চুড়ামনকাটিতে আওয়াল ও তার ক্যাডাররা বেপরোয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক>
যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি উইনয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মুন্নার ছেলে আওয়াল ও তার ক্যাডাররা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করতে যাকে তাকে মারপিট করছে। তাদের হামলা থেকে বাদ পড়ছে না শিক্ষকও। দোকান ভাঙচুর, টাকা ছিনিয়ে নেয়াসহ তারা ফ্রিস্টাইলে বিভিন্ন অপরাধ করছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। কিন্তু তারা প্রাণের ভয়ে মামলা করার সাহস পাচ্ছেন না। কেননা হামলার শিকার উজ্জল নামে এক যুবক ওই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করে হুমকির মুখে ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে চেয়ারম্যান মুন্না তার ছেলে আওয়ালসহ অন্য ক্যাডারদের অপরাধ কর্মকাণ্ডের মদদ দিচ্ছেন। পুলিশ বলছে, আওয়াল ও তার ক্যাডারদের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঝাউদিয়া গ্রামের রবিউল ইসলামের ছেলে নাসিম জানায়, ঝাউদিয়া বাজারে তার মুরগির দোকান আছে। ২৯ জুন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সে মুরগির টাকা পরিশোধ করার জন্য ৩৬ হাজার টাকা নিয়ে চুড়ামনকাটি বাজারে পাইকার ব্যবসায়ীর কাছে আসছিলো। পথিমধ্যে ছাতিয়ানতলা পশ্চিমপাড়ার বিল পাড়ে পৌঁছালে পূর্বশত্র“তার জের ধরে আওয়াল ও তার ক্যাডার হিমেল, আশিক, রমেল, আল আমিন, পায়েল, ইয়াসিনসহ আরো কয়েকজন তার উপর হামলা চালায়। নাসিম আরো জানায়, এসময় ওই ইয়াবা ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীরা তাকে পাশের একটি কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে হাতুড়িপেটায় জখম করে। এসময় তার কাছ থেকে ৩৬ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়া হয়। পরে পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। এ ঘটনায় মামলা করা হবে বলে আহতের স্বজনেরা জানান। নাসিম আরো জানায়, তাকে হাতুড়িপেটা ও টাকা ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনাটি ভিন্নখাতে নিতে আওয়ালের পিতা চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মুন্না মিথ্যাচার করেছেন। প্রচার করা হচ্ছে নাসিম ইউনিয়ন পরিষদের সামনে থেকে জনতার হাতে ধরা পড়ে। বলা হচ্ছে জিজ্ঞাসাবাদে আমি নাকি চেয়ারম্যান মুন্নাকে খুন করার পরিকল্পনা ফাঁস করে দিয়েছে। নাসিম দাবি করেছে ঘটনা ভিন্নখাতে নিয়ে উল্টো তাকে ফাঁসানোর জন্য চেয়ারম্যান মিথ্যাচারে লিপ্ত রয়েছেন। কেননা বিলপাড় থেকে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা অনেকেই দেখেছেন। ওই দিন সে কখনোই ইউনিয়ন পরিষদের সামনে যায়নি। বাদিয়াটোলা গ্রামের আব্দুল আজিজ সরদারের ছেলে উজ্জল জানান, গত ১৬ জুন তাকে চুড়ামনকাটি বাজার থেকে ইউনিয়ন পরিষদের পাশে ধরে নিয়ে যায় আওয়ালসহ তার ক্যাডাররা। যশোর সদর আসনের এমপি কাজী নাবির আহমেদকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর কারণে ওই সন্ত্রাসীরা তার উপর ক্ষুব্ধ হয়। সন্ত্রাসীরা তাকে লোহার রড ও হাতুড়িপেটায় জখম করে ওই ঘটনার জের ধরে। মারপিটের সময় তার কাছ থেকে নগদ ৭৫ হাজার টাকা সোনার চেন ও আঙটি কেড়ে নেয়। পড়ে তাকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় ১৭ জুন উজ্জল বাদী হয়ে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। তারা হলো ছাতিয়ানতলা গ্রামের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মুন্নার ছেলে আওয়াল, হুমায়ুন ওরফে হুমার ছেলে হিমেল, আইয়ুব হোসেনের ছেলে রমেল ও ঝাউদিয়া গ্রামের মোশারফের ছেলে জাকির। উজ্জল জানায় করেন থানায় অভিযোগ করার পর আওয়াল ও তার ক্যাডাররা তার উপর আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এর আগে ১৪ জুন ওই সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয় চুড়ামনকাটি গ্রামের কাশেমের ছেলে রুহুল আমিন, মশিয়ার রহমানের ছেলে প্রতীক, হেলালের ভাগ্নে ইব্রাহিম ও দাসপাড়ার সুফল দাস। প্রাণভয়ে ভুক্তভোগীরা কেউ তাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করার সাহস পায়নি। গত ১০ জুন ঢালাই মেশিন বহনকারী নাসিমন চালক যশোর শহরের কাজীপাড়ার কবির নামে এক যুবককে বেধড়ক মারপিট করে আওয়াল ও তার ক্যাডাররা। এ সময় তার কাছ থেকে শ্রমিকদের মজুরির ৩০ হাজার টাকা কেড়ে নেয়া হয়। কবির হোসেন জানান, সড়ক দুর্ঘটনার অজুহাত দিয়ে ওই সন্ত্রাসীরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। পরে ঠিকাদার তালেব হোসেন ঘটনাস্থলে এসে আরো ৫ হাজার টাকার বিনিময় আহত কবিরকে মুক্ত করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। চুড়ামনকাটি বাজারের বাসিন্দা আতিয়ার রহমান বিশ্বাসের ছেলে পিকুল জানান, পুলিশি তদন্ত শুনানির আগেই গত ১ জুন বৃহস্পতিবার তাদের ৭ শতক জমি অবৈধ দখল করতে আসে চেয়ারম্যানের ক্যাডাররা। এ সময় তাদের বাধা দেয়ায় চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মুন্নার ছেলে আওয়ালসহ অন্যরা হামলা চালিয়ে তার (পিকুল) দোকান ঘর ভাঙচুর করে। এ সময় তার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। এ ঘটনায় পিকুলের পিতা আতিয়ার রহমান যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় জিডি করেন। স্থানীদের সূত্রে জানা গেছে, অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে কয়েক মাস আগে আওয়াল ও তার লোকজন ছাতিয়ানতলা চুড়ামনকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাসির উদ্দিনকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করে। খবর শুনে আওয়ালের পিতা ওই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মুন্না ঘটনাস্থলে যান। পরে শিক্ষকদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে তিনি বিষয়টি নিষ্পত্তি করে দেন। শিক্ষক নাসির উদ্দিন সম্পর্কে তার আত্মীয় হওয়ায় তিনিও বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করেননি। এছাড়া আওয়ালের হামলার শিকার হয় চুড়মনকাটি বাজারের সেলুনকর্মী (নরসুন্দর) দাস পাড়ার দিপংকর কুমার দাস। ছাতিয়ানতলা গ্রামের পশ্চিমপাড়ার আলমগীর হোসেন ওরফে আলমের চুড়ামনকাটি রেলস্টেশন রোডস্থ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি ২/৩ বার ভাঙচুর করে লুটপাট চালানো হয়েছে। ভুক্তভোগী আলম জানান, তিনি ভয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আব্দুল মান্নান মুন্না চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তার ছেলে আওয়ালের নেতৃত্বে একটি চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাছাড়া আওয়াল নিজেই চুড়ামনকাটি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছে। যে কারণে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে পিছ পা হচ্ছে না সে ও তার ক্যাডাররা। তাদের রোষানল থেকে বাদ পড়ছেন না আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরাও। ফলে চুড়ামনকাটিতে আওয়ামী লীগ দু’ভাগে বিভক্ত। তাই আওয়াল একক আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর ছেলের সকল অপরাধের মদদ দিচ্ছেন তার পিতা চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মুন্না। সূত্র জানায়, আওয়াল ও তার ক্যাডাররা সাধারণ মানুষের উপর হামলা,ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ করলেও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের অত্যাচার নির্যাতন নীরবে সহ্য করছেন। এ ব্যাপারে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কেএম আজমল হুদা জানান, আওয়াল ও তার ক্যাডারদের বিরুদ্ধে কেউ লিখিত অভিযোগ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হলে চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মুন্না দৈনিক স্পন্দনকে জানান, আমি মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বারবরই সোচ্চার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছি। এতে করে ঝাউদিয়া গ্রামের সন্ত্রাসী মোস্ত, গোজিলা গ্রামের শরিফুল বাহিনীর প্রধান শরিফুলের ভাই এনামুল ও চুড়ামনকাটি গ্রামের সন্ত্রাসী রুনুসহ ৮/১০ জন আমার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। ইউনিয়নের শান্তি প্রিয় মানুষ অপরাধীদের ধরে মারপিট করছে। যাতে করে কেউ অন্যায় কাজ করতে সাহস না পায়। এ জন্য ওই সন্ত্রাসীরা বেকায়দায় পড়ে আমিও আমার ছেলের উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে। আমার ছেলে কোনো প্রকার অপরাধের সাথে জড়িত না।