ভাবমূর্তি সংকটে যশোরের পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক>
ভাবমুর্তি সঙ্কটে রয়েছে যশোরের পুলিশ। নানান বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও নিজেদের ভিতরের দ্বন্দ্বে প্রকাশ হয়ে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা এ বাহিনীর মধ্যেকার বিশৃঙ্খলাও। দায়ি পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েও এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না কর্মকর্তারা। অসাধু পুলিশ সদস্যরা সাদা পোশাকে অপকর্ম করেই চলেছে। এ দিকে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহিনতায় সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। তাতে পুলিশের জনরোষে আক্রান্ত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। গতকালও এক পুলিশ সদস্য পিটুনির শিকার হয়েছেন যশোর সদরের সাতমাইল বাজারে।
যশোর শহরে ছিনতাই নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের যে সন্তুষ্টি অর্জন করেছিল যশোরের পুলিশ তা বিলিন হয়ে গেছে। ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা হারিয়ে গেলেও ভোগান্তি কমেনি সাধারণ মানুষের। কেন না পুলিশ নিজেই জড়িয়ে পড়েছে সেই কাজে। পকেটে অথবা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে মাদক দ্রব্য ঢুকিয়ে দিয়ে হাজার হাজার, কখনও লক্ষাধিক টাকা আদায় করে নেয়া হচ্ছে। তাদের চাঁদাবাজি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে তারা নিজেরা নিজেদের। আবার পুলিশ সদস্যদের এ অসৎ কর্মকাণ্ডে থানায় বা তাদের সংশ্লিষ্ট কোথাও যেয়ে অভিযোগ করার সুযোগ নেই সাধারণ মানুষের। তাহলে প্রতিহিংসার শিকার হতে হয় পুলিশের। তাই পুলিশ জনরোষের শিকার হচ্ছে বর্তমানে। বিক্ষুব্ধ মানুষ এভাবে অসৎ পুলিশকে প্রতিরোধের চেষ্টা করছে।
সাধারণ মানুষের সাথে দূরত্ব তৈরি হলেও অপরাধীদের সাথে যশোর পুলিশের সখ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন মহল্লায়, বিপনিবিতান অথবা রেস্তোরায় সাদা পোশাকে কোমরে অস্ত্র ঝুলিয়ে আড্ডা দিতে দেখা যায় পুলিশকে। শহরের মধ্যের অপরাধ প্রবণ এলাকার ফাঁড়িগুলোতে পুলিশের সাথে অপরাধীদের ওঠবসা বেশি। যে কারণে সেখানে কোন অভিযোগ জানাতে ভয় পায় মানুষ। অনেক ক্ষেত্রে ফাঁড়িগুলো ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে থানা থেকে। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায় অনেক পুলিশ সদস্য রয়েছেন যারা যুগেরও অধিককাল ধরে যশোরে অবস্থান করছেন। কেউ কেউ যশোরে বাড়ি গাড়িও করে নিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে বেশি।
এছাড়া সম্প্রতি পুলিশ যে মাদক বিরোধী অভিযান শুরু করেছে তাও অসাধুৃ পুলিশ সদস্যদের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে। বিভিন্ন পুলিশ সোর্সরাও এ সুযোগে মাদক ব্যবয়ায়ে জড়িয়ে পড়েছে। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা ধরা পড়ছেনা। আবার যাকে তাকে মাদক ব্যবসায়ী বা অন্য কোন অভিযোগ করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে থানায় বা অন্য কোথাও। এরপর মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে।
চৌগাছায় এরকম দুইটি ঘটনা ঘটে। পুলিশ মাদক দিয়ে এক চা দোকানি এবং এক ব্যবসায়ীকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে। দুইটি ঘটনার সাথে জড়িত ৪ কর্মকর্তাকে ক্লোজড হতে হয়েছে।
গত ১৮ মে প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলনে শার্শার অগ্রভুলট গ্রামের নাসিমা খাতুন অভিযোগ করেন তার স্বামী হাতেম আলীকে বাড়ি থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে। পরে হাতেম ফিরে আসলে আবারও তাকে তুলে নেওয়া হয়।
গত ২৮ এপ্রিল প্রেসক্লাব যশোর মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে কেশবপুর উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়ন মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) মনোয়ারা বেগম অভিযোগ করেন, গত ১৯ এপ্রিল কেশবপুর থানার ওসি শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে তার ছেলে আশরাফুল ইসলামকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতনে পঙ্গু করা হয়েছে। পরে পুলিশ প্রচার করে বন্দুকযুদ্ধে আশরাফুল আহত হয়েছেন। তিনটি মিথ্যা মামলায় তাকে ফাঁসানো হয়েছে।
২০১৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর কেশবপুরের জাহানপুর বাজারে মুদি ব্যবসায়ী আবদুল লতিফকে ইয়াবা বড়ি দিয়ে ফাঁসাতে গিয়ে জনরোষে পড়ে কেশবপুর থানার উপ-পরির্দশক মিজানুর রহমান ও দুই কনস্টেবল। পরে তাদেরকে ক্লোজড করা হয়।
সর্বশেষ যশোরে বাড়ি তল্লাশি ও ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে ৫ লক্ষাধিক টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাড়ি তল্লাশির নামে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা লুট করার পর যুবক আহসান হাবিব সুজনকে আটক করে পুলিশ। এরপর তাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে আরও ১লাখ ৯০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। গত ৬ জুন রাতে যশোর সদর উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের আজমতপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার বিচার চেয়ে তিনি গত ১১জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ মহাপরিদর্শক, ডিআইজি, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এদিকে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহিনতায় সুযোগ নিচ্ছে প্রকৃত অপরাধীরা। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, শহরের মাইক পট্টির শৈশব ও তার সহযোগীরা ওই এলাকার মাদক ব্যবসায়ী। তার ইয়াবা ট্যাবলেট কেনাবেচা করে থাকে। ঘটনার সময় তারা মাদক বহন করছিলনা এটা সত্য। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ আছে।
সূত্রটি জানিয়েছে, মাস দুইয়েক আগে শহরের মাইকপট্টি এলাকার দৈনিক লোকসমাজ অফিসের সামনে থেকে শৈশব এবং সুব্রতকে আটক করেছিলেন সাবেক এসআই আমির হোসেন। তাদের কাছে বেশ কয়েক পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ছিল। কিন্তু তারা ইয়াবা ট্যাবলেট রাস্তায় ছুড়ে ফেলে। সে সময় তাদের আটক করে গাড়িতে উঠানোর সময় কৌশল নেয় শৈশব ও সুব্রত। তারা চিৎকার চেঁচামেচি করে লোকজন জড়ো করে এবং তার পকেটে ইয়াবা ট্যাবলেট ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে বলে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। সে সময় স্থানীয় লোকজন এবং কয়েকজন সাংবাদিক উপস্থিত থেকে ঘটনার সুরাহ করেন। এবং এসআই আমির হোসেনকে আটক না করার অনুরোধ করেন। সেই যাত্রাই শৈশব পুলিশের হাতে আটক হওয়া থেকে রক্ষা পান। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটালো ১০ জুন রাতে। এদিন শহরের রেল রোড়ে সোনালী ব্যাংকের কর্পোরেট শাখার সামনে সাদা পোশাকে এসআই মাহবুব শৈশব ও সঙ্গী সুব্রতকে তাদের কাছে ইয়াবা থাকার অভিযোগে আটক করতে যান। তখন তারা চিৎকারে করে আশেপাশের মানুষ জড়ো করে অভিযোগ করে পুলিশ তাদের পকেটে গাঁজা ঢুকিয়ে দিয়েছে। জনগণ তাদের কথা বিশ্বাস করে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে ফেলে। পরে থানা থেকে কয়েকজন কর্মকর্তা গিয়ে তাকে জনরোষ থেকে উদ্ধার করেন।
সূত্রমতে, শৈশব, সুব্রতসহ ওই এলাকার একটি গ্রুপ মাদক কেনাবেচার সাথে যুক্ত। পুলিশ তাদের আটকের জন্য চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা ওই কৌশল নিয়ে আটকের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে।
পুলিশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেছেন, পুলিশের কোন সদস্য গুরুতর অপরাধ করলে তাদের ছাড় দেয়া হচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পুলিশ শৃঙ্খলা নিয়ে চলবে। নিয়মের বাইরে যদি কেউ কাজ করে তাহলে তাকে জবাব দিতে হবে।
এই বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) শহিদ আবু সরোয়ার বলেছেন, আমার জানমতে যশোরে কোন থানায় সাদা পোশাকের পুলিশ নেই। আর পুলিশ যদি দয়িত্ব পালন না করে যদি অনৈতিকতার আশ্রয় নেয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতোমধ্যে কয়েক পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
একই মন্তব্য করেছেন কোতয়ালি থানার ওসি একেএম আজমল হুদা।