মায়ের মত সাথী ছিলেন বলেই বাবার সংগ্রাম সফল: শেখ হাসিনা

বিডিনিউজ >
শেখ ফজিলাতুন নেছার মত একজন নারীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন বলেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার সংগ্রামী জীবনে সাফল্য পেয়েছেন বলে মনে করেন তাদের মেয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মঙ্গলবার ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছার জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সব সময় নিজের মায়ের ত্যাগ স্বীকারের কথা স্মরণ করেন।
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে থেমে থেমে শেখ হাসিনা বলেন, “মায়ের মতো একটা সাথী পেয়েছিলেন বলেই কিন্তু আব্বা সংগ্রাম করে সফলতা অর্জন করতে পেরেছিলেন।”
তাজউদ্দিন আহমেদ, ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামের মতো সহযোগীরা যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তি নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে আইয়ুব খানের সঙ্গে বৈঠকের পক্ষে ছিলেন, তখন একমাত্র ফজিলাতুন নেছা এর বিপক্ষে ছিলেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

শিক্ষা ও উন্নয়নসহ কর্মক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার বাঙালির স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবিতে ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওই ছয় দফাই পরে স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি তৈরি করে বলে অনেকে মনে করেন।

ছয় দফা দেওয়ার পর তার পক্ষে জনমত তৈরিতে বঙ্গবন্ধু যেখানেই জনসভা করেছেন, সেখানেই তার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে এবং বার বার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সেই সময়ের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “১৯৬৬ সালের ৮ই মে যখন নারায়ণগঞ্জে মিটিং করে আসলেন.. আর, ওই মিটিং করে ফিরে আসার পর আব্বাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হল। ৯ তারিখে অফিসিয়ালি গ্রেপ্তার দেখানো হল। ওই অবস্থায় একটা পর একটা মামলা দিয়েৃ কোনো কোনো মামলায় শাস্তিও দিয়েছে।”

এরপর ১৯৬৮ সালের শুরুর দিকে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা সেনানিবাসে আটক করা হয়। দায়ের করা হয় তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, “১৯৬৮ সালের ১৮ই জানুয়ারিৃ আমরা জেলখানায় গিয়েছিলাম, কিন্তু সেদিন আব্বার সাথে দেখা করতে পারিনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেলখানায় অপেক্ষা করলাম। কিন্তু কারাগার থেকে বলা হলো, ‘না, দেখা হবে না’, বা কোথায় আছেৃ।”

বঙ্গবন্ধুকে কোথায় রাখা হয়েছে, সে তথ্য প্রায় ছয় মাস পরিবারের সদস্যদের জানতে দেওয়া হয়নি সে সময়। সেই তথ্য তারা জানতে পারেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হওয়ার পর। জানতে পারে, বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয়েছে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে।

শেখ হাসিনা বলেন, “ক্যান্টনমেন্টেই কোর্ট বসানো হল। যেদিন প্রথম কোর্ট বসে, সেদিন আমাদের কয়েকজনকে পাশ দিয়েছিলৃ পরিবার থেকে কয়েকজন, আর আইনজীবীকে। আব্বা কাঠগড়ায়ৃ (গ্রেপ্তারের পর) ওই প্রথম তার সাথে আমার মায়ের দেখা, আমাদের দেখা।

“জুলাই মাসে কেসটা শুরু হয়। এই পাঁচ মাস, ছয় মাস আমরা জানতেই পরিনি; কোথায় আছেন, মারা গেছেন না বেঁচে আছেনৃ নানা ধরনের কথা আমরা শুনতাম।”

সে সময় ছয় দফা বিরোধী প্রচারণার কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

“পাকিস্তান আওয়ামী লীগের যারা নেতা ছিলেন, তারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে এলেন, আমাদের এখানেও কিছু বড় বড় নেতাৃ তারা ছয় দফা বাদ দিয়ে আট দফা গ্রহণ করার জন্য চাপ দিতে থাকলেন।

“আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এসে আমার মাকে বোঝাতে চেষ্টা করতেন যে ছয় দফা দিয়ে কী হবে? আট দফা হলেই ছয় দফার চাহিদা পূরণ হবে। আমরা মায়ের একটাই কথা ছিল, ‘ছয় দফা তো, ছয় দফাই’।”

আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মী ও অধিকাংশ নেতা সে সময় ছয় দফার পক্ষে থাকলেও কয়েকজন বড় নেতা আট দফার পক্ষে ছিলেন। তখনকার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও এ নিয়ে সেই ‘বড় নেতাদের’ মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল।

“আমাদের তখন অনেক নেতা বলতেন, ‘তুমি কিচ্ছু বোঝো না, আজকে আট দফাই করতে হবে’।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালে আন্দোলন যখন তুঙ্গে, যখন সংগ্রাম পরিষদ গঠন হল, ঠিক তখনই আইয়ুব খান বিরোধীদলসহ সবার সঙ্গে আলোচনার জন্য বৈঠক ডাকেন।

“ওই বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য আব্বাকে প্যারোলে নিয়ে যাবে। আমাদের প্রায় সব নেতারাই রাজি ছিলেন যে, আব্বা প্যারোলে যাক। কিন্তু আমার মা কখনোই এর সাথে একমত ছিলেন না।

“আমার মনে আছে, মা আমাকে খবর দিলেন, ‘তুমি শিগগিরি আস, তোমাকে এক্ষুণি (ঢাকা সেনানিবাসে) যেতে হবে। ওখানে প্যারোলে নেবার জন্য সবাই অস্থির, উৎগ্রীব। তোমার আব্বা যেন না যায়’। উনি ডিকটেশন দিলেন, আর মণি ভাই লিখে দিলেন। ওয়াজেদ সাহেব গাড়ি চালাচ্ছিলেন, আমি জোরে জোরে পড়লামৃ সুযোগ পেলে চিঠিটা দেব, নয়তো ম্যাসেজটা দেব।”

সেদিন শেখ হাসিনা যখন সেনানিবাসে পৌঁছালেন, আওয়ামী লীগের বড় নেতারা তখন ভেতরে উপস্থিত। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যেতে তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমান প্রস্তুত।

“সেখানে গিয়ে দেখলাম, মানিক কাকার (তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া) গাড়ি। সেই গাড়িতে করে আমাদের নেতা তাজউদ্দীন সাহেব (তাজউদ্দীন আহমদ), সালাম খান (আবদুস সালাম খান), ড. কামাল (কামাল হোসেন), আমিরুল ইসলাম (ব্যারিস্টার এম. আমিরুল ইসলাম)ৃ এরা সকলেই সেখানে উপস্থিত। সাথে আরেকজন ছিল, সে আমাদের আওয়ামী লীগের নেতা না হলেও সব সময় সাথে সাথে ঘুরঘুর করতো। সেটা হচ্ছে মওদুদ আহমদ।

সেনানিবাসের তখনকার পরিস্থিতি স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, “অনেক নেতারা ছিলেন। কিন্তু আমাকে ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছিল না। আমি কিন্তু গেইটের বাইরে দাঁড়ানো। সেখানে একজন কর্নেল নাসির নামে.. সে সবুজ একটা ফোর হুইলার জিপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আব্বাকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যাবে। আমি খুব উসখুস করছি, আব্বা যদি একটু বের হয়, আব্বা যদি জানতে পারে আমি আছিৃ আমার উপস্থিতিটা দেখলে উনি বুঝতে পারবেন যে মা কোনো ম্যাসেজ দিয়ে পাঠিয়েছেন।”

সকলের অন্তরালে সেদিন বাবার কাছে মায়ের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী।

“আব্বা কথা বলতে বলতে যখন দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন, দেখলেন আমি দাঁড়ানো। উনি হেঁটে বাইরে আসলেন। উনাকে বাইরে আসতে দিচ্ছে না। আমাকেও ঢুকতে দিচ্ছে না। নিচু কাঠের গেইট। কাঠের গেইটা একটু ফাঁক করা। ওখান থেকে উনি আমাকে আদর করার জন্য গলাটা জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘কোনো চিঠি টিঠি দিস না, তোর মা কি বলেছে বল’।

“আমি শুধু বললাম, মা এখন প্যারোলে যেতে নিষেধ করেছে, কোনো সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করেছে। উনি দেখা করার জন্য সময় চেয়েছেন। সময় পেলে উনি আসবেন। মা নিষেধ করেছে যেতে। আপনি কিন্তু যাবেন না।

“আব্বা শুধু বললেন, ‘আমি জানি।’ এটুকু বলে উনি ভিতরে গেলেন।”

এর পরের ঘটনাপ্রবাহও অনুষ্ঠানে স্মরণ করেন শেখ হাসিনা।

“যা হোক, আমাদের নেতারা মনে হয় এটা খুব ভালো চোখে দেখলেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা ওখান থেকে বের হয়েছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি ওখান থেকে সরিনি। একটা পর্যায়ে উনারা বের হয়ে আসলেন। কেউ জিপে, কেউ মানিক কাকার গাড়িতে করে রওনা হলেন। উনারা জাহাঙ্গীর গেইটের দিকে আসলেন। আমি আবার ভেতর থেকে মহাখালীর দিকের যে রাস্তা, ওখান থেকে বের হয়ে বাসায় আসলাম।”

শেখ হাসিনা সেদিন ধানম-ির ৩২ ন¤॥^র সড়কের বাড়িতে ফেরার আগেই জ্যেষ্ঠ নেতারা সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।

“দেখি নিচের তলায় সব নেতারা বসা। আমার মায়ের ওপর বেশ জুলুম যাচ্ছে। তারা মাকে বললেন, আপনি এটা কী করলেন ভাবি? তারা বুঝে গিয়েছিলৃ আমি যখন গিয়েছি, কোনো তথ্য দিয়েছি। আব্বা তো আর যাবেন না। মাকে বললেন, আপনি কী জানেন যে আপনি বিধবা হবেন?

“মা শুধু জবাব দিলেন, ‘আমি কেন, সাথে তো আরও ৩৪ জন আসামি আছে? বিধবা তো তাদের স্ত্রীরাও হবে। আর বাংলাদেশের কী হবে? বাংলাদেশের কী ভবিষ্যত? বাংলাদেশের কথা আগে চিন্তা করেন, দেশের কথা আগে চিন্তা করেন। আমার কথা চিন্তা করতে হবে না’।”

শেখ হাসিনা বলেন, যখন তিনি দেখলেন যে নেতারা তাদের যুক্তি বেগম ফজিলাতুন নেছাকে মানাতে পারছেন না, তখন তিনি বাড়ির উপরে চলে যান। পরে আমিরুল ইসলাম ও মওদুদ আহমেদও উপরে যান।

“আমাকে সামনে পেয়েই আমিরুল ইসলাম খুব কঠিনভাবে আমাকে বললেন, ‘তুমি কেমন মেয়ে, তুমি চাওনা তোমার বাবা বেরিয়ে আসুক? তোমার বাবা মুক্তি পাক?’ মানে, তার কথা হচ্ছে, আমি কেন গেলাম। আমার খুব রাগ হল। আমি শুধু বললাম, আমার বাবা মুক্তি পাবে। সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে আসবে। আপনারা উল্টা পাল্টা করবেন না।

“এর মধ্যে মাও উপরে আসলেন। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার দিয়ে কাঁদলাম। মা বললেন, ‘তুমি কাঁদো কেনো? কাঁদবা না। তোমার আব্বা বেরিয়ে আসবেন, সম্মানের সাথে বেরিয়ে আসবেন’।”

শেখ হাসিনা বলেন, দেশের জনগণ কী চায় তা বোঝা এবং জনমত সৃষ্টি করার পেছনে তার মায়ের বিরাট অবদান ছিল।

“জীবনের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়ে, ভোগ বিলাস বিসর্জন দিয়ে আমার বাবার পাশে থেকে থেকে এদেশের মানুষের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন আমার মা। আমার বাবার পাশে থেকে সেভাবে ত্যাগ স্বীকার না করলে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে পারতাম কিনাৃ”

মায়ের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “১৯৬৬ সালে মে মাসে আব্বাকে গ্রেপ্তার করার পর ৭ই জুন একটা হরতাল দেওয়া হয়। সেই হরতালটাকে সংগঠিত করা, কার্যকর করা, এই কাজগুলো কিন্তু আমার মা করেছে।ৃ আমিতো বলব, আমরা মা ছিলেন আসলে একজন গেরিলা।”

তখনকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দৃষ্টি এড়িয়ে ফজিলাতুন নেছা কীভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি সফল করতে বিভিন্ন জায়গায় বৈঠক করেছেন, তার বর্ণনাও অনুষ্ঠানে দেন শেখ হাসিনা।

“তিনি বিভিন্ন সময়ে ছাত্র নেতৃবৃন্দের সঙ্গে, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দেখা করতেন। আমাদের বাসা সব সময় ইন্টেলিজেন্সের লোকরা ঘিরে রাখত। আমার মা আমাদের নিয়ে যেতেন আমাদের ছোট ফুপুর বাড়িতে। আর আমাদের বলতেন, ‘তোমরা ওই জানলার কাছে দাঁড়ায়ে থাকো, দেখো কারা কারা আছে’। আর ছোট ফুপুর বাড়িতে গিয়ে মা কাপড় বদলাতেন, পায়ের স্যান্ডেল বদলাতেন, বোরখা পড়ে স্কুটার ডেকে ওখান থেকে বের হয়ে আজিমপুর কোলনিতে আমাদের কিছু সরকারি অফিসারৃ আমাদের কিছু আত্মীয় ছিলেনৃ তাদের বাড়িতে ছাত্র নেতাদের ডাকতেন।ৃ কিন্তু আমাদের বলে যেতেন সব সময় যেন আমরা ওই জানলার কাছেই থাকি, যতক্ষণ উনি ফিরে না আসেন। সেখান থেকে ফিরে এসে কাপড় চেইঞ্জ করে আমাদের বাসায় নিয়ে আসতেন।”

ফজিলাতুন নেছা সে সময় এভাবে ভেতরে ভেতরে আন্দোলন গোছাতে কাজ করে গেলেও তখনকার গোয়েন্দারা তা ধরনে পারেনি বলে জানান তার মেয়ে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান মমতাজ বেগম এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রেবেকা মমিন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাংসদ ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী। স্বাগত বক্তব্য রাখেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগম।