ফরহাদ মজহার হাসপাতালে

বিডিনিউজ >
নাটকীয়ভাবে যশোরে ‘উদ্ধার’ ফরহাদ মজহার ঢাকার আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার পর একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ঢাকার মহানগর হাকিম আহসান হাবীব মঙ্গলবার বিকালে তার খাস কামরায় ১৬৪ ধারায় ফরহাদ মজহারের বিচারিক জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
পরে ১০ হাজার টাকার মুচলেকায় স্বাক্ষর নিয়ে তাকে নিজের জিম্মায় বাড়ি ফেরার অনুমতি দেন বিচারক। তাকে নিয়ে আদালত প্রাঙ্গণ ছাড়েন স্ত্রী ফরিদা আখতার ও মেয়ে সম্তলী হক।
ফরহাদ মজহার অন্তর্ধাণের তদন্তে যুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা, ডিএমপির উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার সন্ধ্যায় বলেন, তাকে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে তিনি জেনেছেন।
রাতে ফরহাদ মজহারের পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তাকে হাসপাতালে ভর্তির কথা জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, “আদালত থেকে ফরহাদ মজহারকে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়বেটিস ও হৃদরোগে ভুগছিলেন। চোখ বাঁধা অবস্থায় গত দুই দিনের বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মানসিকভাবেও তিনি ভীষণ বিপর্যস্ত।”
সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত চিকিৎসকরা তাকে কথা বলতে নিষেধ করেছেন বলেও ফরিদা আখতার ও তার মেয়ে সম্তলী হকের পক্ষে পাঠানো ওই বিবৃতিতে বলা হয়।
রাত ৮টায় যোগাযোগ করা হলে বারডেম হাসপাতালে কর্তব্যরত এক চিকিৎসা কর্মকর্তা বলেন, “ডায়েবেটিসসহ মাল্টিপল সমস্যা নিয়ে তিনি ভর্তি হয়েছেন। তিনি কেবিনে আছেন।”
এর আগে দুপুরে পুলিশ ফরহাদ মজহারকে আদালতে হাজির করার পর তাকে নিজের জিম্মায় যাওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া, যিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষেও মামলা লড়েন।
ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতার, মেয়ে সম্তলী হক, ভাগ্নে মেজর ফেরদৌসসহ কয়েকজন পারিবারিক বন্ধু এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
শুনানিতে সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, “ফরহাদ মজহারের মামলার বিষয় আমরা কিছুই জানি না। জবানবন্দিতে কী বলেছেন তাও জানি না। আপনি কি দয়া করে আমাদের জানাবেন?”
উত্তরে বিচারক বলেন, “এটা ৩৮৫ এবং ৩৬৫ ধারার মামলা; অর্থাৎ অপহরণ ও চাঁদাবাজি সংক্রান্ত অপরাধ। ফরহাদ মজহার জবানবন্দিতে আমার কাছে কী বলেছেন, তা আপনাকে আমি বলতে পারি না। সে বিষয়ে পুলিশ ব্রিফ করবে।”
এরপর বিচারক আদালতে উপস্থিত ফরহাদ মজহারকে প্রশ্ন করেন, “আপনি কি নিজের জিম্মায় যেতে ইচ্ছুক?”
উত্তরে ফরহাদ মজহার বলেন, “জি, আমি ইচ্ছুক।”
পাঁচ মিনিটের শুনানি শেষে মুচলেকায় সই করে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হন ডানপন্থি অধিকার কর্মী হিসেবে পরিচিত এই কবি, প্রাবন্ধিক, যিনি সোমবার ভোরে অপহৃত হন বলে এ মামলার অভিযোগ।
আদালতের আদেশের পর ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আক্তার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “এখন তাকে আমাদের আইনজীবী জিম্মায় পেয়েছে। আমরা এখন বাসায় যাচ্ছি।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “উনার শরীর সাংঘাতিক খারাপ। উনাকে আজকে ফুল রেস্ট দিতে হবে। আমরা নিজেরাও ভীষণ ক্লান্ত। সারাদিন কেউ খাওয়া দাওয়া করিনি। আজ উনার বিশ্রাম দরকার। আজকে কোনো কথা বলতে পারব না।”
মামলা
গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতারের অভিযোগের ভিত্তিতে সোমবার রাতে আদাবর থানা পুলিশ ওই মামলা নথিভুক্ত করে।
মামলায় বলা হয়, “আমার স্বামী সাধারণত খুব ভোরে ঘুম থেকে জাগেন এবং লেখালেখি করেন। সকাল ৫টার দিকে আমার ঘুম ভাঙার পর আমি উনাকে লেখার টেবিলে না দেখতে পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি এবং সারা ঘরে খুঁজতে থাকি। ইতোমধ্যে সকাল ৫ টা ২৯ মিনিটে আমার স্বামী তার ফোন থেকে আমাকে কল দেন। তিনি ভয়ার্ত কণ্ঠে বলেন, ‘ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে, মেরে ফেলবে’। এরপর ফোনটি কেটে যায়।”
বিষয়টি মৌখিকভাবে আদাবর থানায় জানানোর পর পুলিশ তাকে উদ্ধারে তৎপর হয়। পুলিশের উপস্থিতিতেই সারা দিনে ফরহাদ মজহারের ফোন থেকে আরও চার বার কল আসে।
মামলায় লেখা হয়েছে, সেসব ফোনালাপে ফরহাদ মজহার তার স্ত্রীকে জানান, অপহরণকারীরা ৩৫ লাখ টাকা চেয়েছে। ওই টাকা পেলে তারা তাকে ছেড়ে দেবে।
অবশ্য মামলা হওয়ার আগেই পুলিশ অনুসন্ধানে নেমে মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে ফরহাদ মজহারের অবস্থান শনাক্ত করে এবং খুলনা শহরে অভিযান শুরু করে।
এরপর রাত সাড়ে ১১টার দিকে যশোরের নওয়াপাড়ায় ঢাকাগামী একটি বাসে ফরহাদ মজহারকে পাওয়ার কথা জানায় র‌্যাব।

যশোর থেকে প্রথমে খুলনায় নিয়ে ফরহাদ মজহারকে ঢাকার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর মঙ্গলবার সকালে তাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকার আদাবর থানায়। সেখানে থেকে নেওয়া হয় মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে।
দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে এসে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, “ফরহাদ মজহার জানিয়েছেন, সোমবার ভোরে ওষুধ কেনার জন্য তিনি বাসা থেকে বের হলে কয়েকজন একটি মাইক্রোবাসে করে তাকে তুলে নিয়ে যায়।
“এরপর উনি নিজের মোবাইল ফোন থেকে স্ত্রীকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, ৩৫ লাখ টাকা দিলে উনাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। আমরা এখন জানার চেষ্টা করছি কারা উনাকে নিয়ে গিয়েছিল।”
সাংবাদকিরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করলে এই যুগ্ম কমিশনার বলেন, “আমরা এখনও তদন্ত করছি। আমাদের তদন্ত করার জন্য সময় দেন।”
পুলিশের সন্দেহ
সোমবার সকালে পরিবারের কাছ থেকে মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার পর আদাবর থানার এসআই মহসিন আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, ফরহাদ মজহার ‘কোনো একজনের ফোন পেয়ে’ ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে যান বলে তার একজন আত্মীয় থানায় জানিয়েছেন।
আদাবর থানা থেকে তিনশ গজ দূরে ফরহাদ মজহারের বাসার দারোয়ান মো. আলি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরডটকমকে বলেছিলেন, তিনি ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে হেঁটে ছোট ফটক দিয়ে বেরিয়ে সড়কে উঠতে দেখেছেন ফরহাদ মজহারকে। তাকে কেউ উঠিয়ে নিয়ে গেছে, এমন কোনো দৃশ্য তার চোখে পড়েনি।
আর পুলিশের আরেক কর্মকর্তা বলেছিলেন, শ্যামলী রিং রোড হক গ্যারেজের মোড় থেকে শ্যামলীর দিকে যেতে একটি হাসপাতাল রয়েছে। ওই হাসপাতালের সামনে ওই সময় একটি মাইক্রোবাস ছিল। পরে সেটি আর দেখা যায়নি।
অনুসন্ধানে যুক্ত থাকা পুলিশ কর্মকর্তা ডিএমপির উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার সোমবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ফরহাদ মজহার যে আইফোনটি সচরাচর ব্যবহার করেন সোমবার ভোরে বের হওয়ার সময় তা সঙ্গে নেননি।
“তিনি গ্রামীণ নম্বরের যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন এবং যে নম্বরটি সবার কাছে আছে সেটি বের হননি। এটি আইফোন। যে নম্বরটি রবির এবং সাধারণ একটি সেটের, সেটা নিয়ে তিনি বের হয়েছেন। এই নম্বরটি সবার কাছে নেই।”
ওই নম্বর ট্র্যাক করেই ফরহাদ মজহার খুলনা এলাকায় আছেন বলে সন্ধ্যার দিকে নিশ্চিত হন পুলিশ কর্মকর্তারা। এর ওপর ভিত্তি করেই শুরু হয় তল্লাশি। মধ্যরাতে তাকে যশোরে বাস থেকে উদ্ধারের খবর আসে।

উদ্ধারের তিন ঘণ্টা আগে ফরহাদ মজহার খুলনা নিউ মার্কেটের সামনে ‘নিউ গ্রীল হাউস’ নামের এক রেস্তোরাঁয় খাওয়া দাওয়া করেন বলে দাবি করেন ওই খাবার দোকানের মালিক আব্দুল মান্নান। পরে টিভিতে ছবি দেখে চিনতে পেরে তিনি র‌্যাবকে খবর দেন।
মান্নান সাংবাদিকদের বলেন,“আমার হোটেলে ভাত, ডাল ও সবজি খেয়ে রাত ৮টার দিকে বের হয়ে যান তিনি। তার পরনে লুঙ্গি ও মাথায় সাদা কাপড় ছিল। তাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল।”
ফরহাদ মজহার যে টিকেটে ওই বাসে উঠেছিলেন, সেখানে যাত্রীর নামের জায়গায় ‘গফুর’ লেখা ছিল বলে যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমানের ভাষ্য।
ফরহাদ মজহারকে যশোরে বাস থেকে উদ্ধার করার পর রাতে ফুলতলা থানায় এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের উপ মহাপরিদর্শক দিদার আহম্মেদ বলেন, “একজন সুস্থ মানুষ যেভাবে জার্নি করে, সেভাবেই তিনি ছিলেন। তার সঙ্গে একটি ব্যাগ ছিল, গেঞ্জি ছিল। কিছু টাকাও ছিল। এমনকি মোবাইল চার্জার নিতেও ভোলেননি তিনি।”
র‌্যাব অপহরণেরে কোনো ইঙ্গিত পায়নি জানিয়ে তিনি বলেন, “মনে হয় না এটা অপহরণ।”