৫ জঙ্গির খোঁজে আটকে গুলশান হামলার তদন্ত

বিডিনিউজ>
সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েও গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে নজিরবিহীন জঙ্গি হামলার তদন্ত গত এক বছরে শেষ করতে পারেনি পুলিশ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, নির্ভুল অভিযোগপত্র দেওয়ার চেষ্টায় তাদের দেরি হচ্ছে। তবে কবে সেই অভিযোগপত্র আদালতে যাবে, সে বিষয়ে কোনো আভাস দিতে পারেননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা পাঁচ জঙ্গির মধ্যে দুই-তিনজনকে ধরতে পারলেও অজানা অনেক কিছু তাদের সামনে স্পষ্ট হবে।
কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলছেন, হামলায় যারা সরাসরি অংশ নিয়েছিল তাদের কেউ বেঁচে নেই। হামলা সংঘটনে নানাভাবে ভূমিকা রাখা আটজন এই এক বছরে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছেন।
পুলিশের হাতে গ্রেফতার রয়েছে চারজন। আর ওই হামলায় কোনো না কোনোভাবে জড়িত অন্তত পাঁচজনের খোঁজ চলছে।
হামলার বর্ষপূর্তির কয়েকদিন আগে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল বলেন, “আমরা এখনও পাঁচজনকে খুঁজছি, তাদের নাম তদন্তে এসেছে। এই পাঁচজনের দুয়েকজনকে গ্রেফতার করতে পারলেও এই মামলার তদন্ত আমরা শেষ করব।”
এই পাঁচ জঙ্গির মধ্যে সোহেল মাহফুজ, রাশেদুল ইসলাম ও বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে তিনি বলেন, “তাদের পেলে হয়ত আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাব।”
বিদেশিদের কাছে আকর্ষণীয় গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে গত বছর ১ জুলাই রাতে হামলা করে পাঁচ জঙ্গি। তাদের রুখতে গিয়ে বোমা হামলায় নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা।
উৎকণ্ঠার রাত পেরিয়ে সকালে সেখানে কমান্ডো অভিযানে হামলাকারী পাঁচ তরুণ ও ক্যাফের এক পাচক নিহত হন। ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনের লাশ।
ইরাক-সিরিয়ায় জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের উত্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশ্ববাসীর কাছে গুলশানের ওই হামলা বড় ঘটনা হিসেবে দেখা দেয়। দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে আলোচিত এই হামলার পর জঙ্গিবাদ নিয়ে নড়চড়ে বসে বাংলাদেশ সরকার।
আইএস ওই দায় স্বীকার করে বার্তা দিলেও বাংলাদেশ সরকার বরাবরই বলে এসেছে, এটা দেশীয় জঙ্গিদের কাজ।
২০০৫ সালে সারা দেশে বোমা হামলা চালিয়ে আলোচনায় আসা নিষিদ্ধ জঙ্গি দল জেএমবিরই নতুন একটি অংশ (নব্য জেএমবি) গুলশান হামলায় অংশ নেয় বলে দাবি করা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে।
হামলার দুদিন পর সন্ত্রাস দমন আইনে যে মামলা পুলিশ দায়ের করে, সেখানে নিহত জঙ্গিদের পাশাপাশি ‘অনেককে’ আসামি করা হয়।
মনিরুল বলেন, “হলি আর্টিজানে যে হামলা হয় এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টুইন টাওয়ার হামলার মত। যেভাবে টুইন টাওয়ার হামলা আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, হলি আর্টিজান হামলাও আমাদের দেশের জন একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। একসঙ্গে এতজন বিদেশি এর আগে বাংলাদেশের কোথাও মারা যায়নি।”
সেই জায়গা থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে নেমে এই এক বছরে অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান জঙ্গি দমনে গঠিত বিশেষায়িত এই ইউনিটের প্রধান মনিরুল।
তিনি বলেন, “এই মামলার সাথে যারা জড়িত ছিল, যারা ঘটনাস্থলে সরাসরি গিয়েছিল, তারা কেউ জীবিত নাই, তারা ওখানেই মারা গেছে। এর বাইরে এই ঘটনার সঙ্গে পরিকল্পনা, তারপরে সহযোগিতা, নানাভাবে ভূমিকা রেখেছে- এমন অনেককে আমরা চিহ্নিত করেছি।
“গত এক বছরে আমরা যেসব অভিযান চালিয়েছি, তাতে হলি আর্টিজান হামলায় জড়িত অন্তত আটজন নিহত হয়েছে, যারা বেঁচে থাকলে গুলশান মামলার আসামি হত।”
এখন কারাগারে থাকা চারজনের মধ্যে তিনজনই হামলায় সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানান তিনি।
কমান্ডো অভিযানে নিহত ছয়জনের মধ্যে নিবরাজ ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওই হামলায় অংশ নিয়েছিল বলে পুলিশের ভাষ্য।
এরপর বিভিন্ন অভিযানে নিহত তামিম চৌধুরী, জাহিদুল ইসলাম, তানভীর কাদেরী, নুরুল ইসলাম মারজান, আবু রায়হান তারেক, সারোয়ার জাহান, আব্দুল্লাহ মোতালেব ও ফরিদুল ইসলাম আকাশ ওই হামলায় কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত ছিল বলে জানান মনিরুল।
গ্রেফতার চারজনের মধ্যে মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে ‘রাজীব গান্ধী’ ও রাকিবুল হাসান রিগান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
আর সেই রাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হালি আর্টিজানে আটকে থাকা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজাউল করিমও কারাগারে আছেন।
হলি আর্টিজানের ছাদে দুই হামলাকারীর সঙ্গে ব্যবসায়ীপুত্র তাহমিদ হাসিব খানের অস্ত্র হাতের ছবি ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়ায় তাকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে পুলিশ হামলার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার ‘প্রমাণ না পাওয়ায়’ আদালতের নির্দেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
আদালত পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা এসআই ফরিদ মিয়া জানিয়েছেন, হলি আর্টিজান মামলার অভিযোগপত্র জমার তারিখ এর আগে সাতবার পিছিয়েছে। এ মামলার পরবর্তী তারিখ রয়েছে ১৬ জুলাই।
তদন্তে যা জানা গেছে
তদন্ত শুরুর কয়েক মাসের মধ্যে গুলশান হামলার ছক নিয়ে একটি মোটামুটি ধারণা পান তদন্তকারীরা। তার সঙ্গে আরও কিছু গোয়েন্দা তথ্য মিলিয়ে জানতে পারেন, ওই হামলার পরিকল্পনা হয় গতবছর এপ্রিলের শেষ দিকে।
মনিরুল বলেন, “পরিকল্পনা হয়, তারা ঢাকায় বড় ধরনের একটা কিছু করবে, যাতে তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া কাভারেজ পাবে, পাশাপাশি বাংলাদেশে যে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে সেটি তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হবে।”
এই লক্ষ্যে ঢাকায় বড় ধরনের ঘটনা ঘটানোর জন্য ঢাকার ছেলেদের কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয় জঙ্গিরা।
“যাদের ঢাকা শহর সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে, সে রকম তিনজকে তারা বাছাই করে। এদের ক্রিমিনাল হিস্ট্রি একটি-দুটি করে ছিল। কিন্তু এরা একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিষ্ঠুরতা ধরে রাখতে পারবে কি না, কিলিংয়ের মানসিকতা ধরে রাখতে পারবে কি না, সেজন্য শুধু তাদের উপর নির্ভর না করে তারা অনেকগুলো খুনের সঙ্গে জড়িত মানে বড় ধরনের ক্রিমিনাল, এই রকম আরও দুইজনকে বাছাই করে। তারা ছিল রুরাল ব্যাকগ্রাউন্ডের।”
তদন্তকারীরা বলছেন, শহুরে তিন তরুণ নিবরাজ, মোবাশ্বের ও রোহান এবং গ্রামের খায়রুল ও শফিকুল এই পাঁচজনকে নিয়ে গড়া হয় ঘাতকের দল। এরপর গাইবান্ধার চরে ২৮ দিন বিশেষ প্রশিক্ষণে দিয়ে তাদের ঢাকায় এনে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ভাড়া বাসায় রাখা হয়।
জঙ্গিদের ওই প্রশিক্ষণে নব্য জেএমবির জঙ্গি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলাম মূল ভূমিকা রাখেন বলে মনিরুলের ভাষ্য। গতবছর ২ সেপ্টেম্বর ঢাকার রূপনগরে পুলিশি অভিযানে নিহত হন জাহিদ।
টার্গেট ছিল গুলশান-বারিধারা
মনিরুল বলেন, প্রশিক্ষণের পর জঙ্গিদের ঢাকায় আনা হয়েছিল গুলশান-বারিধারায় হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে। পরে তারা টার্গেট বাছাই করতে থাকে। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয়, হলি আর্টিজান বেকারিতেই বেশি সংখ্যায় বিদেশিকে পাওয়া যাবে। শুক্রবার পরিস্থিতি আরও অনুকূলে থাকবে। তাছাড়া ওই ক্যাফের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলতে তেমন কিছু ছিল না। সব মিলিয়ে উপযুক্ত টার্গেট হিসাবে হলি আর্টিজানকেই চূড়ান্ত করে তারা।
সিসি ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণে জঙ্গিদের বসুন্ধরার বাসা থেকে প্রথমে রিকশায় এবং পরে হেঁটে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান মনিরুল।
হামলা চলাকালে জঙ্গিরা ‘ভিক্টিমদের’ মোবাইল নিয়ে ছবি তুলেছিল জানিয়ে মনিরুল বলেন, “ছবিগুলো তারা তামিম চৌধুরী ও নুরুল ইসলাম মারজানের কাছে পাঠিয়েছিল। তারা তখন ছিল শেওড়াপাড়ার একটি বাসায়। তামিম ও মারজান পরে কাকে, কোথায় সেসব ছবি পাঠিয়েছে সেটা আমরা জানতে পারিনি। তাদের জীবিত ধরতে পারলে হয়ত সেসব জানা যেত।”
হাসনাত করিম ‘সাসপেক্টেড’
হলি আর্টিজান বেকারি থেকে উদ্ধার হওয়া ১৩ জনের মধ্যে ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজাউল করিম ও তার স্ত্রী-সন্তানরা।
হামলার সময়ে ধারণ করা কিছু ভিডিওতে হাসনাতের গতিবিধি গোয়েন্দাদের সন্দেহের উদ্রেক ঘটায়। হামলায় অংশ নেওয়া নিবরাজ ইসলাম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ায় সেই সন্দেহ আরও জোরালো হয়।
হাসনাতকে প্রথমে সন্দেহভাজন হিসেবে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হলেও পরে হলি আর্টিজানের মামলায় তাকে আসামি করা হয়। হামলায় তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য পুলিশ এখনও দিতে পারেনি। তবে হাসনাতের মুক্তিও মেলেনি।
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, “হাসনাত করিম এখনো এই মামলার সাসপেক্টেড আসামি। তদন্ত শেষে তার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে আমরা জানাব।
দেশের বাইরে থাকা জঙ্গিদের কেউ গুলশান হামলায় জড়িত ছিল কি না এমন প্রশ্নে মনিরুল বলেন, “এই মামলার যারা মূল আসামি, মূল মাস্টারমাইন্ড যারা ছিল- তামিম চৌধুরী, মেজর জাহিদ কিংবা তানভির কাদেরী, নুরুল ইসলাম মারজান- এরা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসামি। এদের জীবিত ধরা গেলে হয়ত জানা যেত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই টেররিস্ট অর্গানাইজেশনের কারও সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল কি-না।
“আনফরচুনেটলি তাদেরকে জীবিত ধরা যায়নি। সে কারণে ওই লিংকটা এখনো পর্যন্ত আমরা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারব না। তবে যে তিনজন গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গির নাম বলেছি, তাদের গ্রেফতার করতে পারলে আমরা টোটাল পিকচারের জন্য যতটুকু বাকি আছে, সেটাও পেয়ে যাব বলে আশা করা যায়।”