সুইস ব্যাংকে পাচার নয়, লেনদেন: মুহিত

বিডিনিউজ>সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদে ‘অতিশয়োক্তি’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
তিনি বলেছেন, “টাকা পাচারের বিষয়টি বাস্তবে মোটেই তেমন কিছু নয়। কিছু টাকা পাচার হয়, তা অতি সামান্য। এটা লেনদেন ও সম্পদের হিসাব। সাংবাদিকেরা অত্যন্ত অন্যায়ভাবে পাচার বলেছেন।”
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা টাকার পরিমাণ এক বছরে ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য প্রকাশের পর তা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই বিবৃতি দেন মুহিত।
ওই তথ্য নিয়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদের শিরোনাম হয় যে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়েছে। ক্ষমতাসীনদের মদদে অর্থ পাচার হয়েছে বলেও দাবি করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
সংসদে বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সংবাদ মাধ্যমে টাকা পাচারের কাহিনী ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, ২০১৬ সালের শেষে বাংলাদেশিদের পাচার করা অর্থের পরিমাণ সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে ৬৯৪ মিলিয়ন ডলার ১৫ সেন্টে উন্নীত হয়েছে। ২০১৫ সালে তা ছিল ৫৮২ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার।”
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ বেড়ে ৬৬ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে ৫৫০০ কোটি টাকার বেশি।
মুহিত বলেন, “বিদেশে অর্থ যে পাচার হয় না সে কথা আমি বলব না। কিন্তু এইসব সংবাদ মাধ্যমে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে বলে বলা হয়েছে সেটা বাস্তবেই অতিশয়োক্তি বলে বিবেচনা করা বলা চলে।”

তিনি বলেন, “আপনারা জানেন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য মোটামুটিভাবে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে হয়ে থাকে। সুইজারল্যান্ডেও আমাদের যথেষ্ট লেনদেন আছে, ব্যবসা-বাণিজ্য আছে।

“সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেক উন্নত। ফলে নিকটস্থ অন্যান্য দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব নিষ্পত্তি সুইচ ব্যাংকের মাধ্যমেও হয়ে থাকে।”

সুইস ব্যাংকের প্রতিবেদন প্রকাশের পর এর গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্স ইন্টেলিজেন্স ইউনিট তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে একটি প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে বলে জানান মুহিত।

মুহিত বলেন, “২০১৩–১৪ এবং ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে সম্পূর্ণ প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে আমরা দেখেছি, সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে অনেক লেনদেন হয়েছে।”

বিবৃতিতে বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যে ব্যাংক লেনদেনের তথ্য তুলে ধরা হয়।

“বাংলাদেশের খাতে সুইস ব্যাংকগুলোর সম্পদের পরিমাণ হচ্ছে ১৮২৩ কোটি টাকা। এই সময়ে তাদের দেনা হচ্ছে ৫৫৬০ কোটি টাকা। সুইস ফ্রাঙ্কের বিনিময় হার হল ৮৪ টাকায় ১ সুইস ফ্রাঙ্ক। এতে দেখা যায় যে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে সুইস ব্যাংকের যে দেনা ছিল সেটা এই বছরের দেনার চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম।

“একইভাবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের খাতে যে সম্পদ ছিল তার থেকে ২০১৬ সালে ২ শতাংশ কমে গেছে। আমাদের ব্যাংকগুলোর ২০১৬ সালের হিসাব বিশেষ করে দেনার ক্ষেত্রে এখনও পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি।”

মুহিত বলেন, “আমাদের এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোর মধ্যে দেনা-পাওনার পরিমাণ খুব বেশি। এতে অবশ্য ব্যক্তির আমানত অথবা দেনা মোট আমানত ও দেনার হিসাবে অতি সীমিত একটি অনুপাত। ৩৯৯ দশমিক ৮ কোটি টাকা আমানতের ব্যক্তিখাতে দেনা হল মোট দেনার ৭ শতাংশ। আর সম্পদের ক্ষেত্রে ব্যক্তির খাতে মোট সম্পদ ১৮২৩ কোটি টাকার মধ্যে ১৮৩ কোটি টাকা অর্থাৎ ১০ শতাংশ।”

“বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, আমাদের এবং সুইজারল্যান্ডের মধ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে যে ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব হয়, সেটি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাস্তবে এটি মোটেই অর্থ পাচার নয়। এই ব্যাখ্যাটি আমাদের অনেক ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটাবে বলে আমার বিশ্বাস,” বলেন মুহিত।

পাশাপাশি যেসব বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করছেন অথবা স্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন, তাদের হিসাবও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “এতে প্রতিভাত হবে যে টাকা পাচারের বিষয়টি বাস্তবে তেমন বৃহৎ কিছু নয়।”

এদিকে ঢাকায় সুইজারল্যান্ডের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টিয়ান ফশ বলেছেন, ব্যক্তির নয়, প্রাতিষ্ঠানিক খাতের অবদানে তার দেশের ব্যাংকে বিদেশিদের অর্থ সঞ্চয়ন বেড়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতে তিনি একথা বলেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।