মুনাফার লোভে মাছে ভেজাল নয়: প্রধানমন্ত্রী

বিডিনিউজ >
মুনাফার লোভে মাছে রাসায়নিক বা ভেজাল মিশিয়ে নিজের ও দেশের ক্ষতি না করতে মাছ উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের এখানে মুনাফার লোভে কিছু কিছু মানুষের ভেজাল দেওয়ার একটা প্রবণতা আছে। দরকারটা কী? এই ভেজাল দিয়ে বেশি মুনাফা করতে গিয়ে একেবারে নিজের ব্যবসারও সর্বনাশ, দেশেরও সর্বনাশ। এই সর্বনাশের পথে যেন কেউ না যায়।
“আমি অনুরোধই করব সামান্য একটু মুনাফার লোভে নিজের ব্যবসাটাও নষ্ট করবেন না, আর দেশের রপ্তানি বা দেশের পণ্যটাও নষ্ট করবেন না।”
রপ্তানির সময় ‘কোনমতেই কোনরকম’ অভিযোগ যেন না আসে সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান সরকারপ্রধান। সেই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ক্রমশ বড় হওয়ায় সেই চাহিদা মেটাতেও ভেজালের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদের বিচিত্র একটা অভিজ্ঞতা আছে। ১৯৯৬ সালে যখন ক্ষমতায় আসি, তখন আমি দেখলাম, চিংড়ি রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি নেবে না। কেন? চিংড়ি মাছের ভেতর লোহা ঢুকিয়ে দিয়ে ওজন বৃদ্ধি করে সেটা রপ্তানি করতে গেছে এবং এটা তখনই ধরা পড়ে গেছে। সাথে সাথে কিন্তু রপ্তানি বন্ধ।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি তখন ‘সবে’ সরকারে এলেও দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে রপ্তানি শুরুর ব্যবস্থা করেন।
মাছে ফরমালিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “একসময় ফরমালিন সম্পর্কে সবাই খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। আমরা কিন্তু ইতোমধ্যে ফরমালিনের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করেছি। ফরমালিন যাতে ব্যবহার না হয়, তার ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
শেখ হাসিনা বলেন, সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে গবেষণা উৎসাহিত করায় দেশে বিভিন্ন জাতের মাছের চাষ ও উৎপাদন বাড়ছে।
বর্তমানে বছরে প্রায় ৪০ লাখ মেট্ট্রিক টন মাছ উৎপাদন হচ্ছে দেশে; এক কোটি ৮২ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা এখন মৎস্য সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত।
জিডিপিতে মৎস্যসম্পদের অবদান প্রায় ৪ শতাংশ। আর দেশে প্রাণিজ আমিষের ৬০ ভাগের যোগান আসে মৎস্য খাত থেকে। মিঠা পানির মৎস্য আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ।
হাওড় অঞ্চলে মাছ চাষ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্যার কারণে সেখানে প্রায়ই ফসল নষ্ট হয়। এ কারণে সেখানে মাছ চাষে বেশি জোর দিতে হবে। হাওড়ের ভেতরে খালগুলো ড্রেজিং করতে হবে।
কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা ও সিলেট বিভাগের হাওড়গুলোর পাশাপাশি উত্তবঙ্গের বিল ও জলাশয়গুলোতে মাছ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে রপ্তানি বাড়াতে জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।
এ জন্য সাভার, চট্টগ্রাম ও খুলনায় তিনটি আধুনিক মাননিয়ন্ত্রণ ল্যাব স্থাপন করার কথা জানিয়ে তিনি সিলেট ও উত্তরবঙ্গে আরও দুটি ল্যাব স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, “কোনটার বাজার চাহিদা বেশি, সেটার ওপর নির্ভর করে গবেষণা করা, উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং প্রক্রিয়াজাত করে সেটা রপ্তানি করাৃ আসলে বাংলাদেশের মাটি সোনার মাটি। যা কিছু আমরা চেষ্টা করলেই কিন্তু উৎপাদন করতে পারি।”
তিনি বলেন, তার সরকার মুক্ত জলাশয়ে পোনা অবমুক্ত করা, জলমহালে সমাজভিত্তিক মাছ চাষ ব্যবস্থাপনা, মৎস্য আবাসস্থল উন্নয়ন, প্লাবনভূমিতে মৎস্যচাষ ও অভয়াশ্রম স্থাপনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ব্যবস্থা, জলমহালগুলোতে প্রকৃত জেলেদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নতুন জলমহাল নীতিমালা করায় দেশে মাছ উৎপাদন বেড়েছে।
সেই সঙ্গে মানসম্পন্ন চিংড়ি সরবরাহ নিশ্চিতের লক্ষ্যে জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা প্রণয়ন, মা ইলিশ রক্ষা ও জাটকা নিধন রোধে কার্যকর কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে বিশাল সমুদ্র এলাকা থেকে সম্পদ আহরণের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে সরকার একটি জাহাজ কিনেছে; আরও একটি জাহাজ কেনা হচ্ছে।
মৎস্য উৎপাদন ও মৎস্য খাতের টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য এ অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর গণভবনের লেকে তিনি মাছের পোনা অবমুক্ত করেন।