সংবাদ সম্মেলনে পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি> ভবদহের মানবিক বিপর্যয় রোধে জোয়ারাধারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক>
যশোরের ভবদহ অঞ্চলে জলাবদ্ধতার শিকার দেড়শ’ গ্রামের বাসিন্দাদের মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান ও মানবিক বিপর্যয় রোধে অবিলম্বে পরিকল্পিত জোয়ারাধারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নসহ ৫ দফা দাবি বাস্তবায়ন করতে হবে।
গতকাল শনিবার দুপুরে প্রেসক্লাব যশোরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারা এদাবি জানান। দাবির মধ্যে রয়েছে, অভয়নগর, কেশবপুর ও মণিরামপুর এলাকায় মানবিক বিপর্যয় রোধে খাদ্য নিরাপত্তা, চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, বিলকপালিয়ায় টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট/জোয়ারাধার) বাস্তবায়ন, আমডাঙ্গা খাল সংস্কার, ভবদহ স্লুইস গেটের ২১ ও ৯ ভেন্টের মাঝ দিয়ে সরাসরি নদী সংযোগ, হরিহর, আপারভদ্রা ও বুড়িভদ্রায় জরুরি ভিত্তিতে পলি অপসারণ, সব খাল পুনরুদ্ধার ও অবমুক্ত, পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধক পাটা, জাল, শেওলা অপসারণ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, জলাবদ্ধ তিন উপজেলার ১৫০টি গ্রাম, বাজারঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফসল ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। এলাকার লক্ষাধিক মানুষ এখন পানিবন্দি। সরকার প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড এখনো যদি সজাগ ও সতর্ক না হয় তাহলে ভবদহে আগের মতো দীর্ঘমেয়াদের বিপর্যয় দেখা দেবে।
তিনি বলেন, বিলখুকশিয়ার টিআরএমের মেয়াদ শেষে বিলকপালিয়ায় একই প্রকল্প গৃহীত হয়। সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ২০১২ সালের ২ জুন তৎকালীন হুইপসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আহত হন। তখন এলাকার লোকজনের আপত্তির অজুহাত তুলে সরকার প্রকল্প বাতিল করে। সরকারের এ সিদ্ধান্ত জনপদের জন্য সমূহ ক্ষতির কারণ হয়েছে। যার পরিণতিতে ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে দুই দফা ভারি বৃষ্টিতে ভবদহের বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হয়। জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে এই তিন উপজেলার প্রায় তিন লাখ মানুষ। পানিতে তলিয়ে যায় প্রায় ৫০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। আবার তিন উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বিলকপালিয়ার টিআরএম চালুর দাবিতে আন্দোলনে নামে।
তিনি বলেন, গত বছরের ৫ অক্টোবর অভয়নগরের নওয়াপাড়ায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনকালে বিনা উসকানিতে পুলিশ জলাবদ্ধ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুলিশের নির্মম প্রহারে শতাধিক নারী পুরুষ গুরুতর আহত হন। আহতের কয়েকজন এখনো সুস্থ হতে পারেননি। অবশেষে গণআন্দোলনের চাপে সরকার আবার টিআরএম-এর একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। তবে টিআরএমবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা থেমে থাকেনি। তারা সরকারকে বিভ্রান্ত করার চক্রান্তে লিপ্ত।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, চলতি বছরের ১৬ মার্চ যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতার দীর্ঘমেয়াদী সমাধানকল্পে জাতীয় কর্মশালায় পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল হক মাহমুদের উপস্থিতিতে আবার টিআরএম চালু করার সিদ্ধান্ত হয়। জনপদের জলাবদ্ধতা মুক্ত রাখার জন্য ১ এপ্রিল থেকে দুটি স্কেভেটর লাগিয়ে পাইলট চ্যানেল চালু রাখা হবে। ভবদহ গেটের উজানে ও ভাটিতে ছয় কিলোমিটার খনন অব্যাহত রাখা হবে। গেট উন্মুক্ত রাখা হবে। কিন্তু খননের কাজ শুরু হয় ২২ এপ্রিল থেকে। যদিও দুটি স্কেভেটর একসঙ্গে কাজ করেনি। মাসাধিককাল একটা স্কেভেটর ২১ ভেন্টের পাশে অকেজো পড়ে রয়েছে। অন্যটির খবর নেই।
অভিযোগ করা হয়, শুভ এন্টারপ্রাইজের নামে বরাদ্দ নেয়া শ্রীনদীর নেহালপুর অংশে এখনো কাজ শুরুই করা হয়নি। অথচ ওই কাজ সম্পন্নের শেষ সময়সীমা ৩০ আগস্ট। দীর্ঘসূত্রতায় নদীখনন কাজের প্যাকেজ আটকে রাখা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত ২১ জুলাই সংগ্রাম কমিটি ভবদহের ভাটিতে সরেজমিনে নদী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যায়। তারা দেখতে পান, ভরা জোয়ারের সময় কপালিয়া ব্রিজের পাশে পানির গভীরতা সাত হাত, ভায়নার বিলখুকশিয়া টিআরএমের সংযোগ খালের মুখে মাত্র আট হাত, তার ভাটিতে শোলগাতিয়া ব্রিজের নিচে সাড়ে ছয় হাত, গ্যাংরাইল ব্রিজের নিচে আট হাত, বারো আউড়িয়ায় নদীর মোহনায় মাত্র ২০ হাত। অথচ, এই মোহনায় গত বছর গভীরতা ছিল ১০০ হাতের মতো। কিন্তু ভাটার সময় তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৪-৫ হাত। এ পরিস্থিতি প্রমাণ করে এবারই যদি বিল কপালিয়ায় টিআরএম বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী বিলে টিআরএম’র প্রস্তুতি না নেয়া হয় তা হলে ৫০-৬০ কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিৎ বাওয়ালী, প্রধান সমন্বয়ক বৈকুণ্ঠবিহারী রায়, যুগ্ম সমন্বয়ক গাজী আব্দুল হামিদ, কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক অনিল বিশ্বাস, ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান ভিটু, অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিকী, ভগীরথ হালদার, অধ্যাপক কানু বিশ্বাস, শিবপদ বিশ্বাস, রাজু আহমেদ, ইলিয়াস হোসেন প্রমুখ।
এদিকে, পানি সরানোর দাবিতে সংবাদ সম্মেলন থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ১ আগস্ট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনায় স্মারকলিপি প্রদান এবং ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং এই মুহুর্তে টিআরএম বাস্তবায়ন ও পাঁচ দফা দাবিতে সভা-সমাবেশ অব্যাহত রাখা।