জানা যায়, খুলনার রূপসা নদী থেকে পলিযুক্ত পানি আঠারোবাকি নদী হয়ে চিত্রা নদীর মাধ্যমে ইছামতি খাল দিয়ে খুলনার তেরখাদা উপজেলার ছাগলাদহ ইউনিয়নের কোদলার বিলের ৯০ হেক্টর জমিতে এবং একই উপজেলার সাথিয়াদহ ইউনিয়নের মসুনদিয়া বিলের ৫২০ হেক্টর জমিতে পলিমাটি প্রবেশ করবে। এ বিল দু’টিতে টিআরএম (নিচু স্থানে পলি জমা করে মাটির স্তর উচু করা) কার্যক্রম পরিচালিত হবে। টিআরএম এর ফলে চিত্রা নদীর পলিবাহিত পানি বিলে ঢুকে পলি পড়ে বিল উঁচু হলে জলাবদ্ধতা দূর হবে। এছাড়া বিলের স্বচ্ছ পানি ভাটার সময় বের হয়ে আঠারোবাকি ও চিত্রা নদীর মাধ্যমে রূপসা নদীতে গিয়ে পড়বে। এতে নদীর নাব্যতা বজায় থাকবে। কালিয়া ও তেরখাদার বিভিন্ন বিলেও পর্যায়ক্রমে টিআরএম পরিচালনা করে বিলসমূহের জলাবদ্ধতা দুর করে চাষ উপযোগী করা হবে।
খুলনা জেলার ভূতিয়ার বিল এবং বর্ণাল-সলিমপুর-কোলাবাসুখালী বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন (২য় পর্যায়) প্রকল্পের প্রধান কাজগুলো হলো-আঠারোবাকি ও চিত্রা নদী পুনঃখনন, কোদলা ও মসুনদিয়া বিলে টিআরএম পরিচালনা, টিআরএম পরিচালনা জন্য শস্য ক্ষতিপূরণ, নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নবগঙ্গা ও মধুুমতি নদী এলাকায় ৩ হাজার ১১২ কিলোমিটার স্থায়ী তীর সংরক্ষণ। এছাড়া খুলনার তেরখাদার কোদলা ও মসুনদিয়া বিলে ১৩ দশমিক ৩৬৫ কিলোমিটার পেরিফেরিয়াল বাঁধ নির্মাণ এবং নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পেরিফেরিয়াল বাঁধ এলাকায় দু’টি বেইলি ব্রিজ নির্মাণ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। নড়াইলের কালিয়ার পাটনা, চাপাইল ও ভোগবাগ এলাকায় রেগুলেটরসহ ছয়টি স্লুইসগেট নির্মাণ। অপরদিকে কালিয়াসহ তেরখাদা, দিঘলিয়া ও রূপসা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩৩টি অভ্যন্তরীণ নিষ্কাশন খাল পুনঃখনন এবং নয়টি স্লুইসগেট ও রেগুলেটর মেরামত। এই ১০টি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২শ’ ৮১ কোটি ৯০ লাখ ১৬ হাজার টাকা। প্রকল্পের পুরো কাজ ২০১৮ সালের জুনে শেষ বলে আশা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।